ময়মনসিংহ সদরের বোররচর মৃধাপাড়ার মুক্তিযোদ্ধা আবু বকর সিদ্দিক। তার সাময়িক সনদ নং-ম ১৪১২৯৯। মুক্তিযোদ্ধাদের মাসিক সম্মানী ভাতা চালুর পর থেকেই তিনি ভাতা পেতেন। ব্যক্তিগত দ্বন্দ্বের কারণে একটি স্বার্থান্বেষী মহল তাকে ‘অমুক্তিযোদ্ধা’ বলে মন্ত্রণালয়ে লিখিত অভিযোগ দেয়। এ কারণে তিন বছর আগে তার ভাতা স্থগিত করে মন্ত্রণালয়। এর প্রতিবাদে জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলে (জামুকা) তিনি আপিল করেন। ইতোমধ্যে তার আপিলের শুনানি করেছে জামুকা। কমিটির কাছে মুক্তিযোদ্ধার সপক্ষে সাক্ষী, তথ্যপ্রমাণাদি উপস্থিত করায় তাকে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা বিবেচনা করে তার স্থগিত ভাতা চালুর সুপারিশ করেছে জামুকা। এরই মধ্যে ২৯ সেপ্টেম্বর আবু বকর সিদ্দিক ইন্তেকাল করেছেন বলে জানিয়েছেন তার ছেলে আমীর হামজা। শিগগিরই তার ভাতা আবার চালু করবে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়।

একইভাবে উপজেলা যাচাই-বাছাই কমিটি প্রতিবেদনে ‘অমুক্তিযোদ্ধা’ আখ্যায়িত হওয়ায় গত বছরের জুলাই থেকে ভাতা স্থগিত রয়েছে ময়মনসিংহের মুক্তাগাছা উপজেলার মুরারীপুর গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা হাছান আলীর। ভাতা বন্ধ হওয়ায় ক্ষুব্ধ হয়ে তিনি জামুকায় আপিল করেন। শুনানিতে সাক্ষী, তথ্যপ্রমাণাদি ঠিকমতো উপস্থিত করতে পারায় তার ভাতাও চালুর সুপারিশ করে জামুকার সংশ্লিষ্ট কমিটি। শিগগিরই তার ভাতাও চালু করবে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়।

শুধু আবু বকর সিদ্দিক বা হাছান আলী নন। সারা দেশে এ ধরনের প্রায় সাড়ে তিন হাজার গেজেটধারী মুক্তিযোদ্ধার মাসিক সম্মানী ভাতা স্থগিত রয়েছে। দেড় বছর থেকে শুরু করে অনেকের ৩-৪ বছর ভাতা বন্ধ রয়েছে। তারা ইতোমধ্যে জামুকার কাছে ভাতা চালুর জন্য আপিল করেছেন। এ প্রক্রিয়ার প্রথম ধাপে ঢাকা, সিলেট, ময়মনসিংহ, রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের মোট ১ হাজার ৭৬৪ জনের শুনানি সম্পন্ন হয়। এর মধ্যে মুক্তিযোদ্ধার সপক্ষে প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত হাজির করায় ১ হাজার ৩৫ জনের ভাতা চালু করার সিদ্ধান্ত দেয় সংশ্লিষ্ট আপিল শুনানি কমিটি। তথ্য-উপাত্ত হাজির করতে ব্যর্থ হওয়ায় ৩০০ জনের ভাতা বন্ধ রাখার পক্ষে রায় দেয়া হয়। আর আপিল করেও শুনানিতে অংশগ্রহণ করেননি ৪২৯ জন। তাদের ভাতাও বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত দেয় জামুকা। ৫ অক্টোবর অনুষ্ঠিত জামুকার বৈঠকে এসব বিষয়ের অনুমোদন দেয়া হয়।

পুনরায় ভাতা চালুর সুপারিশপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধার মধ্যে ঢাকা বিভাগের ৪৯৩ জন, সিলেট বিভাগের ১৬২ জন, ময়মনসিংহ বিভাগের ১৪৯ জন, রাজশাহী বিভাগের ৫৮ জন এবং রংপুর বিভাগের ১৭৩ জন রয়েছেন। এর মধ্যে মাদারীপুরের ৭০ জন, গোপালগঞ্জের ১৩১ জন, রাজবাড়ীর ৩৮ জন, মুন্সীগঞ্জের আটজন, নারায়ণগঞ্জের একজন, নরসিংদীর ছয়জন, গাজীপুরের দুইজন এবং কিশোরগঞ্জের ২৩৭ জন। সুনামগঞ্জের ১৪৯ জন, সিলেটের ১২ জন ও হবিগঞ্জের তিনজন, ময়মনসিংহের ৯৪ জন, নেত্রকোনার ২৯ জন এবং শেরপুরের ২৬ জন। রাজশাহীর সাতজন, বগুড়ার ২১ জন, নওগাঁর ১৬ জন, সিরাজগঞ্জের ১১ জন এবং পাবনার তিনজন। রংপুরের ৫৫ জন, কুড়িগ্রামের চারজন, লালমনিরহাটের ৩২ জন, গাইবান্ধার ১২ জন, দিনাজপুরের ৪৩ জন, ঠাকুরগাঁওয়ের চারজন এবং পঞ্চগড়ের ২২ জন।

এখন সুপারিশপ্রাপ্ত ১ হাজার ৩৫ জনের ভাতা পুনরায় চালুর প্রজ্ঞাপন জারি করবে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়। ভবিষ্যতে পর্যায়ক্রমে বাকি জেলাগুলোর আপিলের শুনানিও সম্পন্ন করা হবে বলে জামুকা সূত্র নিশ্চিত করেছে।

বিষয়টির সত্যতা নিশ্চিত করে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক বলেন, ‘সরকার কর্তৃক গঠিত উপজেলা যাচাই-বাছাই কমিটি গঠন করা হয়েছিল। সারা দেশে কিছু গেজেটধারী মুক্তিযোদ্ধার বিরুদ্ধেও লিখিত অভিযোগ এসেছিল তারা ‘অমুক্তিযোদ্ধা’। এসব অভিযোগ যাচাই-বাছাই করতে সংশ্লিষ্ট উপজেলায় পাঠানো হয়েছিল। ওইসব ব্যক্তি যাচাই-বাছাই কমিটির সামনে নিজেদের মুক্তিযোদ্ধা হওয়ার সপক্ষে প্রয়োজনীয় তথ্যপ্রমাণ দেখাতে ব্যর্থ হয়েছেন। ফলে কমিটি তাদের মাসিক সম্মানী ভাতা বন্ধ করে সনদ বাতিলের সুপারিশ করেছে। সে অনুযায়ী সংশ্লিষ্টদের ভাতা বন্ধ রাখা হয়েছে। তাদের মধ্যে যারা আপিল আবেদন করেছেন, তাদের শুনানি অক্টোবরে শুরু হয়েছিল। ইতোমধ্যে প্রথম ধাপে দেড় হাজারের বেশি আপিল শুনানি সম্পন্ন হয়েছে। আপিল কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে জামুকা ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়। জানা গেছে, মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পেতে সারা দেশের নতুন করে ১ লাখ ৩৪ হাজার ব্যক্তি আবেদন করেছিলেন। এছাড়া সারা দেশের প্রায় অর্ধলাখ গেজেটধারী মুক্তিযোদ্ধার বিরুদ্ধে ‘অমুক্তিযোদ্ধা’ হওয়ার লিখিত অভিযোগ রয়েছে মন্ত্রণালয়ে। এসব অভিযোগ ও নতুন আবেদন যাচাই-বাছাই করে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধার তালিকা চূড়ান্ত করতে ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে সারা দেশে ৪৭০টি উপজেলা যাচাই-বাছাই কমিটি গঠন করে সরকার। মুক্তিযোদ্ধা যাচাই-বাছাই সংক্রান্ত ৪৭০টি কমিটির মধ্যে ৩৮৫টি তাদের প্রতিবেদন দেয়। ৮৫টি কমিটি কাজ করতে পারেনি সদস্যদের দ্বন্দ্ব এবং কমিটি নিয়ে আদালতে মামলা থাকায়। যাচাই-বাছাই হয়েছে, তাতে উপজেলা, জেলা কিংবা মহানগর কমিটি তিন ধরনের খসড়া তালিকা তৈরি করে। ‘ক’ তালিকা হল- যাচাই-বাছাই কমিটির সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত তালিকা। ‘খ’ হল- কমিটির দ্বিধাবিভক্ত মতের ভিত্তিতে করা তালিকা। ‘গ’ হল- কমিটির নামঞ্জুর করা তালিকা।

‘গ’ তালিকাভুক্ত মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে যাদের গেজেট রয়েছে তাদের ভাতা বন্ধ করে দেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী। তবে তাদের গেজেট এখনও বহাল রয়েছে। এসব গেজেটধারী প্রায় সাড়ে ৩ হাজার মুক্তিযোদ্ধা ইতোমধ্যে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে আপিল আবেদন করেছেন। মন্ত্রণালয় সেসব আবেদন তদন্তের জন্য জামুকার কাছে পাঠায়। ওইসব আপিল নিষ্পত্তি করতে জামুকার সদস্যদের নেতৃত্বে প্রতি বিভাগে একটি করে কমিটি গঠন করা হয়। এসব কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে প্রথম দফায় পাঁচ বিভাগের ১ হাজার ৩৫ জনের ভাতা চালুর প্রস্তাব অনুমোদন দেয় জামুকা। পর্যায়ক্রমে বাকি আপিলের শুনানি সম্পন্ন হলে তা অনুমোদনের জন্য জামুকার বৈঠকে উপস্থাপন করা হবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here