৩০ অক্টোবর । শনিবার । ১৯৭১ । গোপালগঞ্জের কাশিয়ানী থানার ওড়াকান্দি উচ্চবিদ্যালয়ে স্থাপিত নবম সেক্টরের সাব-সেক্টর হেডকোয়ার্টার ।

রাত ন’টা । সবেমাত্র খেয়েদেয়ে উঠে কতিপয় বন্ধু-যোদ্ধাসহ বিড়ি ফুঁকছি । বাইরে ঝড়-বৃষ্টির মৃদু তাণ্ডব চলছে ।

সাব-সেক্টর কমাণ্ডার ঐতিহাসিক আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার অভিযুক্ত ক্যাপটেন নূর মোহাম্মদ বাবুল । তিনি আমাকে তাঁর কক্ষে তলব করলেন । আমি তখন তাঁর স্টাফ অফিসারসহ ভারতের চাকুলিয়া থেকে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সি-ইন-সি স্পেশাল বাহিনীর পঁচিশ সদস্যবিশিষ্ট একটি দলের অধিনায়ক ।

ক্যাপটেন বাবুলের কক্ষে প্রবেশ করে দেখি মুক্তিবাহিনীর কাশিয়ানী থানা কমাণ্ডার জগলুল কাদীর জুলু, মুজিববাহিনীর লীডার ইসমত কাদীর গামা, আফম হাফিজুর রহমান, এমএফ কমাণ্ডার কটা সর্দারসহ আরো কতিপয় গ্রুপ কমাণ্ডার সেখানে উপস্থিত । আমিও তাদের সাথে মিলিত হই ।

ক্যাপটেন বাবুল জানালেন, আমাদের গোয়েন্দারা খবর এনেছেন যে, আগামীকাল ৩১ অক্টোবর ভোরবেলা ভাটিয়াপাড়ার পাকিঘাটিঁ থেকে ওদের নিয়ন্ত্রিত এলএসডি গুদাম থেকে খাদ্যশস্য নিয়ে দু’টি লঞ্চ গোপালগঞ্জ পাকিবাহিনীর কাছে যাবে । তাদেরকে মধুমতির এ-পাড়ে সুবিধাজনক স্থান ফুকরার আমবাগান  থেকে প্রতিহত করতে হবে । ঐ খাদ্যশস্য গোপালগঞ্জের যেতে দেয়া হবে না । ওদের প্রতিহত করে ঐ খাদ্যশস্য আমাদের করায়ত্তে আনতে হবে । কারণ আমরা নিজেরই খাদ্যসংকটে আছি ।

সিদ্ধান্ত হলো যে, আজ শেষরাতের মধ্যেই আমরা মুক্তিবাহিনীর তিনটি দলের সত্তরজন সদস্য ফুকরার আমবাগানের মধ্যে মধুমতির পাড়ে বাঙ্কার খুঁড়ে অবস্থান গ্রহণ করবো । ক্যাপ্টেন বাবুলের দলের এমএফ অধিনায়ক বিডিআর হাবিলদার আলাউদ্দিন সার্বিক কমাণ্ডে থাকবেন । আমার নেতৃত্বে রণাঙ্গনের মাঝখানে, গামার নেতৃত্বে ডানদিকে এবং কটা সর্দারের নেতৃত্বে বামদিকে মুক্তিবাহিনী অবস্থান নেবে । আমাদের পেছনে টু-ইঞ্চ মর্টার নিয়ে জুলুর নেতৃত্বে থাকবে কভারিং গ্রুপ । সার্বিক অধিনায়ক আলাউদ্দিন এনারগা ও এলএমজি নিয়ে আমার বাঙ্কারের মধ্যে থাকবে ।

৩১ অক্টোবর । রোববার । বেলা উঠবার আগেই আমরা স্থানীয় জনগণের সহায়তায় আমবাগানের ভেতর প্রয়োজনীয় বাঙ্কার খুঁড়ে ফেলি । তখন ঝড়-বৃষ্টির বেশ তাণ্ডব চলছে । বাঙ্কারগুলো পানিতে সয়লাব হলেও আমরা গামলা  দিয়ে পানি সরাতে থাকি ।

বাঙ্কার খোঁড়া শেষ হতেই আমার সিএনসি দলের সদস্য এবং ঘনিষ্ঠ বন্ধু শাহাবুদ্দিন জুন আমার সাথে একই বাঙ্কারে থাকার প্রবল বায়না ধরে । অগত্যা দশহাত দূরের আরেকটি বাঙ্কারে আলাউদ্দিন এনারগা ও এলএমজি নিয়ে একাই অবস্থান নিলো । এরই মধ্যে স্থানীয় কতিপয় লোক আমাদের জন্য রুটি ও গুড় দিয়ে গেলো । আমরা নাস্তা করছি আর সামনের প্রশস্ত মধুমতির ডানদিকে কড়া নজর রাখছি যে, লঞ্চ দেখা যায় কিনা । ওদিকে আমাদের প্রতিকূলে ঝড়বৃষ্টির প্রচণ্ড মাতামাতি শুরু হয়ে গেলো । বৃষ্টির ধোঁয়ায় সামনে দূরে কিছুই দেখা যায় না । মনে হচ্ছিলো, প্রকৃতিও আমাদের বিরুদ্ধে !

আমার হাতের বায়নাকুলার দিয়ে বারবার শত্রুর লঞ্চ দর্শনের চেষ্টা করতে করতে এক সময় ঝাপসা চোখে ধরা পড়লো । আমাদের থেকে মাইল তিনেক দূরে উত্তর দিক থেকে দু’টি লঞ্চ পরপর এগিয়ে আসছে । কিন্তু লঞ্চে শব্দ নেই । বুঝলাম, ওরা সাইলেন্সার ব্যবহার করছে । ততক্ষণে বায়নাকুলারটি আলাউদ্দিনের হাতে দিয়ে তাকেও দেখতে ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলি । হাবিলদার আলাউদ্দিন সবকিছু পরখ করে আমবাগানের মধ্যে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে বলে উঠলো : সবাই সাবধান ! লঞ্চ আসছে । তৈরি হও । আমি ইনারগা দিয়ে লঞ্চে আঘাত করতেই ফায়ার শুরু করবে যার যার নিশানায় । তবে গুলি বেশি খরচ করা চলবে না—–

আমরা রুদ্ধশ্বাসে অপেক্ষা করছি । আমার হাতে মডিফায়েড অটো এসএলআর । শাহাবুদ্দিন জনুর হাতে মার্কফোর থ্রি-নট-থ্রিসহ গ্রেনেড । আমগাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে দেখি আমাদের মুক্তিবাহিনী পজিশন নিয়ে যে-যার অবস্থানে তৈরি হয়ে আছে । ওদিকে ঝড়বৃষ্টির দাপট একটু কমে আসছে । ভোরের সূর্য অনেক আগে উঠলেও ঝড়বৃষ্টির কারণে বেশি দূরে ফর্সা বিস্তার করতে পারছে না । তার মধ্যেই মাইলখানেক দূরে লঞ্চের অবস্থান আমরা এবার সবাই খালি চোখে দেখতে পাচ্ছি । তবে লঞ্চের গতি বেশ ধীর । ওরা মনে হয় ভয়ে ভয়ে আগাচ্ছে । আমরা সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করি ।

এক সময় লঞ্চ দু’টি আমাদের প্রায় সামনে আনুমানিক চারশো গজ দূর দিয়ে মধুমতির নদী দিয়ে ধীরগতিতে এগিয়ে যাচ্ছে । আমি অবাক চোখে দেখলাম, সামনের লঞ্চটির চিমুনির পাশে বৃষ্টির মধ্যে রেইনকোট পরিহিত একজন বাঁহাতে বায়নাকুলার দিয়ে নদীর এপাশ-ওপাশ দেখছে, ডানে চাইনিজ গান । আমি মনে মনে ওকে নিশানা করি । আরো লক্ষ্য করলাম, লঞ্চ দুটির ছাদে ও ডেকে মনে হয় বালির বস্তা দিয়ে বেরিকেড তৈরি করে তার ওপাশে ভেতরে কিছু অস্ত্রধারী পজিশন নিয়ে বসে আছে । তাদের কারো কারো নড়াচড়া আমাদের দৃষ্টিতে ধরা দিচ্ছে । সহসা আলাউদ্দিন চাপাস্বরে নির্দেশ দিলো, সবাই যার যার টার্গেট নির্ণয় করো । আমি এক্ষুণি এনারগা মারছি ! বলেই সে এনারগার একটা গোলা ছুঁড়ে দিলো । লঞ্চ ডুবানোর জন্য লঞ্চের পানি পয়েন্টে এনারগার গোলা আঘাত করার কথা থাকলেও সেটি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে সামনের লঞ্চের ছাদের কোণে গিয়ে বিকট শব্দে বিস্ফারিত হলো ! আমি রেইনকোটওয়ালাকে টার্গেট করেছিলাম এবং এসএলআরের এক গুলিতে তাকে ঘায়েল করি । দেখলাম তার খুলির কিছু অংশ উপরের দিকে ছিটকে পড়লো । আমাদের অন্যান্য সাথীরা লঞ্চ দু’টির যার যার টার্গেটে মুহুর্মুহু গুলি ছুঁড়ছে । মনে হলো লঞ্চের ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে গেছে । মুক্তিযোদ্ধাদের গুলির শব্দে যেন বিভীষিকা সৃষ্টি হলো !  আলাউদ্দিনের এলএমজির গুলি অনবরত দু’লঞ্চের ওপর আছড়ে পড়ছে । এরই মধ্যে পাকিবাহিনীর মারণাস্ত্রগুলি সক্রিয় হয়ে চারিদিকে প্রকম্পিত হতে লাগলো । চাইনিজ মারণাস্ত্রের যে কী ভয়ঙ্কর আওয়াজ আজই তা অনুভব করলাম । আমাদের গুলি সীমিত বিধায়ক আমরা গুলিবর্ষণ কমিয়ে দিলাম । এরই এক ফাঁকে লক্ষ্য করি, লঞ্চ দু’টির ছাদের অনেকাংশ উড়ে গেলেও, নদীর পাড় বেশ উঁচু হওয়াতে খোলা অংশ আমরা দেখতে পাচ্ছি না ! অপরদিকে লঞ্চ দু’টি ভাসতে ভাসতে আমাদের পাড়ের আড়ালে চলে আসার ফলে আমরা আর তেমন কিছু করতে পারছি না । সম্মুখ সমরে অনভ্যস্ত আমাদের ছেলেরা বোধহয় গুলির স্বল্পতার কারণে হতাশ হয়ে পড়ে । অপরদিকে পাকিবাহিনীর চাইনিজ মারণাস্ত্রের ভয়ঙ্কর শব্দে আমাদের অনেকের মনে ভয় ঢুকে গেলো——-

হঠাত্ আমাদের মনে হলো, লঞ্চ দু’টি উঁচু পাড়ের কোলে আসার সুযোগে পাকিসৈন্যরা পাড়ে উঠে, নদীর পাড়কে ঢাল বানিয়ে আমাদের সামনাসামনি অবস্থান নিয়েছে । বৃষ্টির কারণে বাঙ্কারের মধ্যে বুক সমান পানি জমে গেছে ।

হঠাত্ জনু চাপাকন্ঠে কী যেন বলে দাঁড়িয়ে ‘জয়বাংলা’ উচ্চারণ করেই একটা গুলি ছুঁড়ে দিয়ে চিৎকার করে বলে উঠলো, আহাদ, একটার মাথা উড়িয়ে দিয়েছি !’ আমি একটা গাছের আড়ালে দেহ রেখে সামনে তাকিয়ে দেখি, জনুর গুলিতে মৃত/আহত একটাকে ঠ্যাং ধরে আরেক সৈন্য তার দিকে টানছে । দেখলাম, জনু বাঙ্কারের উপরে উঠার চেষ্টা করছে । আমি তার ঘাড় ধরে টেনে বাঙ্কারে এনে মৃদুকন্ঠে বলি, এভাবে ওপরে উঠছিস কেন ?’ উত্তরে জনু জানায়, ঐটাকে জীবিত ধরে আনতে চাই ! তার এহেন দৃপ্ততায় আমার হাসি পায় । হাসি পাওয়ার কথা নয় । কারণ ইতোমধ্যে আমি জেনে গেছি, আমাদের বাঙ্কারের আশপাশের বাঙ্কারের সবাই পালিয়েছে । সেকথা জনুকে বলি না———

আমি বাঙ্কারের বুকপানিতে বসে ম্যাগাজিনে গুলি ভরছি । হঠাত্ একটি চাইনিজ রাইফেলের তীক্ষ্ণ আওয়াজে কেঁপে উঠার সঙ্গে সঙ্গে একদলা গরম কাদা-পানির মতো কী যেন আমার চোখে-মুখে এসে আঘাত করে ! পাশ ফিরে দেখি জনুর দেহটি আমার ওপর ঠাস করে এসে পড়লো । বুঝতে পারলাম, জনুর বুকের ডানপাশে গুলি লেগে পিঠ দিয়ে বেরিয়ে গেছে । সেই আঘাতে জনুর কিছু মাংস ও রক্ত আমার চোখে -মুখে পড়েছে । তাৎক্ষণিক্ষ আমি দু’হাতে জনুর বুক ও পিঠ চেপে ধরে তার রক্তক্ষরণ বন্ধ করার প্রাণান্তকর চেষ্টা চালাই ।
জনু অতিকষ্টে চোখ মেলে টেনে টেনে বললো, মাকে বলিস, আমি খুলনা বদলি হয়ে গেছি ! যদি বঙ্গবন্ধুকে পাস, তাহলে আমার কথা বলিস ! আরকিছু জনু বলতে পারেনি । আমার কোলের ওপর সে ঢলে পড়ে ।

জনুর নিথর মৃতদেহটি বাঙ্কারের পানিতে ছেড়ে দিয়ে আমি জনুর রাইফেলটি কাঁধে ঝুলিয়ে আমার এসএলআরটি হাতে ধরে মাথা একটু উঠিয়ে আশপাশে তাকাই । কেউ নেই । ভীষণ ঘাবড়ে গিয়ে বাঙ্কার ছেড়ে ওপরে উঠে আমগাছের আড়ালে আড়ালে ক্রলিং করে পেছনের আলুক্ষেতের ভেতর দিয়ে সামনের পাটক্ষেতের দিকে আগাতে থাকি । কাছে-দূরে তখনো বিক্ষিপ্ত গোলাগুলির আওয়াজ শুনতে পাচ্ছিলাম । চারদিকে কেমন অন্ধকার । তখনো বৃষ্টি হচ্ছে । ঘড়ির দিকে একবার চোখ বুলাই । বিকেল তিনটা ।

আমগাছ ও আলুক্ষেতের মধ্যে দিয়ে আমি সন্তর্পণে ক্রলিং করে আগাচ্ছি । হঠাত্ আমার চোখ পড়লো । প্রায় আট/দশ গজ সামনে এক খানসেনাকে দেখলাম । সে ক্রলিং করে আমার দিকেই যেন আসছে । আমি হতভম্ব । কী করি ! মৃত্যু অনিবার্য । হঠাত্ দেখি সে একলাফে উঠে বসেই আমার দিকে অস্ত্র তাকে করলো । ততক্ষণে আমিও উঠে বসেছি । কিন্তু আমি অস্ত্র উঠানোর আগেই সে ফ্লাই করে ‘ইয়া-আলী’ বলে আমার ওপর বেয়নেট চার্জ করে । পরে ভেবেছি, ওর গুলি ছিলো না বলেই বেয়নেট ব্যবহার করতে চেয়েছিলো ।

আমি বাঁ-হাতে ওর রাইফেলের অগ্রভাগ ধরে ফেললাম । কোত্থেকে যেন এতো শক্তি আমার বাঁ-হাতে এসে গেছে ! সে অস্ত্র টান দিয়েই পেছনে চিৎ হয়ে পড়ে গেল । আমি এ-সুযোগে এসএলআরের একটি গুলি ছেড়ে দিলাম । মনে হলো খানসেনাটি চার/পাঁচ হাত ওপরে উঠে গেলো । দপাস করে পড়ে থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে খানসেনাটি লুটিয়ে পড়লো ।

আশপাশে চোখ বুলিয়ে এবার আমি মরণপণ দৌড়ে সামনের গভীর পাটক্ষেতের মধ্যে ঢুকে পড়ি । তারপর পাটক্ষেত, আখক্ষেত ছিঁড়েফুঁড়ে দৌড়ানোর এক পর্যায়ে আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেলি ।

পরের দিন জ্ঞান ফিরে আসতেই আমি দেখি, আমি রণাঙ্গন থেকে প্রায় দেড়মাইল দূরে তারাইল নামক গ্রামে আমারই এক আত্মীয়র বাড়িতে চিকিত্সাধীন । এ-বাড়ির লোকজন তাদের বাড়ির পুকুরপাড়ে আমাকে অচেতন অবস্থায় পায় । তখন আমি আবিষ্কার করি, পাকিসৈন্যটির বেয়নেটের আঘাতে আমার বাঁ-হাতের তালুতে গভীর ক্ষত সৃষ্টি হয়েছে——

স্বাধীনতার আগে-পর্যন্ত আমি বন্ধু শাহাবুদ্দিন আহমদ জনুর মৃত্যুসংবাদ তার মা-বাবাকে দেইনি । কী জবাব দেব—-ভেবে তাদের সাথে দেখাও করিনি । পাকিস্তানের বন্দিদশা থেকে বঙ্গবন্ধু ফিরে আসার বেশ কিছুদিন পর । আমি জনুর বাবা পোনা গ্রামের বাকা মিয়াকে নিয়ে বঙ্গবন্ধুর সথে দেখা করে ফুকরার যুদ্ধসহ জনুর সেই নির্মম মৃত্যু এবং তার শেষ আর্তির কথা জানাই । তখন যে কী হৃদয়বিদারক মর্মান্তিক অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিলো, তা আজো ভাষায় বর্ণনা করতে পারি না——।

—-আবীর আহাদ
লেখক গবেষক
চেয়ারম্যান, একাত্তরের মুক্তিযোদ্ধা সংসদ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here