সম্প্রতি ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সচিব আকরামুজ্জামান স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশের মাধ্যেমে এই নীতিমালা অনুমোদন দেয়া হয়। এ নীতিমালা জারির পর থেকে ডিএসসিসি কর্তৃক নতুন কোন কবরস্থান তৈরি করা হলে, সে কবরস্থানও এ নীতিমালার আওতায় পড়বে বলে জানানো হয়েছে।

নীতিমালায় বলা হয়েছে, প্রতিটি কবরস্থানের জন্য প্রস্তুতকৃত মহাপরিকল্পনা সংশ্লিষ্ট কবরস্থানে সংরক্ষণ ও প্রদর্শন করতে হবে। মহাপরিকল্পনা অনুযায়ী কবরস্থানের প্রতিটি কবরের নম্বর, সারি নম্বর ও রাস্তার নম্বর দেয়ার ব্যবস্থা থাকবে যাতে সহজে কবর শনাক্ত করা যায়। কবরস্থানের কবরসমূহ সাধারণ এবং সংরক্ষিত হিসেবে চিহ্নিত থাকবে। কবরস্থানে অগ্রিম কবর বা অগ্রিম কবরের জন্য জায়গা সংরক্ষণ সম্পূর্ণরূপে বন্ধ থাকবে। কবরস্থানের কোন স্থান বা কবরে কোনভাবে মাজার করা বা মাজার হিসেবে চিহ্নিত করা যাবে না। কবরস্থানে সাধারণভাবে সকাল ৬টা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত লাশ দাফন করা যাবে। তবে কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে এ সময়সীমার পরও লাশ দাফন করা যাবে।

কবরস্থানে দাফনকৃত ব্যক্তিদের একটি উপাত্ত-ভাণ্ডার ডিএসসিসি কর্তৃক পর্যায়ক্রমে তৈরি ও সংরক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। প্রতিটি কবরস্থানে জানাজার স্থান, লাশের গোসলের ঘর, অপেক্ষমাণ কক্ষ এবং ওজুখানা থাকবে। লাশ দাফনের সংখ্যার উপর ভিত্তি করে প্রযোজ্য ক্ষেত্রে ধর্মীয় অনুশাসন অনুযায়ী শরিয়ত সম্মতভাবে নির্দিষ্ট সময়-বছর পর পর কবর চলার মাধ্যমে নতুনভাবে তা ব্যবহারের উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে। প্রতিটি কবরের জন্য নিজস্ব সীমানা-আয়তন নির্ধারিত থাকবে। কবরস্থানের নিরাপত্তা, পবিত্রতা ও সুষ্ঠু পরিবেশ সংরক্ষণের বিষয়ে সিটি করপোরেশন প্রয়োজনীয়-যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। প্রতিটি কবরস্থানে লাশ দাফনের জন্য যথাযথ প্রক্রিয়ায় বাঁশ ও চাটাই সরবরাহ এবং কবর খনন কাজে ঠিকাদার নিযুক্ত করা থাকবে।

নিযুক্ত ঠিকাদার নির্ধারিত দর অনুযায়ী লাশ দাফনকারী ব্যক্তির কাছ হতে রশিদ প্রদান পূর্বক ব্যয় বাবদ অর্থ গ্রহণ করতে পারবে। তবে কোন লাশ দাফনকারী ব্যক্তি স্বেচ্ছায় নিজ উদ্যোগে বাঁশ, চাটাই এনে কবর দিতে পারবেন। এক্ষেত্রে শুধু কবর খননের নির্ধারিত মূল্য পরিশোধ করবেন।

কবরস্থানসমূহ ইজারা প্রদানের ক্ষেত্রে বাঁশ, চাটাই সরবরাহের দর ও কবর খননের মজুরি দফতরিক প্রাক্কলিত নির্ধারিত ব্যয় অফিসিয়াল কস্ট এস্টিমেট তৈরি করতে হবে (যা যথাসময়ের বাজার দরের সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে হবে)। কবরস্থানসমূহে প্রতিটি লাশ দাফনের ক্ষেত্রে অনুমোদিত ঠিকাদারের (বাঁশ, চাটাই ও কবর খনন) বিল ছাড়াও প্রতিটি লাশ দাফন বাবদ করপোরেশন কর্তৃক নির্ধারিত রেজিস্ট্রেশন ফি এক হাজার টাকা আদায় করা হবে। তবে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এ ক্ষেত্রে অন্যরূপ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলে তদানুযায়ী ব্যবস্থা গৃহীত হবে।

পূর্বে সংরক্ষিত কবরের জন্য বরাদ্দকৃত জায়গার পরিমাণ নির্ধারিত পরিমাপের অতিরিক্ত হবে না। কবর পাকা করার ক্ষেত্রে উক্ত বরাদ্দকৃত জায়গার বেশি জমি কোনক্রমেই ব্যবহার করা যাবে না এবং উচ্চতা হবে ছাদবিহীন অনধিক তিন ফুট হবে। বেওয়ারিশ লাশ দাফনের ক্ষেত্রে প্রকৃত খরচ ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন কর্তৃক বহন করা হবে। কবরে ছোট জাতের ফুল গাছ (বুশ জাতীয় গাছ) ব্যতীত অন্য কোন গাছ লাগানো যাবে না।

সাধারণ কবরের জন্য যে সব নীতিমালা থাকবে:

কবরস্থানে ‘সংরক্ষিত’ হিসাবে চিহ্নিত ব্যতীত অন্য সকল কবর ‘সাধারণ কবর’ হিসেবে বিবেচিত হবে। সাধারণ কবরের ক্ষেত্রে অনুমোদিত ঠিকাদারের লাশ দাফনের বিল ও নির্ধারিত কবর নিবন্ধন ফি প্রযোজ্য হবে। প্রতিটি কবরস্থানে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের স্মৃতি রক্ষার্থে সাধারণ কবরে দাফনকৃত কবর বিনা ফিতে পাকা স্থাপনা না করে দশ বছরের জন্য সংরক্ষণ করা যাবে। জুরাইন কবরস্থানে ১ দশমিক ৫ একর জায়গা মুক্তিযোদ্ধাদের লাশ দাফনের জন্য সংরক্ষিত থাকবে। এক্ষেত্রে প্রমাণ হিসেবে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সমন্বিত তালিকায় নাম থাকতে হবে এবং মুক্তিযোদ্ধা সনদ দাখিল সাপেক্ষে কর্তৃপক্ষের অনুমতিক্রমে উক্ত সময়ের জন্য সংরক্ষণ করা যাবে।

লাশ দাফনের প্রয়োজনীয়তার উপর ভিত্তি করে ধর্মীয় অনুশাসন অনুযায়ী ও শরিয়ত সম্মতভাবে যথাসময় পর সাধারণ কবর চালার মাধ্যমে নতুনভাবে ব্যবহারের উদ্যোগ গ্রহণ করা যাবে। ইতিপূর্বে মেয়াদ ভিত্তিক সংরক্ষিত কবরের নির্ধারিত মেয়াদ শেষে তা নবায়ন-সময় বর্ধিত না করা হলে তা সাধারণ কবর হিসেবে বিবেচিত ও ব্যবহৃত হবে। অস্বাভাবিক মৃত্যুর ক্ষেত্রে (গুলিবিদ্ধ, অস্ত্রের আঘাতে মৃত্যু, বিষ প্রয়োগে মৃত্যু, আত্মহত্যা, দুর্ঘটনায় মৃত্যু ইত্যাদি) জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের অনুমতি-ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন, পুলিশের ছাড়পত্র বা প্রত্যয়ন ছাড়া লাশ দাফন করা যাবে না।

সংরক্ষিত কবরের জন্য যেসব নীতিমালা প্রযোজ্য হবে :

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষ শুধুমাত্র (ক) জাতীয়-আন্তর্জাতিক পর্যায়ে স্বীকৃতিপ্রাপ্ত, বরেণ্য ব্যক্তিবর্গ ও খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা (খ) সমাজে বিশিষ্ট ভূমিকা, অবদান রাখা ও পদস্থ কর্মকর্তা এবং (গ) বিশেষ বিবেচনায় কোন ব্যক্তির দাফনকৃত কবর নির্ধারিত ফি পরিশোধ সাপেক্ষে ১০,১৫,২০ এবং ২৫ বছরের জন্য অস্থায়ী সংরক্ষণের জন্য বিবেচনা করতে পারবেন। এই নীতিমালার আওতায় সংরক্ষিত অথবা পূর্বে সংরক্ষিত বা স্থায়ী কবরের উপর নির্ধারিত ফি প্রদান সাপেক্ষে পুনঃকবর দেয়া যাবে। তবে সংরক্ষিত কবরের উপর দাফনকৃত ব্যক্তির পিতা, মাতা, স্বামী, স্ত্রী,পুত্র, কন্যা, ভাই, বোন ছাড়া অন্য কাউকে পুনঃকবর দেয়া যাবে না। সংরক্ষিত কবরের মধ্যে পুনঃকবর দেয়া হলে তার পূর্বের মেয়াদ বহাল থাকবে। তবে নির্ধারিত ফি প্রদান সাপেক্ষে সংরক্ষণের মেয়াদ বৃদ্ধি করা যাবে।

২৫ বছর মেয়াদী সংরক্ষিত করে অস্থায়ী বেষ্টনি নির্মাণ করা যাবে। তবে তার উচ্চতা ৩ ফুটের বেশি হবে না। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তা, কর্মচারীদের মৃত্যুর পর প্রথম পাঁচ বছরের জন্য বিনা ফিতে কবর সংরক্ষণ করা যাবে। এ ক্ষেত্রে প্রেষণে কর্মরত অথবা কর্মরত ছিলেন কর্মকর্তা, কর্মচারীদের জন্য এ বিধি প্রযোজ্য হবে। তবে নীতিমালার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মেয়াদভিত্তিক কবরের মেয়াদ সংরক্ষণ করা যাবে। সংরক্ষিত কবরের বরাদ্দ কোনোক্রমেই কোনরূপ দান, ক্রয়, বিক্রয় বা অন্য কোনো উপায়ে অপর কোন ব্যক্তিকে (বরাদ্দ গ্রহীতা বা তার পিতা, মাতা, স্বামী, স্ত্রী, পুত্র,কন্যা, ভাই, বোন ব্যতীত) হস্তান্তর করা যাবে না।

সংরক্ষিত কবরের সংরক্ষণ ফি কত হবে:

ক, খ, ও গ ক্যাটাগরিতে চিহ্নিত ব্যক্তিবর্গের কবরের সংরক্ষণ ফি ১০ বছরের জন্য হবে ৫ লাখ, ১৫ বছরের জন্য ১০ লাখ, ২০ বছরের জন্য ১৫ লাখ এবং ২৫ বছরের জন্য কবরের সংরক্ষণ ফি হবে ২০ লাখ টাকা। সেই সঙ্গে সংরক্ষিত কবরের পুনঃকবর ফি হবে ৫০ হাজার টাকা।

জানা গেছে, ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের নিয়ন্ত্রণাধীন কবরস্থানসমূহে কবর সংরক্ষণ করার আবেদনসমূহ নীতিমালার আলোকে মেয়রের নির্দেশক্রমে উপস্থাপন করা যাবে। দাফনকৃত ব্যক্তির তথ্যাবলী সম্বলিত উপাত্ত-ভাণ্ডার তৈরি করতে হবে, যা সিটি করপোরেশনের ওয়েবসাইটের মাধ্যমে জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত থাকবে। সেখান থেকে মুদ্রিত অনুলিপি নিয়ে মৃতব্যক্তির আত্মীয়স্বজনরা প্রযোজনীয় ক্ষেত্রে ব্যবহার করতে পারবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here