কেমন যাচ্ছে ক্যাম্পাসিয়ানদের কোয়ারান্টাইন!

Share It
  • 4
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    4
    Shares

করোনা মহামারীর কারনে বন্ধ রয়েছে বাংলাদেশের সকল পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়। এজন্য ঘরে বসেই দিন কাটাতে হচ্ছে শিক্ষার্থীদের। এসময়ে অনেকে অনেক ধরনের কাজ শিখছে। কোয়ারান্টাইন থেকে শিক্ষার্থীরা কিভাবে তাদের দিন অতিবাহিত করছে, এ ব্যাপারে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু তরুণ তরুণীকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল। কেউ কেউ স্মৃতিচারণা করেছে ক্যাম্পাসের আড্ডা,কিংবা সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাস ধরে ক্যাম্পাস এসে ক্লাস করা।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সাফওয়ান জারিফ বলেন, “চল চল জোড়ে চল সময়ের তালে চল
যদি নিতে চাও তোমাকে গন্তব্যে
ভাগো ভাগো জোড়ে ভাগো মামা গাড়ি জোড়ে টানো
আজ কপালে যে শনি লেখা আছে।”
মাস কয়েক আগের কথাই বলছি। তখনও শূন্য ব্যান্ড এর এই গানের কথাগুলো যেনো ছিলো প্রতিদিনের জীবনের লিরিকাল চিত্রায়ন। ছন্দ থাকুক আর না থাকুক , তাল ও লাগলে না থাকুক কিন্তু চায়ের কাপে চুমুক , আড্ডা , ক্লাস – পড়াশোনা , টিউশন করে দিন কিন্তু পার হয়ে যাচ্ছিলো চোখের পলকেই। হঠাৎ করে এই অনাকাঙ্খিত বন্ধ সেই মহাব্যস্ত জীবন কেই থামিয়ে দিয়েছে। দিন কীভাবে পার করা যায় তাও এখন একটি চিন্তার বিষয় বটে! ব্যক্তিগতভাবে জীবনে তাল বা ছন্দ ফেরানোর মতো সাহস আমি করছি না। হালকা পাতলা লেখালেখি করার চেস্টা চলছে। ডাইরি কিংবা নোটবুক পর্যায়ের ব্যাপার ও ঠিক না , এলোমেলো লেখা লিখে চলেছি। এছাড়াও , ফোন কল , ভিডিও কল এ বন্ধুদের সাথে রাখছি নিয়মিত যোগাযোগ। এবার আসা যাক অন্যদের অভিজ্ঞতা নিয়ে। বেশিরভাগ এর কাছ থেকেই জানতে পেরেছি তারা সময় পার করছে বিভিন্নরকম বই পরে। কেউ সাহিত্য, কেউ ফিক্শন, কেও থ্রিলার আরো কত কি! অনেকটা স্কুল জীবনের বার্ষিক পরীক্ষা শেষ হওয়ার মতোই অবস্থা। তবে সবথেকে ইন্টারেস্টিং তথ্য পেয়েছি আমার এক সহপাঠির কাছে থেকে। সে ভালো কিছু অভ্যাস আয়ত্ত করবার চেষ্টায় আছে। ইউটিউব দেখে প্রতি ১৫ দিনে সে নতুন কিছু শিখে সময় পার করছে। আবার ঢাকা থেকে নিজ বাড়িতে ফিরে গিয়ে অনেকেই পরিবার এর সঙ্গে পার করছেন সুন্দর সময়। পরিবার ও তাদের একজন সদস্য কে একটা লম্বা সময়ের জন্য কাছে পেয়ে বেশ খুশি। তবে সঙ্গী আছে নানান রকমের দুশ্চিন্তা। যাই হউক , দুশ্চিন্তা জীবনের অংশ। সে সুবোধ বালক না যে তাড়িয়ে দিলে চলে যাবে। এর মাঝেই খুঁজে নিতে হবে জীবনের মানে। এই মহামারী অনেক কিছুই আমাদের শিখিয়েছে যা  মেনে চলতে হবে পরবর্তী দিনগুলো তে। হয়তো একদিন সব ঠিক হবে।
জমবে পুরনো আড্ডা, পরীক্ষা চলবে, হবে ক্লাস। ব্যস্ত হয়ে যাবেন সকলেই।
হয়তো আবার একদিন সূর্যাস্ত দেখে ক্লান্ত শরীর বলবে, ” আর কতো?”।
চট্রগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪র্থ বর্ষের শিক্ষার্থী আহমেদ উল আবরার বলেন, আমাদের ৪র্থ  বর্ষের ফাইনাল পরীক্ষা তিনটা বাকি থাকতেই করোনার প্রকোপের কারনে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হয়ে যায়। বাবা মাকে সাধারনত দুই ইদ ছাড়া দেখা হয় না। এই বার বাবা মার কাছে অনেক দিন যাবত আছি।  একজন সন্তান হওয়াতে বাবা মাকে  কাজে  সাহায্য করার যে আগ্রহ ছিল তা পরিপূর্ণভাবেই এই কোয়ারেন্টিনে করতে পেরেছি। প্রথম ২ মাসের মত একেবারেই অলস বসে ছিলাম । এর পরে লকডাউন খুললেই চাকরীর পড়াশুনার বই কিনে আনি এবং Graphics Design এর  অনেকগুলো অর্ডারের কাজ করছি , এখনো করছি। পাশাপাশি  ‘Sociology Career Club’  খুলে ডিপার্টমেন্টের সবার জন্য একাডেমিক পড়াশুনা নিয়ে  লাইভ সেশনে শিক্ষকদের মাধ্যমে  একাডেমিক পড়াশুনার কার্যক্রম এবং ক্যারিয়ার বিষয়ক নির্দেশনা দিচ্ছি সিনিয়ারদের মাধ্যমে। যাতে ঘরে বসে তারা অনলাইনের ভিডিও দেখে পড়াশুনা করতে পারে।
নোবিপ্রবির শিক্ষার্থী রিহাদ বিন হক জানায় তার কোয়ারান্টাইন গল্প, তিনি বলেন ক্যাম্পাস ছেড়ে আসার ১০০তম দিনটিও অতিবাহিত হয়েছে। মার্চ এর ১৬ তারিখ যখন বাসায় আসার জন্য গাড়িতে উঠলাম,তখনো ভাবতে পারিনি দুই সপ্তাহের এই ছুটিটা এতদূর গড়াবে।বরঞ্চ সিটি এসাইনমেন্টের ব্যাস্ততা গুলো থেকে নিস্তার পেয়ে বেশ ভালোই লাগছিলো। ঘরবন্দী থাকার প্রথম মাসটি ছিলো আমার কাছে সবচেয়ে বেশি বিরক্তিকর, একঘেয়ে। কিন্তু এখন ধীরে ধীরে ব্যাপার গুলো গায়ে সওয়া হয়ে গেছে। সকালে অনলাইন ক্লাস, ফোন কিংবা সোশ্যাল মিডিয়ায় বন্ধুদের সাথে আড্ডা আর বিকালে শখের ঘুড়ি উড়ানো কিংবা কখনো নাক ডেকে লম্বা ঘুম। সন্ধ্যার পর পরিবারের সবাই বসে হাসি ঠাট্টা, সচারাচর যেটা হয়ে উঠেনা। এছাড়াও সবচেয়ে বেশি উপভোগ করছি আম্মুর থেকে বিভিন্ন রান্না শেখাটা। এতসবের মাঝেও আমার ব্যাস্ততম দিনগুলো খুব মিস করি। সকাল ৮টার বাস ধরতে না পারায় ৯টার ক্লাসে ৫ মিনিট দেরিতে ঢুকা, দুপুরের ঘুমজড়ানো বিরক্তিকর ক্লাসগুলো, ক্যান্টিনের চা এর আড্ডাগুলো, ক্লান্ত হয়ে ৫টার বাসে মেসে ফেরা কিংবা সন্ধ্যায় টং দোকানের সময়গুলো। শরীরের দূরত্ব বাড়লে হয়তো মনের দূরত্ব কমে, তাই সোশ্যাল মিডিয়ায় বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেওয়ার সময় কোথায় যেনো অপূর্ণতা অনুভব হয়। আশা করি খুব শীঘ্রই সুস্থ পৃথিবীর স্বাভাবিক জীবনযাপনে ফিরবো আমরা।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেক শিক্ষার্থী অনুজীববিজ্ঞানের আফসারা বিনতে রশিদ বলেন, বছরের শুরু থেকেই ক্যাম্পাস লাইফটা বেশ ভালোই উপভোগ করছিলাম। ছোট পরিসরের ক্যাম্পাস দেখেই যেন বন্ধুত্বটা আরো দৃঢ়তা লাভ  করে। কিন্তু আমাদের জীবনের সব কিছুই অনাকাঙ্ক্ষিত। তাই এই বছরটাও অনাকাঙ্ক্ষিত হয়ে রইল।
অনেকদিন  ক্যাম্পাসের সাথে বিচ্ছিন্ন থাকা হলেও এই সময় টা  পরিবারের সাথে খুব ভালো সময় কাটছে যা হয়তো ইউনিভার্সিটির ব্যস্ততার কারণে হয়ে ওঠেনি। এখন বাসায় আছি। আম্মুকে বিভিন্ন কাজে সাহায্য করার চেষ্টা করছি, নিজের অনেক সখ যা সময়ের অভাবে করা হতো না তা এখন কিছুটা করে সময় কাটাচ্ছি। সারাদিন ঘরবন্ধি হওয়ার কারনে যখন খুব হতাশ লাগে তখন নিজের সখের কাজ গুলো  করি,মেডিটেশন করি,সর্বপরি একটা রুটিনমাফিক  জীবন গড়ার চেষ্টা করছি। তাছাড়া ছোট বেলার বন্ধু- বান্ধবদের সাথে এখন কম বেশি যোগাযোগ হচ্ছে। মাঝেমধ্যে একটু বই নিয়ে পড়তে বসার ব্যর্থ চেষ্টাও করা হয়। অনুজীববিজ্ঞানের ছাত্রী হওয়ার সূূত্রে এখনকার যে মহামারি চলছে তা নিয়ে বিভিন্ন জার্নাল পড়েও সময় কাটাচ্ছি।
এখন যেই সময় তা পাড় করছি তা আমাদের সবার জন্যই  খুব কঠিন। আমাদের মত ছাত্রছাত্রীদের জন্য আরও বেশি ফ্রাস্ট্রেটিং। কিন্তু এইসব কিছুর পরেও খারাপ-ভাল মিলিয়েই মানিয়ে নেয়ার চেষ্টা করছি। অনেক অভ্যাস পরিবর্তন করে  নিজেকে সুস্থ পরিবেশে মানিয়ে গুছিয়ে নেওয়াও অনেক বড় ব্যাপার যা হয়তো এই কোয়ারান্টাইনে না থাকলে বুঝতে পারতাম না। এরপরেও নিজের ক্যাম্পাসের অনেক স্মৃতি মনে পড়ে।  আবার যখন সব ঠিক হয়ে যাবে, পৃথিবী সুস্থ হবে তখন নতুনভাবে নিজেকে  সবার সামনে তুলে ধরতে পারবো  ইনশাআল্লাহ।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ২য় বর্ষের শিক্ষার্থী ইমতিয়াজ জাহান প্রিয় বলেন, ২০২০ বছরটা শুরু থেকে ভালোই যাচ্ছিল। হঠাৎ করেই চীনের উহান প্রদেশে করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার কথা শোনা গেল। তারপর সংক্রমণ বাড়তে বাড়তে অন্যান্য দেশগুলিতে ছড়ানোর পর মার্চেই আমাদের দেশেও প্রথম শনাক্ত হল। স্থবির হয়ে পড়তে লাগল সবকিছু। মার্চের মাঝামাঝি সময় থেকেই বন্ধ হয়ে গেল প্রিয় জাহাঙ্গীরনগর ক্যাম্পাসও। তারপর থেকেই না চাইতেও শুরু করতে হলো কোয়ারান্টাইন সময়। কোয়ারান্টাইনটা আসলে শুরু থেকে ভেবেছিলাম এই কাজ,সেই কাজ অনেক কিছুই করে ফেলব। কিন্তু যেমনটা ছিলো ভাবনা,সে অনুযায়ী পুরোপুরি তেমনটা সম্ভব হয়ে ওঠে নি। তাও এই সময়টার মধ্যে কিছুটা একাডেমিক পড়াশুনার পাশাপাশি অনলাইন ভিত্তিক ট্রেইনিং প্রোগ্রামে অংশ নিচ্ছি যা উপকারী খুব। রমজান মাসে ভালো একটা সময় কুরআন তিলাওয়াতের মধ্যে দিয়ে গেল। এছাড়াও কম্পিউটারে কাজ শিখা, ফেউসবুক-ম্যাসেঞ্জার, কিছুক্ষণ গেমস খেলা, ইবাদত করা, চাচাতো ভাই-বোনদের সাথে আডডা, দুষ্টুমি, খেলা এসব মিলিয়ে মোটামুটি ভালোই যাচ্ছে কোয়ারান্টাইনের সময়গুলো। তবে মিস করি খুব নিজের ক্যাম্পাসটাকে।  কতই ভালো সময় কেটেছিল, সেগুলো এখন মনে পরে প্রায়ই। তাও আল্লাহর কাছে প্রার্থনা সবকিছু স্বাভাবিক হয়ে গেলে আবার একদিন নতুন ভোরে প্রানপ্রিয় ক্যাম্পাসের উদ্দেশ্যে যাত্রা করব,কিছু ভালো সময় কাটাব বড় ভাই-বন্ধুদের সাথে। আবার আগের মত প্রাণবন্ত হয়ে উঠবে সবকিছু,ইনশাআল্লাহ।।

Share It
  • 4
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    4
    Shares

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here