অথচ সেদিন আমার মনে হচ্ছিলো রাহিমকে আমি মেরে ফেলি; অসহ্য এক যন্ত্রণার ভেতর দিয়ে যাচ্ছিলাম আমি। এতোটা যন্ত্রণা যা আমার বুকে বাবলা গাছের সূঁচালো কাঁটার মতো বিঁধছিলো। আমি পাগল হয়ে হয়ে যাচ্ছিলাম, নিজেকে বড্ড উন্মাদের মতো মনে হচ্ছিলো। আচ্ছা! সেদিন কিইবা এমন হয়েছিলো? আর কেনইবা আমি রাহিমকে মেরে ফেলতে চাচ্ছিলাম? কোনো রকম ভণিতা না করেই সেটা বলে ফেলি।
আমার স্বামী কোনো লাঙের কাছে গেলে কি সেই দায়ভার উপর পড়ার কথা ছিলো? আমার মেজাজ বিগড়ে গিয়েছিলো আমার বুড়ো শ্বাশুড়ীর কথা শুনে। আমি দশদিনের মতো আমার বাপের বাড়ি গিয়েছিলাম। সাথে আমার দুই মেয়েকেও নিয়ে গিয়েছিলাম। আমি যখন গ্রামে ছিলাম, তখন দেখতাম রাহিম সারারাত অনলাইনে সক্রিয় থাকতো, আমার ফোন কেটে কেটে দিতো। রাহিমের ফেসবুক আইডির পাসওয়ার্ড আমি জানতাম। আমি ওর আইডিতে ঢুকে দেখতাম ওর আর নিদ্রার কথোপকথন। নিদ্রা ছিলো অনার্স চতুর্থ বর্ষের পড়ুয়া এক মেয়ে। মাত্র দুইরাতে ওরা এতোটাই একে অপরের কাছে এসেছিলো যে আমি আর মেনে নিতে পারছিলাম না। রাহিম গান শুনাতো আর নিদ্রা তার ভেজাচুলের ছবি পাঠাতো। রাহিম হয়তো জানতো না যে আমি সবকিছুই দেখতে পাচ্ছিলাম। রাহিম আর নিদ্রা এতোটাই গভীর আলাপে মেতে থাকতো যে আমার গত আট-দশ বছরের সংসার জীবনেও আমি রাহিমের এতো গভীরে যেতে পারি নি কখনো। আমার মেজাজ তো ফুলে ঢোল হয়ে যেতে লাগলো। মেজাজ ফুলে ঢোল হবে না তো কী হবে – আমি থাকতে রাহিম কেনো আর একজন মেয়ের মাসিকের খবর নিতে যাবে – এইসব ভেবে আমি কষ্ট পাচ্ছিলাম। এতোটাই কষ্ট পাচ্ছিলাম যে ইচ্ছে হচ্ছিলো ওর হৃৎপিণ্ডটি টেনে বের করে ফেলি তখন। আমি তার পরের রাতেই গ্রাম থেকে ফিরে আসি। রাহিমকে কোনো রকম সংকেত দেওয়া ছাড়াই বাসায় ঢুকতে চেয়েছিলাম। তবে সেটা আর সম্ভব হয় নি। আমরা কাছাকাছি আসতেই বাস নষ্ট হয়ে গিয়েছিলো। আমি রাহিমকে ফোন করলাম। রাহিম এসে আমাদেরকে বাসায় নিয়ে আসলো।
আমি বাসায় ফিরে রাহিমের সাথে কোনো রাগ না দেখিয়েই থাকলাম দু’য়েকদিন। তবে আমার মাথা বিগড়িয়ে গিয়েছিলো রাহিমের একটা গল্পের খসড়া দেখে। যে খসড়াটা ছিলো নিদ্রা আর রাহিমের দুইরাতের ফেসবুক ম্যাসেঞ্জারের আলাপনের উপর ভিত্তি করে লেখা। আমি দেখলাম ঐ লেখাতে আমি পুরোপুরিই খলচরিত্রের। আমি রাহিমকে দু’য়েকদিন বোঝাতে চেষ্টা করলাম, বুকের ভেতর জড়িয়ে আদর করতে লাগলাম। রাহিমও দেখি আমাকে খুব আদর করছিলো। এতো স্বত:ফূর্ততা আমি রাহিমের মধ্যে আগে আর দেখি নি। রাহিমের এমন অবস্থা দেখে আমার মনে সন্দেহ জাগতে শুরু করে। যদিও আমি সবই জানতাম, তবুও আমি চাচ্ছিলাম যে রাহিম আমাকে নিজ থেকে সবকিছু বলুক। আমি বলি, ‘তুমি ঐ মেয়ের সাথে শারিরীক সম্পর্ক করেছো?’ রাহিম উত্তর দেয়, ‘কোন মেয়ে? ওটা তো গল্প ছিলো?’ আমি রাহিমকে বিশ্বাস করতে পারলাম না। কেননা গল্পের সংলাপে যা ছিলো তা বাস্তবতা বিচ্ছিন্ন ছিলো না। বিশেষ করে পুরুষ চরিত্রের সংলাপ তো একেবারেই বিশ্বাস হচ্ছিলো না আমার। আমার মনে হচ্ছিলো ওগুলো সব রাহিমের কথা ছিলো। আর এমন কোনো এক কথার রাতেই আমি রাহিমের প্রেমে পড়েছিলাম, আমাদের বিয়ে হয়েছিলো।
এইভাবে আমাদের ক’য়েকদিন পার হয়ে গেলো। আমি একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে রেগে গেলাম। রেগে গেলাম রাহিমের একটা কথাতে। রাহিম বলেছিলো, ‘মিলি আমি অফিসে যাবো। আমার কিছু কাজ রয়েছে।’ আমি বললাম, ‘এখন তো ছুটি। কেনো যাবে? কাজ আছে তো বেশ। তুমি বাসায় বসে করো। বেডরুমে বসতে না চাইলে রিডিং রুমে যাও, রিডিং রুম ভালো না লাগলে তুমি ছোট রুমটাতে যাও। আর সেখানেও যদি ভালো না লাগে ড্রয়িংরুমে যাও, ডাইনিংয়ে যাও। আর একান্ত না হলে সার্ভেন্ট রুমটাতে যাও।’ রাহিম আমার কোনো কথা না শুনেই মেয়ে দু’টোকে রেখে চলে গেলো তার অফিসে। অফিস থেকে বাসার দুরত্ব বেশি ছিলো না, তবুও রাহিম সেদিন খেতে আসে নি। এভাবে ক’য়েকদিন যেই পার হলো, আমি আমার ধৈর্য্যের সীমানা ভেঙে ফেললাম। আর পারছিলাম না আমি।
সেইরাতেই রাহিমের সাথে আমার কথা কাটাকাটি হয়েছিলো। রাত তিনটে পর্যন্ত কথার পাল্লা শেষ করে ঘুমিয়ে পড়লাম। সকালে ঘুম ভাঙলে রাহিম আমার উপর বিরক্ত দেখাতে থাকে। আমি রাহিমের লম্বাচুলগুলো টেনে ধরে গালে থাপ্পড় লাগাতে থাকি। ‘আমার মেয়ে দু’টোকে অন্য কাউকে দিতে চাও – না? ঐ কচি মাগির আর তোমার এতো সখ আমার বাচ্চাদের মা-বাবা হওয়ার?’ – এই বলে আমি রাহিমকে থাপড়াতে লাগলাম। একসময় রাহিম বাসা থেকে বের হয়ে গেলো। সেদিনে, সেরাতে সে আর বাসায় ফিরলো না। ফোনটাও বন্ধ করে রেখেছিলো।
এরপর দেখি সকালে সে টলতে টলতে বাসায় ফিরলো। আমি কিছুই বললাম না। মেয়ে দু’টোকে রাহিম খুব যত্ন নিয়ে আদর করছিলো, ওদের সাথে খেলছিলো। আমি রাহিমকে খেতে দিলাম। দুপুরে আমি বললাম আমার সাথে ঘুমোতে। ও ঘুমোলো না আমার সাথে। ও ছাদে চলে গেলো গাছে পানি দিতে।
রাহিম শুধু বাইরে যাওয়ার জন্যে ছটফট করতো। বাইরে গিয়ে মনে হয় প্রথম ফোনটি ঐ মেয়েকেই করতো। একদিন তো ওদের আলাপনের ধরণ দেখে আমি পাগলের মতো হয়ে গেলাম। রাহিম কোথায় কথা বলতো, কার কাছে ফোন দিতো – আমি সবই জানতাম। শুধু রাহিম জানতো না যে আমি সব জানতাম। ওদের আলাপনের দু’য়েকটা কথা বলতে মন চাচ্ছে এখন। রাহিম কল দিলো। নিদ্রা কল রিসিভ করলো।
রাহিম: হ্যালো।
নিদ্রা: হ্যালো। কি খবর?
রাহিম: আমার কিছুই ভালো লাগছে না। তুমি কেমন আছো?
নিদ্রা: এইতো ভালো আছি।
রাহিম: তোমার ওরা কেমন আছে?
নিদ্রা: মানে?
রাহিম: তোমার আশি হাজার ভাঁজের ঠোঁট দু’খানা, চিবুকের চওড়া, বুকের নরম আর লাভার নদী – ওরা ভালো আছে?
নিদ্রা: হুম! কিভাবে ভালো থাকবে? আপনাকে ছাড়া যে ওরা ভালো থাকতে পারে না, ভালো নেই। আপনি খুব দুষ্টু!
রাহিম: আমি আবার কি দুষ্টুমি করলাম!
নিদ্রা: কিছু না।
রাহিম: আমি কি এগুলো বলে অপরাধ করেছি?
নিদ্রা: অপরাধের কথা বলতে তো আমাদের যোগাযোগই হওয়ার কথা না। সবকিছু ডিঙিয়েই তো চলছে। চলুক না।
রাহিম আর নিদ্রার এমন আলাপন আমি আর নিতে পারছিলাম না। মাথায় আগুন উঠে যাচ্ছিলো আমার।
ঐরাতেই আমি রাহিমের ফোন চেক করলাম। দেখলাম কল লিস্টে নিদ্রার ফোন নম্বর নেই। রাহিম মুছে ফেলেছিলো।
পরেরদিন সকালে আমার শ্বাশুড়ী আর রাহিম ফোনে কথা বলছিলো। আমার বড় মেয়ে ফোনটি এনে আমার হাতে দিলো। আমি শ্বাশুড়ীকে সব খুলে বলি। অনেক কথার পরে দেখি শ্বাশুড়ী আমাকেই দোষ দিতে থাকে। আমি রেগে গেলাম -ভাতার লাঙ করলে বা কোনো ছিলানের কাছে গেলে বউরা কেনো সেই দায় নিবে – বলে ফোন কেটে দিলাম।
আমার বুড়ি শ্বাশুড়ীটার কথা শুনে নিজের মধ্যে বিশেষ চাপ অনুভব করলাম। মনে হচ্ছিলো নিদ্রার সাথে রাহিমের সম্পর্কে জড়ানোর জন্যে সবাই আমাকে দায়ী করছিলো; আমার শশুর আমাকে দায়ী করছিলো, আমার ননদ আমাকে দায়ী করছিলো, আশেপাশের অন্যান্য মানুষজনেরা আমাকে দায়ী করছিলো, আমার মেয়েরা আমাকে দায়ী করছিলো, আমার বাসার থালাবাসন আসবাবপত্র ইটের দেওয়াল – সবকিছুই আমাকে দায়ী করছিলো। আমি কেন রাহিমকে ধরে রাখতে পারছিলাম না – এই দায়ে আমাকে দায়ী করে চলছিলো। আমি ঐদিনটাও খুব ধৈর্য্য নিয়ে থাকলাম। হয়তো রাহিম সাবধান হবে আর নিজে থেকেই ফিরে আসবে সংসারে – আমি শুধু এটাই ভাবছিলাম। আমার ভাবনা ভুল হয়ে হয়ে যাচ্ছিলো। আমি দেখতাম নিদ্রা আর রাহিমের ব্যাপারটা দিন দিন মাখনের মতো গাঢ় হচ্ছিলো।
একদিন রাহিম সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে গাছে পানি দিলো। বাসায় ঢুকে খুব উৎফুল্ল হয়ে গান গাচ্ছিলো। আমার শরীরে আগুন লেগে যাচ্ছিলো, ঠিক যেমন আগুন আমাজান বনে লেগেছিলো। ‘পাথরের পৃথিবীতে কাচের হৃদয়, ভেঙে যায় যাক তার করি না ভয়, তবু প্রেমের তো শেষ হবে না।’ – রাহিমের কণ্ঠের এইগান আমার মেজাজে আরও আগুন ঢেলে দিয়েছিলো। আর ওর ভেতরের আত্মবিশ্বাস আর চোখমুখের ভাষা রীতিমত আমার মটকায় ঘি ঢেলে দিয়েছিলো।
আমি রাহিমের চুল চেপে ধরে পিঠের উপর সমানে কিল থাপ্পড় দিতে থাকলাম। রাহিম চাইলেই কিন্তু প্রতিরোধ করতে পারতো বা আমাকেও দু’য়েকটা বসিয়ে দিতে পারতো। রাহিম দেখলাম নীরব ছিলো। সে পড়ে পড়ে আমার কিল আর লাথি খাচ্ছিলো। আমি ওর পাছায় গুনে গুনে চারটে লাথি মারলাম। আর কোমর বরাবর আরেকটা লাথি মারতেই ও গুঙিয়ে গুঙিয়ে কান্না শুরু করলো। ‘নাটক করছিস না?’ – এই বলে ওর পিঠে ঠিক হৃৎপিণ্ডের উল্টো পাশে আরও একটা লাথি দিলাম। ও কাশতে লাগলো। এরপর আমি খুব জোরে ওর পেটে লাথি মারলাম। মনে হচ্ছিলো আমার পা ওর নাড়িভুঁড়ি অতিক্রম করে শিরদাঁড়া ছুঁয়ে আসলো। এরপর আমি ওর বুকের বামপাশে লাথি দিলাম। যেখানে আমি এতোদিন ধরে ছিলাম, ঠিক সেই জায়গাতে। এরপর ওর ঘাড়ে লাথি দিলাম। ও উপুড় হয়ে শুয়েছিলো। আমি ওর পা ভাঙতে চেয়েছিলাম – ও যেনো আর বাইরে যেতে না পারে – এই ভেবে। আমি খাটের লম্বা তক্তার ধারে ওর পা এনে ভাঙতে থাকি। ‘জাওরার পা। ভাঙে না। খালি কেলিয়ে যায়।’ – এই বলে আবার আরেক ঘা দিতেই ও পা টেনে নিলো। ব্যথায় চিৎপটাং হয়ে ও জোরে জোরে কান্না করতে লাগলো। ওর মুখে গামছা ভরে শব্দ নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করলাম। এমনিতেই সরকারী কোয়ার্টারে থাকি যদি কেউ চলে আসে – এই ভেবে। ‘দাঁড়া কাপড়-চোপড় নিয়ে আসি। আজ তোকে ঐ মাগির কাছে পাঠিয়ে দেবো। তোর খুব সখ ওর সাথে কটেজে রাত কাটানোর।’- একথা বলে আমি রুমের বাইরে আসতেই রাহিম ওপাশ থেকে দরজা বন্ধ করে কান্না করতে লাগলো। তখন রাহিমের কান্নাতে আমার ভেতরে কিছুই হচ্ছিলো না, মনে হচ্ছিলো আমি একটা জারজকে মারছি, এক নটির বাচ্চাকে মারছি – যেভাবে রাস্তায় মার খায় পিতৃকূলের পরিচয়হীন কোনো শিশু।
রাহিম শুধু খকখক করে কাশছিলো, আমি কোনো কষ্ট পাচ্ছিলাম না তখন। আর কষ্ট কেনইবা পাবো তখন? রাহিমের মনটাতো আমার জন্যে ছিলো না, আমার প্রতি ওর কোনো টান ছিলো না।
প্রায় ঘণ্টাখানেক কান্না করে রাহিম বের হয়েছিলো। আমার বাসার কাজের খালার কথাশুনেই মনে হয় এসেছিলো রাহিম। রাহিম ওর কেলিয়ে যাওয়া পায়ে জীবাণুনাশক নিয়ে লাগালো। হাত-মুখে পানি দিয়ে খালি গায়েই ছাদে চলে গেলো সিগারেট টানতে।
কিছুক্ষণ পরে আমি ছাদে গেলাম। দেখলাম রাহিম আর ওর একজন সহকর্মী বসে বসে সিগারেট ফুঁকছে। আমি রাহিমের পাশে গিয়ে দেখি ওর পিঠে লাথি আর কিলের দাগ জ্বলজ্বল করছিলো। ‘যদি ওর সহকর্মী ওর পিঠের এই দাগ দেখে ফেলে তাহলে কি হবে?’ – এইভেবে একটু লজ্জ্বা পাচ্ছিলাম।
আমি মানসিক পরাজয় মেনে নিতে পারছিলাম না। ‘সামান্য একটা মেয়ের প্রেমে পড়ে রাহিম আমার দশবছরের সংসার ভুলে যাবে, আমাকে ভুলে যাবে?’ – এইসব ভেবে ভেবে আমি পাগল হয়ে যাচ্ছিলাম।
সেদিন রাহিম আর বাসায় ফিরলো না। তিনদিন পর বাড়িতে ফিরলো।
অনেক ঝামেলা বয়েই তিনচার মাস পার হয়ে গেলো। আমি ইতোমধ্যে রাহিম আর নিদ্রার সম্পর্ক নিয়ে ঠাণ্ডা মাথায় চিন্তা করলাম। ‘কেউ কারোর প্রেমে পড়লে তাকে দায়ী করা যায় না।’ – আমি রাহিম আর নিদ্রার সম্পর্ককের মধ্যে আর দোষের কিছু দেখলাম না। আমার কি কোনো দোষ ছিলো? না আমারও কোনো দোষ ছিলো না। রাহিমেরও দোষ ছিলো না, নিদ্রার হয়তো ছিলো না।
এতো দু:খের মধ্যেও আমার জন্যে একটা সুখের খবর ছিলো। আমি একটা চাকরী পেয়েছিলাম। আমার দুই মেয়েকে নিয়ে আমি সেখানে উঠেছিলাম। আমার বৃদ্ধ বাবা-মাকেও আমি সাথে করে নিয়েছলাম। রাহিমও পিএইচডি করতে চলে গিয়েছিলো। নিদ্রা রাহিমের সাথে গিয়েছিলো কি গেলো না – তা আমি জানতাম না। আমি শুধু এটা জানতাম যে রাহিমের সাথে আমি যাই নি বা সে আমাকে যাওয়ার জন্যে বলে নি।
আমি আমার দুই মেয়েকে নিয়ে ভালো আছি। আগের মতো অর্থের জন্যে রাহিমের উপরে নির্ভরশীলতা নেই আমার। মাঝে মাঝে রাহিম মেয়েদের লেখাপড়ার খরচ পাঠায়। এতে আমি বাধা দিতে পারি না। আমার মেয়েরা – ওরাতো রাহিমেরও মেয়ে। রাহিম দায়িত্ব পালন করছে। এতে ওর সুখ আছে। আমার কোনো সুখ নেই এতে, নেই কোনো দু:খও। রাহিমকে ছাড়াই ভালো আছি। আমার জীবনে রাহিমের কি প্রয়োজন – তা আর বুঝতে চাই না। কত মেয়েই তো পুরুষ ছাড়া থাকে? আমিও থাকছি।
শুনেছি রাহিম আর দেশে ফেরে নি। অস্ট্রেলিয়ার কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে নাকি পড়ানোর সুযোগ পেয়েছে। রাহিম ছিলো আপদমস্তক এক পাগল। ওর পাগলামী আমাকে একসময় খুব মাতিয়ে রাখতো। কিন্তু ওর পাগলামী যখন নিদ্রাকে মাতাতে লাগলো, তখন আমি মানসিক এক চাপে পড়েছিলাম। রাহিমকে আমি ধরে রাখতে চেয়েছিলাম, তাই ওকে আঘাত করেছিলাম খুব। আমি চাইলে দু’য়েকজন অতিউৎসাহী উকিল ধরে রাহিমের নামে একটা মামলা ঠুকে দিয়ে ওর ক্যারিয়ার নষ্ট করতে পারতাম। আমি তা করি নি। মামলা দিলে কি ও আমাকে আবার মন দিতো? আমাকে ভালোবাসতো আগের মতো? আমি ভেবেছিলাম রাহিম আমার কাছে এমনিতেই ফিরবে তখন। রাহিম ফেরে নি বরং সে তার মতো স্বাধীন হয়ে চলেছে। আমিও চার দেওয়ালের বন্দীদশা থেকে বের হয়ে নিজের মতো করে বাঁচার চেষ্টা করে চলেছি। নিদ্রার খবর আমি জানি না। জানতেও চাই না। ওর কথা ভাবলে আমার মানসিক চাপ বাড়ে।
অথচ একটা সময় আমি কতোটা পাগল ছিলাম রাহিমের জন্যে। রাহিম কতোটা পাগল ছিলো আমার জন্যে। আবার রাহিম কতোটা পাগল হয়েছিলো নিদ্রার জন্যে বা নিদ্রা তার বৃত্তে কতোটা বেঁধে রেখেছিলো রাহিমকে!  আমিও কতোটা সময় নষ্ট করেছি রাহিমকে ধরে আঁকড়ে থাকতে, রাহিমের বৃত্তে থাকতে। আজ রাহিম আমার কাছে নেই, রাহিম নিদ্রার বৃত্তেও নেই। আমি রাহিমের কাছে নেই। নিদ্রাও রাহিমের বৃত্তে নেই। সবাই আছি যে যার মতো, একে অন্যের বৃত্তের বাইরে; মানসিক চাপ নেই, কোলাহল নেই, নেই কোনো শূন্যতা। সবাই অন্যের বৃত্ত থেকে দূরে থেকে নিজের বৃত্তে ছুটে চলছি।
 আসিফ ইকবাল আরিফ
শিক্ষক, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়, ত্রিশাল, ময়মনসিংহ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here