আজ সকালে ঘুম থেকে উঠেই অনাবিল ঘোষের বেশ বিচলিত মনোভাব চোখে পড়লো। সে এতোটাই উদ্বিগ্ন ছিলো যে তার তিন বছরের ছোট বাচ্চা মেয়েটাও বুঝতে  পেরেছিলো যে তার পণ্ডিত বাবার কিছু একটা হয়েছে। এমনকি রাতে ঘুমানোর সময়ও অনাবিল ঘোষের স্ত্রী কিছু একটা আঁচ করতে পেরেছিলো। অনাবিল ঘোষ মাঝে মাঝেই এমন বিচলিত হয়ে ওঠেন। পণ্ডিত মানুষ বলে কথা! কত নতুন নতুন গবেষণার ফল পড়ে পড়ে সেটা আবার শিক্ষার্থীদেরকে পড়াতে হয়, পরীক্ষা নিয়ে মূল্যায়ন করতে হয়। আরও কত কাজের চাপ! যেহেতু সে জ্ঞানচাষী, তাই তাকে জ্ঞানের চাষবাস নিয়ে এমন উদ্বিগ্ন থাকতেই হয়। গত চার বছরের সংসারে এটা তার স্ত্রী বেশ রীতিমতই দেখে আসছে। তবে ঘোষ সাহেবের এইবারের বিচলিত মনোভাব  অন্যান্যবারের থেকে একেবারেই আলাদা ছিলো। এমন বিচলিত অবস্থা যেন মনে হয় হাট ভরা লোকের মাঝে কাউকে আচমকা লুঙ্গি খুলে উলঙ্গ করলে বা প্যান্টের জিপার খুলে দিলে যে অপমানবোধ তৈরি হয়, তেমন অপমানের জ্বালায় জ্বলে যাওয়ার ইঙ্গিত ছিল অনাবিল ঘোষের চোখে-মুখে।
অনাবিলের চোখে মুখে এমন অবস্থা দেখে তার স্ত্রী অঞ্জলি ঘোষ কোথায় কারন উদঘাটন করতে চাবে – তা নয় – বরং চোখে কাল সাপের ছোঁবলে আক্রমণ ধারণ করে ওষ্ঠ দিয়ে গলগল করে বিরক্তির বিষ ঢালতে থাকে আর মনে মনে বিড়বিড় করে বলতে থাকে – ‘মনে হয় এইবার আবার কোনো এক কচি মাগির পাল্লায় পড়েছে’। এইতো গত শীতে অঞ্জলি যখন বাপের বাড়ি গিয়েছিলো, তখন নাকি অনাবিল তার এক মেয়ে সহকর্মীর সাথে রেস্টুরেন্টে রেস্টুরেন্টে খেয়ে খেয়ে টাকা উড়িয়ে বেড়িয়েছিলো। অনাবিলের স্ত্রী এখন আর এইসবকে খুব বেশি পাত্তা দেয়না। হাজার হোক, বহুসাধের জনমের কপালে একজন উচ্চমার্গীয় পণ্ডিত মানুষকে স্বামী হিসেবে পেয়েছে – এতেই সে মহাসুখী!  আর পণ্ডিত মশাইদের যে একটু ঘটের জল পান করার পাশাপাশি দীঘির জলে সাঁতরানোর ইচ্ছা জাগে বা অভ্যাস থাকে – তা অঞ্জলিকে একজন আগে থেকেই বলেছিলো।
অঞ্জলির বিরক্তি! ঘোষ সাহেবের নজরে পড়লেও তিনি কোনো পাত্তা না দিয়েই পায়চারি করতে লাগলেন। কী এমন হয়েছিলো অনাবিল ঘোষের? আর কেনই বা তিনি এতো বেশি দুশ্চিন্তায় ছিলেন? নাকি অঞ্জলির ধারণায় ঠিক? যাইহোক,  অঞ্জলির ধারণা এইবার ঠিক বলে প্রমাণিত হয়নি। অনাবিলের সাথে এবার এক অন্য ঘটনা ঘটেছিলো। এমন এক ঘটনা ঘটেছিলো যা মাথায় নিলে অনেক কিছু আবার মাথায় না নিলে কিছুই নয়। তবে বিশ্বস্ত কোনো সহকর্মীর কাছ থেকে আঘাত পেলে যতটা কষ্ট লাগে, তার কাছ থেকে অপমানিত হলে অপমানবোধের জ্বালায় পুড়ে যায় তার চেয়েও বেশি। অনাবিল ঘোষের সাথেও এমনটি ঘটিয়েছিলো তার কোনো এক পণ্ডিত সহকর্মী। বিশ্বাস ভঙ্গ আর একে অপরকে বিপদে ফেলে মজা দেখা – এই অচিন্তপুর গ্রামের খুব সাধারণ ঘটনার খেলা। আর শুধু এই অচিন্তপুর-ই বা কেন? বাংলাদেশে এমন যত অচিন্তপুর গ্রাম আছে, প্রায়ই প্রত্যেক গ্রামেই এমন খেলা চলে। এইসব ল্যাংমারামারির খেলা মাথায় কিলবিল করে বলেই তো পণ্ডিতগণ তাদের পাণ্ডিত্যের স্বীকৃতি পান। আর ইদানিং কেরানিগণও এই খেলায় বেশ পারদর্শী হয়ে উঠেছে এই অচিন্তপুর গ্রামে। তবে পণ্ডিতগণ যেভাবে খেলাটাকে শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে যান, জ্ঞান চাষের কেরানিগণ এইভাবে খেলেন না। তারা খুব গোপনে খেলে। গ্রামের বিভিন্ন পরিবারে যখন নতুন সদস্য নিয়োগ দেওয়া হয়, তখন তারা টাকার খেলা করে। সদস্যদের অর্পিত কার্যভেদে বিশ, বাইশ বা ত্রিশ লাখ টাকার বাণিজ্য হরহামেশেই হয় বলে শোনা যায়। তবে সব কেরানিগণ এই ব্যবসা করেন না। হাতে গোনা কয়েক জন করেন। যাকগে সে কথা, অনাবিল ঘোষের সাথে যা ঘটেছিলো, এখন সেই কথাতে আসি। তবে সেই ঘটনা বর্ণনা করার আগে এই অচিন্তপুর গ্রাম সম্পর্কে কিছু জেনে আসা যাক।
এই যে শহরের পাশ ঘেঁষে যে স্বয়ংসম্পূর্ণ  গ্রামটি গড়ে উঠেছে তার নামই হচ্ছে অচিন্তপুর গ্রাম। বাংলাদেশের অন্যান্য গ্রামের যেখানে লিখিত পিতা-মাতা না থাকলেও চলে, সেখানে অচিন্তপুর গ্রামের একেবারে পাক্কা লিখিত পিতা-মাতা আছে। স্বয়ং রাষ্ট্র এই গ্রামের পিতা-মাতা। অচিন্তপুর গ্রামটি বাংলাদেশের অন্যান্য গ্রামের মতই; এই গ্রাম আর অন্যান্য গ্রামের গঠন-কাঠামো একই রকম প্রায়, পার্থক্য কেবল চর্চায় – অন্যান্য গ্রাম যেখানে অগোছালো আর প্রথাগত রীতি-নীতি (অধিকাংশই মৌখিক) দিয়ে চলে, অচিন্তপুর গ্রাম চলে পুরোপুরি লিখিত আইন দিয়ে। এই আইন কখনও সকল গ্রামের পিতার আদেশে জারি হয়, আবার কখনো কখনো অচিন্তপুরবাসীরা নিজেরাই নিজেদের সুবিধার জন্য কিছু আইন বানিয়ে নেন। অচিন্তপুরের আর একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো অন্যান্য গ্রাম যেখানে শাক-পাতা, ফলমুল, শস্য, গাছ-পালা, গোরু, ছাগল, মহিষ, হাঁস-মুরগী ইত্যাদি পালন করে, পরিবার প্রথাকে ঠিকিয়ে রাখবার জন্য সন্তান-সন্ততি লালন-পালন করে, সেখানে অচিন্তপুর গ্রামে শুধুই জ্ঞানের চাষাবাদ হয়।
এই গ্রামের বাসিন্দা হওয়ার প্রধান শর্ত হলো জ্ঞানী হতে হবে। আর এই জ্ঞানের পরিমাপকতা হলো বিদ্যার্জনের সনদ। এইগ্রামের জনবসতিদের বেশ কয়েকটা  বিভাজন আছে। এখানে সবথেকে প্রাধান্য পাওয়া যে জনবসতি আছেন, তারা হলেন জ্ঞানোগ্রাহী। ইনারা  জ্ঞান শিখতে আসেন। তবে ইনারা অল্প সময়ের জন্য আসেন; চার-পাঁচ বছরের জন্য। একসময় ইনারা চলে যান এইগ্রাম ছেড়ে অন্য জায়গায়। তবে অনেকেই আবার স্থায়ীভাবে এইগ্রামে বসবাস করার সুযোগ পেয়ে যান, সুযোগ করে নেন।
এখানে আর এক শ্রেনীর মানুষ জ্ঞান দান করেন, ইনারা কেউ কেউ পণ্ডিত হয়ে পাণ্ডিত্যের খাতায় শক্তভাবে নাম তুলেছেন, আবার কেউ কেউ পণ্ডিত হওয়ার পথে আছেন। এই পণ্ডিতগণ আবার চারভাগে বিভক্ত; প্রথমত, একেবারেই নবিশ। ইনারা সদ্য পাণ্ডিত্য জগতে এসে শিখতে থাকেন, শেখাতে থাকেন। পণ্ডিত রাজ্যে তার কদর কম এবং আর্থিক ও সামাজিক মর্যাদাও কম। এই পণ্ডিতগণ নিতান্তই শিক্ষানবিশ। দ্বিতীয়ত, এখানে আর এক শ্রেনীর পণ্ডিতগণ আছেন যারা শিক্ষানবিশ পর্যায় পার হয়ে এসে আগের পদ থেকে এই বিশেষ পদে পদায়িত হয়েছেন। এই পদটি আগেরটা থেকে অপেক্ষাকৃত ভালো, তবে পরের দু’টি পদ থেকে সম্মান আর আর্থিক সুবিধা থেকে পিছিয়ে। এই পদের পণ্ডিতগণও এই সময়ে পাণ্ডিত্য শেখেন। তৃতীয় যে পদের পণ্ডিতগণ এই অচিন্তপুরে বাস করেন, তারা অনেকটাই পাণ্ডিত্যে পেঁকে যাওয়ার জাতে উঠে যায়। এই পদে পদমর্যাদা আর আর্থিক সুবিধা দু’টোয় বেশ একটু মোটা-তাজা হয়। আর চতুর্থ যে পদের পণ্ডিতগণ আছেন তারা হলেন পাণ্ডিত্যে একেবারে পেঁকে গিয়ে জ্ঞানের রসে টলটল করেন। ইনারা বাণী প্রসব করলেই সেটা জ্ঞান হয়। এই পদে সম্মান আর অর্থ দু’টোই সদ্য বিয়ানো গাভীর মত; দুধও বাড়ে আবার বাছুরও বেশ বড় হয়।
 অচিন্তপুর গ্রামের আর একধরণের বসতিদের মধ্যে যারা আছেন, তারা হলেন জ্ঞানের কেরানি। ইনারা অতি যত্নে, মাঝে মাঝে পরম যত্নে, আবার প্রায়শই চরম অযত্নে জ্ঞানের কেরানিগিরি করতে থাকেন। অচিন্তপুর গ্রামে এই জ্ঞানের কেরানিদের সামাজিক  মর্যাদা এবং আর্থিক সুবিধা জ্ঞানচাষী পণ্ডিতগণের থেকে একটু কম।
 এইগ্রামে আর এক ধরণের বসতি আছেন, যারা জ্ঞানের কেরানি এবং জ্ঞানচাষীদের সহায়ক হিসেবে কাজ করে। আর এই গ্রামের বিভিন্ন মুখে মুখে যারা লাঠি হাতে আর বিশেষ পোষাক পরে ঘুরে বেড়ান, তারা হচ্ছেন এই গ্রামের পাহারাদার। এদের জ্ঞান শিক্ষার সনদ যেমন অনেক পাতলা, তেমনি এদের আর্থিক সুবিধা আর পদমর্যাদাও কম। শুধু এরাই নন, এদের সাথে এই গ্রামের যত গাড়ি-ঘোড়া আছে, তাদের চালকগণও আছে এই শ্রেনীতে। আর এই গ্রামের সব থেকে সামাজিক, আর্থিক এবং জ্ঞান বিবেচনায় সব থেকে নিচু স্তরের বসতি হলো – এইগ্রামের ঝাড়ুদারগণ। তবে এই গ্রামের জনবসতিদের মধ্যে প্রথম ধরণের বসতি ছাড়া সবাই বেশ লম্বা সময় পর্যন্ত এই গ্রামে বসত করার সুযোগ পান। নিতান্তই গ্রাম বিরোধী কাজ না করলে আর স্বেচ্ছায় গ্রাম ছেড়ে চলে না গেলে, গ্রামের সদস্য পদ যায় না।
এরপরে অচিন্তপুর গ্রামে যিনি আছেন, যিনি সকলের নয়নের মণি হয়ে আছে (সবার চোখে নাও হতে পারে), তিনি হলেন এই গ্রামের প্রধানকর্তা। অচিন্তপুর গ্রামের সাথে তাঁর কোনো নাড়ীর সম্পর্ক না থাকলেও তাকে নাড়ীর সম্পর্ক স্থাপনের জন্য পুরো ছাপ্পান্নো হাজার বর্গমাইলের প্রধান অধিকর্তা তাকে নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য এই অচিন্তপুর গ্রামের প্রধান করে পাঠিয়েছেন।
অচিন্তপুর গ্রামে এভাবে নির্দিষ্ট মেয়াদ পর পরই একজন করে ভিনদেশী কর্তা আসেন। এখানে প্রধানকর্তার সম্মান আর যশ এতটাই বেশি যে মনে হয় স্বয়ং ঈশ্বরের  ছায়াতলে আশীর্বাদপুষ্ট কোনো এক পবিত্র আত্মা রাজ সিংহাসনে বসে পুরো অচিন্তপুর গ্রামকে শাসন করছে । এই পবিত্র আত্মার নিজের শরীরে হাজারো অছুঁতের গন্ধ থাকলেও তাঁর প্রধান কাজই হচ্ছে অচিন্তপুর থেকে নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে জ্ঞানচাষের সকল অপবিত্রতার উপাদান পরিস্কার করে ফেলা। আবার যেকেউ চাইলেই যে গ্রামকর্তা হতে পারবে – তা কিন্তু না। বরং পণ্ডিতগণের মধ্যে যারা জ্ঞানে পেঁকে গেছেন, ল্যাংমারামারির খেলায় যারা পারদর্শিতা দেখাতে পারে, রাষ্ট্রের প্রধান অধিকর্তা এবং রাষ্ট্রের বড় বড় কেরানিদের মন যারা খুশি করতে পারেন – কেবল তারাই এমন গ্রামের প্রধান হিসেবে নিয়োগ পান।  তবে জ্ঞানচাষীগণ গ্রামপ্রধান হবেন – এই আইন থাকা সত্বেও মাঝে মাঝে এই জ্ঞানচাষের সহায়তাকারী কেরানিগণও গ্রামপ্রধান হওয়ার স্বপ্ন দেখেন, আন্দোলন করে থাকেন। কোনো গ্রামে ভারপ্রাপ্ত গ্রামপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব পেলে, কেরানিগণ অভিনন্দন এবং শুভেচ্ছা জানায়। তারাও স্বপ্ন দেখেন একদিন না একদিন তারাও গ্রামপ্রধান হবেন। এই তো বছর খানেক আগে ড. আফাচ্ছর জামান সিদ্দিকী অচিন্তপুর গ্রামকে জ্ঞানচাষে একেবারে ফুলে ফলে ভরিয়ে দিতে প্রধানকর্তা হিসেবে না্যিল হয়েছেন। এর আগেও বেশ কয়েকজন গ্রামপ্রধান হিসেবে এসেছেন। তবে যে সকল সদস্যগণকে কোনো গ্রামপ্রধান নিজ হাতে নিয়োগ দেন, সেই সদস্যগণকে নিজের সন্তানের মত মনে করেন। আর এই গ্রামের বিগত গ্রামপ্রধান কর্তৃক নিয়োগপ্রাপ্ত সদস্যগণকে সৎ বা স্টেপ সন্তান মনে করেন। যে যে গ্রামপ্রধান আসেন, সেই সেই ভদ্রলোক তামাম ছাপ্পান্নো হাজার বর্গমাইল খুঁড়ে খুঁড়ে সবথেকে ভালো ভালো পণ্ডিত নিয়োগ দিয়েছেন বলে দাবি করেন। যাক গে সে কথা, গ্রামপ্রধানদের মধ্যে যারা বিগত হয়েছেন, তাদের আল্লায় বেহেশত নসীব করুন/ভগবান তাদের আত্মাকে স্বর্গবাসী করুক। যারা জীবিত আছেন আল্লায় তাদের শান্তিতে রাখুক/ভগবান তাদের সুখ দিক। কেননা তারা যদি এমন বিচক্ষণ নিয়োগদাতা না হতেন, তাহলে এই অচিন্তপুর জ্ঞান গরিমায় ভরে উঠত না।  যাইহোক, সিদ্দিকী সাহেব চার বছরের জন্য রাজা হওয়ার সৌভাগ্য পেয়েছেন। তিনি আসলে রাজার মতই; তার প্রাসাদ আছে, আছে বাবুর্চি, আয়া, খানসামা, ড্রাইভার সুইপারসহ আরও অনেকে। তার ক্ষমতার আকাশ এতটাই বড় যে, তিনি চাইলে জ্ঞানের শস্য, জ্ঞানচাষী, জ্ঞানচাষের কেরানি এবং জ্ঞানচাষের সহায়ক যারা আছেন – তাদের সুবিচার আর অবিচার দু’টোই করতে পারেন। রাষ্ট্রের প্রধানমন্ত্রী, রাষ্ট্রপতি, রাষ্ট্রের জ্ঞানচাষের মন্ত্রণালয়, আর রাষ্ট্রের যত অচিন্তপুর গ্রাম আছে – তাদের দেখভাল করার তদারকি প্রতিষ্ঠানের কাছে ছাড়া তিনি কারোর কাছে জবাবদিহিতা করেন না।  তবে মাঝে মাঝে তাকে বেশ আরাম আর গরমের চাপ খেতে হয়। আর এই আরাম আর গরম চাপগুলো আসে সরকারের উপর মহলের মন্ত্রীদের থেকে, স্থানীয় সাংসদ আর রাষ্ট্রের প্রভাবশালী ঝানু ঝানু কেরানিদের থেকে। আর অচিন্তপুরের যে সোনার ছেলেরা আছে তারা আর চাপ দেয়না, তারা যা চায় একেবারে ডাইরেক্ট টেনে বের করে আনে। সিদ্দিকী সাহেবও খুব ভারী গোছের চালাক মানুষ। সোনার ছেলেদের ব্যাপারে তার কোনো আক্ষেপ থাকেনা, কোনো অভিযোগ থাকেনা। কেননা এই সোনার ছেলে-মেয়েদেরকে যদি সিদ্দিকী সাহেব হাতে রাখতে পারে তাহলে তার সময় কাটানো নিরাপদ। কারন এদের চাহিদা মেটাতে না পারলে মিছিল হবে, গদি নিয়ে টানাটানি হবে।
এই অচিন্তপুরের সব ফুল পাখি টিকটিকি প্রজাপতি কুকুর বিড়াল গাছপালা পোকা-মাকড় – সবাই তার হুকুম মানতে বাধ্য। তবে জ্ঞানচাষী আর জ্ঞানচাষের কেরানিদের মধ্যে তাকে নিয়ে দ্বিধা বিভক্তি আছে। এদের কেউ কেউ পা ধরে পড়ে থাকে, আবার কেউ কেউ সিদ্দিকী সাহেবকে বিপদে ফেলার জন্য উঠে পড়ে লাগে। যাইহোক, কেউ বাধ্য হয়ে হোক, আর কেউ তৈল শিল্প বশের আসকারায় হোক – তার হুকুম সবাই মেনে চলতে বাধ্য।
অচিন্তপুর গ্রামে এরপর যিনি ক্ষমতায় বেশ পরিপুষ্ট থাকেন – তাকে আবার এই গ্রামের আর্থিক বিষয়সমূয়ের নীতিনির্ধারকও বলা হয়ে তাকে। অর্থাৎ এই গ্রামের সব আয়-ব্যয়ের হিসেব-কিতেব তার নেতৃত্বেই লিপিবদ্ধ হয়। একজন জ্ঞানী পণ্ডিত আর কয়েকজন কেরানি নিয়ে চলে তার সংসার। তবে পুরো এই অচিন্তপুর গ্রামে যতগুলো সংসার আছে – সব সংসারেরই মালিক হচ্ছেন এই গ্রামের গ্রামকর্তা। গ্রামের প্রধানকর্তা আর গ্রামের অর্থবিষয়ক কর্তা – উভয়ই ভিন্ন গ্রাম থেকে চার বছরের জন্য এই গ্রামে আসেন।  মোহাম্মদ মোবাশ্বের উদ্দীন তমুজদার সাহেব হচ্ছেন বর্তমানে অচিন্তপুর গ্রামের অর্থবিষয়ক প্রধানকর্তা। তিনি ছাপ্পান্নো হাজার বর্গমাইলের বেশ বড় এক গ্রাম থেকে এখানে এসেছেন।
অচিন্তপুর গ্রামে মস্ত বড় প্রশাসনিক ব্যবস্থা রয়েছে। এখানে প্রায় দুইশটির মত বৃহৎ পরিবার রয়েছে। এই প্রত্যেক পরিবারে সদস্য সংখ্যা প্রায়ই তিনশো জনের মত। এই পরিবারের সব সদস্যগণের নিজস্ব পরিবার থাকলেও তারা এই অচিন্তপুর গ্রামে আশার পরে – এটাকে নিজেদের পরিবার মনে করে। অতএব, এই অচিন্তপুরের পরিবার তাদের জৈবিক বা আইনসিদ্ধ অর্থনৈতিক চাহিদা মেটানোর পরিবার নয়। এখানে শুধুমাত্র জ্ঞানের চাহিদা পূরণ করা হয়; জীবনধারণের নতুন নতুন পদ্ধতি, জ্ঞান-বিজ্ঞানের জ্ঞান অর্জন করে পুরো দেশকে জ্ঞানে গর্ভবতী করা, ল্যাংমারামারি করে কাউকে টপকানো, বৈজ্ঞানিকভাবে মানুষ ঠকানোর কৌশলসমূহ, দলকানা মস্তক আর হৃদয়বিহীন এক গোত্রকূল গড়ার শিক্ষা দেওয়া হয় – এই অচিন্তপুর গ্রামে।
এখানে বিশাল বিশাল দপ্তর আছে। নিয়মমাফিক একজন করে দপ্তর প্রধানও থাকেন। একজনের দায়িত্ব শেষ হলে আর একজন দায়িত্ব পান। এই দায়িত্ব বণ্টন নিয়ে পণ্ডিতগণ প্রায়ই ঝামেলার সৃষ্টি করেন। এই সময় পণ্ডিতগণ ল্যাং মেরে ফেলে দেওয়ার যে শিল্প রপ্ত করে থাকেন – তার সবটুকুই উজাড় করে প্রয়োগ করেন।
এই অচিন্তপুরে বসবাসরত পণ্ডিতগণ তাদের জ্ঞানচাষের পাশাপাশি অচিন্তপুর গ্রামের কিছু বিশেষ প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করেন। এই দায়িত্বকে বলে অতিরিক্ত দায়িত্ব। এখানে অল্পকিছু আর্থিক সুবিধা যেমন থাকে, তেমনি এই দায়িত্ব পালন করলে বৃটিশ রাজবংশের মত ক্ষমতা চর্চারও বেশ সুযোগ থাকে। এই দায়িত্বগুলোর মধ্যে উল্লেখ্য কয়েকটি দায়িত্ব হলো; জ্ঞানোগ্রাহী বিষয়ক উপদেষ্টা, নিরাপত্তা বিষয়ক কমিটি, যানবাহন বিষয়ক প্রশাসক, আবাসিক জ্ঞানচাষের দেখভালকারী প্রধানগণ, জ্ঞান-গবেষণার পরিচালক, জ্ঞানচাষের গুণাগুণ পরিমাপ বিষয়ক পরিচালক, অর্থ এবং হিসাব বিষয়ক পরিচালক ইত্যাদি ইত্যাদি। এই পদগুলোতে আইনগতভাবে পণ্ডিতগণ অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করে থাকেন। তবে কে বা কারা এই দায়িত্ব পালন করবেন তা নির্ভর করে গ্রামের প্রধানকর্তার কত কাছের মানুষ – তার উপরে। গ্রাম প্রধানকে ভালোবাসেন এমন গ্রুপের সদস্য হলে এই পদগুলো পাওয়া যায়। আবার গ্রাম প্রধানকে দলগতভাবে পছন্দ করেন না কিন্তু গ্রাম প্রধানের সাথে ব্যক্তিগত সম্পর্ক আছে বা একই এলাকাতে বাড়ি – এমন লোকও এই পদগুলোতে বসতে পারে। এর পাশাপাশি গ্রাম ব্যবস্থাপনা কমিটির যে সিন্ডিকেট আছে, সেখানেও উচ্চমার্গীয় পণ্ডিতগণ দায়িত্ব পালন করে থাকেন। এইগুলো ছাড়া আরও হরেক রকমের পদ আছে। আর এই পদে পদায়িত হওয়ার জন্যেই অনেক পণ্ডিতগণ নিজ সহকর্মীদের পশাৎদেশে হুল ফুঁটায়, গ্রামের প্রধানকর্তার পা ধরে পড়ে থাকেন।
বাংলাদেশের অন্যান্য গ্রামে যেমন অভাব আর দারিদ্রের সংসার আছে – অচিন্তপুরে তা নেই। এই গ্রামের ঝাড়ুদার থেকে শুরু করে সকল গোত্রের সদস্যগণের নাম সরকারি খাতায় উঠে যায়। যার যেমন যোগ্যতা, তেমন যোগ্যতা অনুযায়ী – তারা প্রতিমাসে নির্দিষ্ট পরিমাণ বেতন পান। আর শুধু বেতন নয়, বিভিন্ন উৎসবে রীতিমত বেতন সমপরিমাণ বোনাস পান।
অচিন্তপুর গ্রামে বেশ কয়েকটি গোত্র আছে। এই গোত্রগুলো সম্পর্কে আগেই বলা হয়েছে। গ্রামের সকল পণ্ডিতগণ, কেরানিগণ, জ্ঞানগ্রোহীগণ, গ্রাম প্রশাসন পরিচালনাকারী সহকারী বা সহযোগীগণ। সমস্ত গোত্র-কুলের লোকজন আবার দুইটি মতাদর্শগত গোত্রে বিভক্ত; একটা লালগোত্র, অপরটি গোলাপীগোত্র। তবে সকল গোত্রের আবার বেশ কয়েক রকমের উপগোত্র আছে। আর এই গোত্র এবং উপগোত্রের খেলা বেশ ভালোই চলে উচ্চমার্গীয় পণ্ডিতগণের মধ্যে। সমগ্র অচিন্তপুর গ্রামের পণ্ডিতগণের এই লাল-গোলাপী গোত্র গোত্র খেলা বেশ চোখে পড়ার মত। এখানকার পণ্ডিতগণ প্রধানত গোলাপীগোত্র এবং লালগোত্র বিভক্ত। সময় ভেদে এই সাদাগোত্র আর নীলগোত্রের ক্ষমতা চর্চার খেলা চলতে থাকে। একবার লাল তো পরেরবার গোলাপী – এইভাবেই ল্যাংমারামারির খেলা চলতে থাকে। এখন বেশ কয়েক বছর ধরে লালগোত্র ক্ষমতায় রয়েছে। আবার অনেক পণ্ডিতগণ আছেন – যারা নিরপেক্ষ থাকে – কোনো গোত্রের রঙ গায়ে লাগান না। যখন যে গোত্র ক্ষমতায় আসে; তাদের সাথে মিশে যায়।
এখানে যতগুলো গোত্র আছে, তারা সবাই একেকটা সমগোত্রীয় জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী একেকটা কাল্পনিক সম্প্রদায়ের রাষ্ট্রের মত। এদের গোষ্টী রাজনীতি খুব পাঁকা পোক্তভাবে চলে। কোনো গোত্রের লোক যদি কোনো গোত্রকে আক্রমণ করে বসে, তাহলে গোত্রগতভাবে একে অপরকে কথার আঘাত আর পাল্টা আঘাত করতে থাকে। আবার ব্যক্তি স্বার্থের ক্ষেত্রে গোত্রের লোক যে যার মত করে চলতে থাকে।
এই অচিন্তপুর গ্রামের জনবসতিগণ জাতি আর ধর্মেও বিভক্ত। আর এই বিভক্তি লাল আর গোলাপী রঙের উর্ধ্বে। ইনারা নিজ সম্প্রদায়ের কল্যাণে যেমন জান-প্রাণ দিয়ে কাজ করতে পারেন, তেমনি অন্য সম্প্রদায়ের জনবসতিদের আকণ্ঠ ক্ষতিও করতে সদা প্রস্তুত থাকে। আর ধর্ম পরিচয়কে কেন্দ্র করে এই অচিন্তপুর গ্রামে যে স্বজাতীয় আন্দোলন গড়ে ওঠে, সেই আন্দোলনে নেতৃত্ব দান করে বিজ্ঞ জ্ঞানচাষী পণ্ডিতগণ। আবার পণ্ডিতগণের মধ্যে আর একটা বিশেষ সম্পর্কের ভিত্তিতে ক্ষুদ্র স্বজাতীয়তাবোধ তবে বৃহৎ পর্যায়ের এক ধরণের ‘ট্রাইবালিজম’ মনোভাব গড়ে ওঠে। আর এটার ভিত্তি হচ্চে কে কোন জায়গা থেকে জ্ঞানের শিক্ষা লাভ করেছে – তার উপর। এই যেমন ইসলামপুর জ্ঞানশালা থেকে যারা বিদ্যা শিক্ষা অর্জন করে এই অচিন্তপুরে জ্ঞানচাষ করছেন – তাদের মধ্যে একধরণের ঐক্য আছে। এমন ঐক্য যে, যা সমস্ত পণ্ডিতগণের সাধারণ ঐক্যের উর্ধ্বে। এই অনুভূতি লাল আর গোলাপীর উর্ধ্বে। আবার রাজপুর, বুড়িগঙ্গাপুর, সাভাপুর, চট্টলাপুর থেকে যারা এই গ্রামে বসতি গড়ার সুযোগ পেয়েছেন – তারাও এই ধরণের ঐক্যের খেলা খেলেন। এই খেলা স্পষ্ট হয় পণ্ডিতগণের সংঘের নির্বাচনে, কোনো পদ পদবীতে কাউকে বসাতে গেলে, কোনো নতুন সদস্যকে নিয়োগ দিলে। শুধু অন্যান্য জ্ঞান শিক্ষ্যালয়-ই বা কেন- স্বয়ং অচিন্তপুরের বিদ্যা শিক্ষা কেন্দ্র থেকে যারা বিদ্যার্জন করে পণ্ডিত হয়েছেন, তারাও এই ট্রাইবাল ট্রাইবাল খেলা খেলেন। এই খেলা প্রকাশ্যে করার সুযোগ থাকে না। এই খেলা খুব গোপনে আর সুনিপুণভাবে খেলে থাকেন উচ্চবর্গীয় পণ্ডিতগণ।
অচিন্তপুরের সমগ্র পণ্ডিতগণ মিলে দুইটি সংঘ গড়ে তুলেছেন;  লালগোত্র সংঘ আর গোলাপীগোত্র সংঘ। এই দুই সংঘ মিলে আছে সাধারণ এক সংঘ। সাধারণ সংঘের লিখিত আইন আছে। প্রতি একবছর পরপর এখানে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এই নির্বাচনে সাধারণত লাল আর গোলাপী সংঘ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে থাকে। গতবছর গোলাপীগোত্র নির্বাচনে অংশ গ্রহণ করেনি বলে লালগোত্রের‍ যে দুইটি ভাগ আছে – তারা একে অপরের প্রতিপক্ষ হয়ে নির্বাচনে লড়েছে। সেই নির্বাচনে লাল অংশের নীল উপগোত্র বন্ধু উপগোত্রকে হারিয়ে নিরস্কুশ বিজয় অর্জন করে সংঘকে জ্ঞানচাষের কল্যাণে কাজে লাগাচ্ছে। এই সংঘের রয়েছে রাষ্ট্র সৃষ্টির ইতিহাসের মত বৃহৎ বয়ান। যে বা যারা এই সংঘের প্রবক্তা পুরুষগণ এবং ভদ্রমহিলাগণ আছেন – যারা জীবিত আছেন – আল্লায় তাদেরকে সুখী করুক/ভগবান তাদেরকে শান্তিতে রাখুক, যারা মৃত্যুবরণ করেছেন – আল্লায় তাদের বেহেশত নসীব করুন/ ভগবান তাদের আত্মাকে শান্তিতে রাখুক। কেননা তাদের হাতের সৃষ্টির সুত্র ধরেই অচিন্তপুরের বর্তমান পণ্ডিতগণ এই ল্যাংমারা তৈল শিল্পের বাম্পার ফলন ফলিয়ে দিচ্ছেন।
অনাবিল ঘোষ এই সংঘের নির্বাচিত একজন নেতা। সে ছাড়া এই বর্তমান সাধারণ সংঘে তার থেকে ক্ষমতাধর আছেন শুধুমাত্র তিনজন। অর্থাৎ  নির্বাচিত সমগ্র পনেরো জনের মধ্যে একজন প্রভাবশালী রাজনীতিক পণ্ডিত হলেন অনাবিল ঘোষ। আবার অনাবিল ঘোষ লালগোত্রের  নির্বাচিত একজন সদস্যও বটে। আর এই নির্বাচনে নির্বাচিত হওয়ায় অনাবিলের জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। এত অল্প বয়সে অনাবিলের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড অনেকটা ঈর্ষায় পড়ার মত। সে রাজনীতিতে এতটা সাংঠনিক যে  কয়েক মিনিটের ব্যবধানে নিজেদের ফায়দা আদায় করার উদ্দেশ্যে প্রতিপক্ষকে মাঠ থেকে সরিয়ে মাঠ ফাঁকা করতে পারে। এ নিয়ে যেমন স্বয়ং লালগোত্রের মধ্যে অনাবিলকে পছন্দ করা লোকের অভাব নেই, তেমনি তাকে অপছন্দ করা লোকের সংখ্যাও কম নেই। এই বর্গের পণ্ডিতগণের মধ্যে ঐক্য গড়ে তোলার কাজ খুব কঠিন। যখনই গোত্রে ভাঙন আসে, তখনই গোত্রের প্রাক্তন এবং বর্তমান নেতানেত্রীগণ ত্রিপিটক সরূপ গোত্রের আদর্শিক ইতিহাস বা ‘হিস্টরি’ পাঠ করে করে মুখে ফেনা তুলে ফেলেন আর নিজেদের মধ্যে গোত্রের ঐক্যের ডাক দেন। নেতাকর্মীদের এমন ত্রিপিটক পাঠে গোত্রের সম্পর্ক বেশ কিছুদিন ভালো থাকে। আবার যখন ব্যক্তি স্বার্থের বিষয় সামনে আসে, এরা যে যার মত হয়ে যায়। তখন গ্রামের বিভিন্ন মোড়ে মোড়ে ছোট ছোট গোপন বৈঠকে ব্যস্ত থাকে পণ্ডিতগণ। ব্যক্তিস্বার্থের বিষয়গুলো তখনই সামনে আসে, যখন অতিরিক্ত দায়িত্বের পদগুলো ফাঁকা হয়। ঠিক এমনই এক ঘটনায় কেউ ফাঁসিয়ে দিয়েছে অনাবিলকে। অনাবিলের বিচলিত হওয়ার পেছনে এই কারনটা খুব পোক্তভাবে কাজ করেছে। গল্পের ছলে কারনটা একটু জেনেই নিই চলুন।
বেশ কিছুদিন আগে অচিন্তপুর গ্রামের আর্থিক হিসেব বিষয়ক পরিচালকের মেয়াদ শেষ হয়। জনাব জামশেদ উদ্দীন মজুমদার ছিলেন দায়িত্বে। ইতোমধ্যে গ্রাম থেকে জ্ঞানোগ্রাহী বসতিগণও ধর্মঘট করে অচিন্তপুর থেকে অন্য জায়গায় বেড়াতে গিয়েছে। যেহেতু গ্রামে এখন আর জ্ঞানচাষের সুযোগ কম, তাই অনেক পণ্ডিত এবং কেরানিগণও কয়েকদিনের জন্য হাওয়া খেতে গিয়েছেন। পুরা অচিন্তপুর গ্রাম এখন ফাঁকা। এখানে হাতে গোনা কয়েকজন পণ্ডিত আছেন, কেরানি আছেন, গ্রামের পাহারাদার আছেন। সবকিছু যখন নিস্তব্দ আর শান্ত, এমন সময় গুটি কয়েক পণ্ডিতগণের মাথার মধ্যে ল্যাংড়া পোকা ঢুকে তাদেরকে ল্যাংমারামারি খেলা করার জন্য শুড়শুড়ি দিচ্ছিলো। ড. তোবাহার মল্লিক (অনেকে তাকে তারকাটাও বলে) আর কোনোভাবেই চান না যে জামশেদ মজুমদারের দায়িত্ব শেষ হওয়ার পরে সেবআর একদিনও দায়িত্বে থাকুক। ড. মল্লিক তার উপগোত্রের সবার সম্মতি আদায় করেছেন এই ব্যাপারে। তবে গোত্রের কোনো উপগোত্রই এককভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। এটার জন্য গোত্রপ্রবর্তক প্রধান সব উপগোত্র নিয়ে আলোচনায় বসেন। তো যেহেতু অচিন্তপুরে অনেক নেতাকর্মীগণ উপস্থিত ছিলো না তাই স্বর্গের দেবদূতগণ এসে সাত আসমানে তাদের বৈঠক করার সুযোগ করে দিয়েছিলেন। বৈঠকে তারা একে অপরকে দেখতে পাচ্ছিলেন, শুনতে পারছিলেন কিন্তু ছুঁয়ে দেখতে পারছিলেন না। যাইহোক, জামশেদ সাহেব থাকবেন কি থাকবেন না এই ব্যাপারে একটি মুরগীর পশ্চাৎপট যেমন দুইভাগে বিভক্ত হয়ে যায়, তেমনি সংঘের নির্বাচিত পণ্ডিত রাজনীতিকগণ বিভক্ত হয়ে যান। ড. মল্লিকের উপগোত্র কোনোভাবেই জনাব মজুমদারকে থাকতে দিবেনা। সে সময় স্বর্গীয় বৈঠক চলাকালীন সময়ে দুইটি প্রস্তাব আসে; নতুন আর একজন যোগ্য অথচ নিজেদের গোত্রের কোনো পণ্ডিতকে সেখানে বসাতে হবে অথবা গ্রামপ্রধান এই দায়িত্বভার গ্রহণ করবেন। এখানে একধরণের ভোটাভুটি হয়। দুইপক্ষেই প্রায় সমান ভোট আসে। এমন সময় স্বর্গের নির্মম বাতাসকে গরম করে দিয়ে অনাবিল ঘোষ বজ্র কণ্ঠে বলতে থাকে, ‘পণ্ডিতগণের পদে পণ্ডিতগণই থাকবেন, গ্রামপ্রধানের এই পদে থাকা বেমামান। তাছাড়া একই ব্যক্তি গ্রামের আর্থিক নথির প্রস্তাবকারী এবং অনুমোদনকারী হতে পারেন না’। এই কথা শুনে পণ্ডিত ড. যোগেশ ভদ্র বলে ওঠেন, ‘হ্যাঁ। হ্যাঁ। ঘোষের কথায় যুক্তি আছে বেশ’। এইভাবে জনাব যতীন কুমার এবং সংঘের সভাপতি ইসলাম খানও অনাবিল ঘোষের কথায় সম্মতি দেয়। অন্যদিকে ড. মল্লিক, সংঘের সাধারন সম্পাদক সর্দার হিকমত সাহেবসহ আরও কয়েকজন গ্রামের প্রধানকর্তাকে দায়িত্ব দেওয়ার জন্য পীড়াপীড়ি করা শুরু করলো। ড. মল্লিকদের উপরে চাপ ছিলো বেশ। আর এর কারন হলো লালগোত্রের প্রভাবশালী একজন নেতা নাকি ইতোমধ্যেই গ্রাম প্রধানকে রাজী করিয়ে ফেলেছেন এই ব্যাপারে। এই ট্রাইবটি এখন ঐ নেতার পৈতৃক সম্পত্তি; সে গোত্রের সবার সাথে কথা না বলে শুধুমাত্র উপগোত্রের গুটি কয়েক সদস্যদের সাথে কথা বলেই বাপের নামে গোত্রের অস্তিত্ব বিক্রয় করে দিয়েছেন। যাক গে সে কথা।
এমন যখন অবস্থা! এই সময় হঠাৎ স্বর্গীয় বৈঠকে দুই পক্ষের মধ্যে গোলমাল লাগলো। ড. মল্লিক যিনি সুদূর আফ্রিকার হনুলুলু থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করে এসেছেন, তিনি আচমকা অনাবিল ঘোষের সাথে বিবাদ করে বৈঠক ত্যাগ করেছেন। এই বৈঠক পরিত্যাগ তিনি একলা করেন নি বরং সাথে তার গোত্রের যারা ছিলো – সবাইকে তিনি নিয়ে গিয়েছেন। যাইহোক, একপর্যায়ে ড. ছানু আর যোগেশের কথায় সবাই আবার বৈঠকে ফিরে আসে। ঐদিন পণ্ডিতের দায়িত্বে পণ্ডিতই বসবে – এই মর্মে ঐ পদের জন্য ড. তকলিফ তরফদারের নাম অনুমোদন করে স্বর্গীয় বৈঠক শেষ হয়।
‘আমি প্রধানকর্তা কে রাজী করাইলাম। আর আপনেরা আমার মান রাখলেন না! আই ফেল্ট ভেরি ইনসাল্টেড’ – এই কথাগুলো জনাব ইসলাম খানকে বলেছিলো গোত্রের সেই প্রভাবশালী নেতা জনাব হিম্মত আলী খসরু। যাইহোক, অনাবিল ঘোষ বেশ খুশি! ‘যাক বাবা! আমাদের পণ্ডিতদের পদে পণ্ডিতই থাকছে’ – এই কথা বলাবলি করে সেইদিন রাতে ঘুমাতে গিয়েছি ঘোষ সাহেব। তবে অনাবিল ঘোষদের সেই প্রস্তাব তৎক্ষণাৎ বাস্তবায়িত হয়নি। গ্রামের প্রধানকর্তা পরিষ্কার জানিয়ে দেন যে আগামী তিন-চার মাসের মধ্যে এই পদে নতুন কোনো পণ্ডিতকে দায়িত্ব দেওয়া সম্ভব হবে না। তার কারন গ্রাম ব্যবস্থাপনার বৈঠক বসাতে সময় লাগবে। আর এই পদে লোক নিয়োগ শুধুমাত্র গ্রাম ব্যবস্থাপনার সেই কমিটিই করতে পারবে। তাই স্বভাবতই গ্রামপ্রধানই সেই দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। গ্রামপ্রধানের এমন দায়িত্ব গ্রহণ দেখে স্বয়ং সংঘের মধ্যকার সেই বিষমাখা বিভাজন আবার জেগে উঠলো। ‘পণ্ডিতের পদে পণ্ডিত বসলেই ভালো হতো। না। না। এইটা কিছু হইলো না। অন্যান্য পণ্ডিতগণই বা কী ভাববে আমাদের নিয়ে’ – এইভাবে বলাবলি করে বেড়ায় অনাবিল সাহেব। এইকথা আকাশে বাতাসে ছড়িয়ে ছিটিয়ে গেলে তা আবার ড. মল্লিকের কর্ণকুহরে চলে যায়। ‘ব্যবস্থাপনা কমিটির বৈঠক বসলে আমাদের প্রস্তাবিত লোক পদে বসবে’ – এই বলে ড. মল্লিক স্ফীত হাসি দিলেন। তবে জনাব জামশেদ যে এই দায়িত্বে আর নেই – এতে যে ড.মল্লিক খুব খুশি – তা তার এই হাসিতেই পরিস্কার।
এই অচিন্তপুর গ্রামের গ্রাম ব্যবস্থাপনার সাথে জড়িত থাকার ব্যাপার যেকোনো শ্রাবস্তির কারুকার্যে খোচিত কোনো রূপসীর মত; যার আগ্রহ আছে সে পেতে চায়, আর যে চেয়ে পায়না, সে না পাওয়া পর্যন্ত উন্মাদ প্রেমিকের মত লেগে থাকে, আবার যদি দূরদেশ থেকে এসে ত্রিভূজ প্রেমের নায়িকাকে অন্য এক ভিন্ন পুরুষ তুলে নিয়ে গেলে, ঐ নারীর প্রেম বঞ্চিত পুরুষ যেমন খুশি হয় তেমনি একটি পদের জন্য দুইজন লড়াই করলে মাঝখান থেকে যদি অন্যজন এসে সেটা ভাগিয়ে নিয়ে যায়, তাহলে আগের দুইজনের মধ্যে ঐ পদের জন্য যে একটু পিছিয়ে থাকে সে মহা খুশিতে লাফাতে থাকে।   যাইহোক, গ্রামের প্রধানকর্তা ঐ দায়িত্ব নেওয়ার দিন পনের  পরে অনাবিল গ্রামের কোষাগারে টাকা উত্তোলন করতে যায়। এমন সময় একটা ফাইল দেখে সে। যে ফাইলে অর্থ বিষয়ক পরিচালক হিসেবে প্রধানকর্তার দস্তখত থাকার কথা, সেইখানে তার দস্তখতের পরিবর্তে একজন বেশ মোটাতাজা কেরানির স্বাক্ষর। এই দেখে অনাবিল প্রমাণ করতে চায় যে তিনি যেটার জন্য গোঁ ধরে বসে ছিলেন, সেটাই সঠিক ছিলো কেননা একই ফাইলে গ্রামপ্রধান প্রস্তাবকারী আর অনুমোদনকারী হতে পারেন না। তাই যে বা যারা গ্রামপ্রধানকে তৈল শিল্পের শৈল্পিক ছলে পণ্ডিতদের আইনসিদ্ধ একটি পদ গ্রামপ্রধানকে দিয়েছেন তা ভুল ছিলো। যে চিন্তা, সেই কাজ। অনাবিল ঘোষ সেই ফাইলের একটা ফটো তুলে নেয়। এই ফটো আবার এইবারের নির্বাচিত সাধারণ সংঘের যে ফেসবুক নামক স্বর্গীয় পাতা আছে, সেখানে ছেড়ে দেয়। এবং সে তার স্বজাত্যবোধের বিরিয়ানি গেলার ঢং নিয়ে বিপ্লবের ডাক দেয়। ‘পণ্ডিতদের পদে পণ্ডিত নেই কেন? যেখানে একজন স্বজাতের পণ্ডিতের দস্তখত থাকার কথা ছিলো, সেখানে একজন কেরানির দস্তখত কেন? গ্রাম প্রশাসন কারা চালাচ্ছে? গ্রামপ্রধান নাকি কেরানিগণ? মহান পণ্ডিতদের পদে আবার পণ্ডিত কবে বসবে?’ -এই রকম বেশ কয়েক মন্ত্রের বিপ্লবের ডাক দেন।  যারা তোষামোদ করে গ্রামপ্রধানকে এই দায়িত্বে বসতে বলেছিলো – সংঘের ফেসবুকের আবদ্ধ গ্রুপে অনাবিলের এমন বার্তা দেখে তারা ভাবলো – এই একটা সুযোগ পাওয়া গেল যেখানে অনাবিলকে গ্রামপ্রধান বিদ্বেষী এবং কেরানি বিদ্বেষী হিসেবে প্রমাণ করা সম্ভব। যেই কথা, সেই কাজ। মোবাইলে স্ক্রিনশর্ট নিয়ে সেটা একজন কেরানির কাছে এবং গ্রামপ্রধানের কাছে দিয়েছে যে কেউ।
কেরানিদের হাতে সেই স্ক্রিনশর্ট যাওয়ার সাথে সাথেই তারা একত্রিত হয়। এর আগে এই স্ক্রিনশর্ট গ্রামপ্রধানের কাছে গেলে গ্রামপ্রধান পণ্ডিত সংঘের সভাপতি জনাব ইসলাম খানকে ফোন করেন। ‘অনাবিল ঘোষ তোমাদের আবদ্ধ গ্রুপে যে বার্তা দিয়েছে সেটা তোমাদের কেউ লিক করে দিয়েছে। ওটা এখন প্রায়ই জনে জনে পৌছিয়ে গিয়েছে। কেরানিদের হাতেও গিয়েছে। এই স্ক্রিনশর্টের যে বক্তব্য তাতে কেরানিরা বিব্রত; বখতিয়ার (কেয়ারানি সংঘের নেতা) খুব ক্ষিপ্ত। অনাবিল যেন তাদের সাথে কথা বলে মিটিয়ে নেয়’ – এই কথা বলে বিরক্তি! প্রকাশ করতে থাকে গ্রামপ্রধান। এই কথা শোনার পরে ইসলাম খানও খুব বিব্রত হন। একজন গ্রামপ্রধান কীভাবে একজন জ্ঞানচাষী পণ্ডিতকে একজন কেরানীর সাথে ফোন করে মিটমাট করতে বলেন? এটা ইসলাম খানের মাথায় আসেনা! অনাবিলের সেই বার্তা  কেরানিদের সাধারণ সংঘের জরুরী বৈঠকে ওঠে এবং উক্ত বক্তব্যের মাধ্যমে গ্রামপ্রধান ও কেরানিদেরকে হেয় করা হয়েছে বলে অভিযোগ আনা হয় অনাবিলের বিরুদ্ধে। শুধু তাই নয় তারা রীতিমত লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন গ্রামপ্রধানের কাছে।
কেরানিগণ যে পণ্ডিতগণের থেকে কম চালাক তা কিন্তু নয়। তারাও সুযোগ সন্ধানী বেশ। আর তাদের এই সুযোগ করে দিয়েছে পণ্ডিতদের সাধারণ সংঘের নির্বাচিত কোনো এক পণ্ডিত। যেই পণ্ডিত ব্যক্তি ফেসবুকের আবদ্ধ গ্রুপের  তথ্য অপণ্ডিত কেরানিদের কাছে দিয়েছে – সে কেরানিদের চোখে বিশ্বস্ত বন্ধু হলেও পণ্ডিতদের চোখে সে দালাল এবং বিশ্বাস ঘাতক। ওহ! হ্যাঁ। যেটা বলছিলাম যে কেরানিগণ খুব সুকৌশলী। অচিন্তপুর গ্রামের অর্থ এবং হিসেব ব্যবস্থাপনা পরিচালকের পদে একজন পণ্ডিত এর পরিবর্তে একজন কেরানিকে বসানোর আন্দোলন বেশ আগে থেকেই করে আসছে তারা। অনাবিলদের গ্রুপ থেকে ফাঁস হওয়া তথ্য বেশ কেরানিদের পক্ষে গিয়েছিলো। গ্রামপ্রধান থাকতে থাকতেই এই আইন সংশোধন করার জন্য তারা উঠে পড়ে লাগে। অনাবিলকে নিয়ে যে লিখিত অভিযোগ কেরানিগণ করেছিলো, তার সাথে গ্রামের অর্থব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে একজন পণ্ডিতের পরিবর্তে একজন কেরানি বসবে। এটা তারা লিখিতাকারে গ্রামব্যবস্থাপনা কমিটির কাছেও পেশ করবে বলে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।
এই খবর কোনো না কোনোভাবে অনাবিল ঘোষ জানতে পারে। একটি গোটা ডিম ফাটিয়ে গরম তেলের উপর পেঁয়াজ মরিচ মাখিয়ে দিলে যেমন চটপটিয়ে ফুঁটতে ফুঁটতে ফুলে ওঠে – এই খবর পাওয়ার পরে অনাবিলের মনের অবস্থা এমন হয়। তার এই মনের অবস্থা তৈরি হয় দুটো কারনে; কিছুটা রাগে, আর কিছুটা কষ্টে। রাগের কারন হচ্ছে গ্রামের কেরানিগণ তার নামে অভিযোগ পেশ করেছে যা বড্ড অপমানের। আর কষ্টের কারন হচ্ছে পণ্ডিত হয়ে আরেক পণ্ডিতদের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়ের গোপন কথা ফাঁস করে দিয়েছে। যাদেরকে বা যাকে নিজ গোত্রের লোক ভেবে এসেছে এতদিনে, তাদের বা তার কাছ থেকে এমন বিশ্বাস ঘাতকতা বেশ কষ্টের। আর গোত্রের কথা না হয় বাদই দেওয়া হলো। সমগ্র পণ্ডিতিদের স্বার্থের বিষয়ে একাত্ববোধ না হতে পারা বড় যন্ত্রণার। ‘আমি কাজ করলাম নিজেদের স্বার্থে, শালার! নিজের লোকেই বাঁশ দিলো! কেরানিদের হয়ে দালালি করলো!’ – এই আক্ষেপেই পুড়তে থাকে অনাবিল ঘোষ।
এইসব ভাবনাতেই অনাবিল ঘোষ আজ সকাল থেকেই বিচলিত। ‘কাকের মাংশ কাক খায়না, কিন্তু পণ্ডিতগণ নিজেদের মাংশ নিজেরা খায়; হোক নিজ গোত্রের, হোক গোত্রের বাইরের। আর নিজ গোত্রের মধ্যে যদি কেউ নেতৃত্বের গুণাবলি নিয়ে বেড়ে উঠতে চায়, তাকে না থামানো পর্যন্ত এই পণ্ডিতগণ থামেন না। ইনারা উঠতি ব্যক্তিকে না থামানো পর্যন্ত স্বপ্নে উঠতি ব্যক্তির প্যান্ট খোলে, মাথায় পেরেক ঢুকায়, বাপ-মা চৌদ্দ গোষ্ঠী নিয়ে গালি দেয়, টাট্টি থেকে বালতি বালতি গু তুলে সেই ব্যক্তির মাথায় ঢালে, গোবর দিয়ে গোসল করিয়ে দেয়, একের পর এক চিপা গলি খুঁজতে খুঁজতে থাকে। আর এইভাবে স্বপ্ন দেখতে দেখতে কোনো না কোনোভাবে তারা সফল হয়। যেমনটি হয়েছিল অনাবিল ঘোষের ক্ষেত্রে। এই পণ্ডিতগণের রাজনৈতিক চর্চা বড্ড সেঁকেলে আর ট্রাইবদের রাজনীতির মত। এরা নিজেরা যেমন অন্যদের দমিয়ে রাখতে সদা জাগ্রত থাকে, তেমনি নিজেদের কাউকে দমিয়ে রাখার জন্যও এই উচ্চ শিক্ষিত পণ্ডিতগণ জেগে থাকে, তারা ঘুমায়না, তাদের ঘুম আসে না।
আচ্ছা! অনাবিল ঘোষদের সংঘের যে সদস্য কেরানিদের হয়ে দালালি করেছিল, সেই দালাল কি চিহ্নিত হয়েছিলো? প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের দায়ে তাকে কী কোনী দণ্ড দেওয়া হয়েছিলো? কেরানিগণ যে লিখিত অভিযোগ দিয়েছিলো তার বিপরীতে পণ্ডিতগণ কোনো লিখিত প্রতিবাদ করেছিলো? অনাবিল ঘোষ কী লালগোত্রের নীল অংশ ছেড়ে কী বন্ধু অংশে যোগ দিয়েছিলো? নাকি কোনো পদে বসিয়ে লালগোত্রের প্রবীণ সদস্যরা অনাবিলকে ঠাণ্ডা করিয়ে দিয়েছিল? এইসব প্রশ্নের উত্তর সময়ই হয়তো ভালো দিতে পারবে। হয়তো উত্তর মিলেছিল হয়তো মেলেনি। হয়তো এই উত্তরগুলো খুঁজতে গিয়ে আবার পণ্ডিতগণ কোনো বিবাদে জড়িয়েছে। আর অনাবিলের মত কাউকে মুরগী বানিয়ে কষ্টের দহনে পুড়িয়ে পুড়িয়ে রোস্ট করে গিলে খেয়ে ঈর্ষার জ্বালা জুড়িয়েছে ড. মল্লিকের মত কেউ।
এই হচ্ছে প্রযুক্তি নির্ভর আর জ্ঞানে স্বয়ংসম্পূর্ণ অচিন্তপুর গ্রামের ঘর-সংসার। এইখানকার সংসার বড্ড হিপোক্রেটিক উন্মাদনায় ভরা। এখানে মুখে যা বলা হয়, কাজে হয় তার বিপরীত। পণ্ডিত বলেন, কেরানি বলে, গ্রাম প্রধান বলেন, জ্ঞানোগ্রাহী রাজনীতিক বলেন – সবাই এই খেলা খেলেন। এই পণ্ডিতগণের লালগোত্র বলেন, গোলাপীগোত্র বলেন, আবার লালগোত্রের নীল অংশ বলেন আর বন্ধু অংশ বলেন – সবার মুখেই বছরের তিনশত পয়ষট্টি দিনের প্রায় দিনেই মতাদর্শের বুলির ভাষণে কর্ণকুহর ঝালাপালা করে ফেলে আর ব্যক্তিস্বার্থকে টপটপ করে পকেটে ঢুকিয়ে নেয়। গ্রামপ্রধান মৌমাছির চাক হয়ে বসে থাকে। আর তার আশপাশে লোভী মৌ শিকারী ভনভন করে ঘুরে বেড়ায়। আর এই মধু খাওয়ার দৌড়ে এগিয়ে থাকে প্রত্যেক গোত্রের মুরব্বী সদস্যগণেরা। এই মুরব্বী সদস্যগণ উচ্চ শিক্ষিত হলে কি হবে! ইনারা মানসিকতায় এখনো গ্রামের মত; উন্মাদ ক্ষমতা চর্চার খেলা এরা খেলে, খেলা খেলায়। যারা এই খেলা খেলতে খেলতে বৃদ্ধ হয়েছেন আল্লায় তাদের শান্তি দিক, তাদের সন্তানদের এই খেলা করার সুযোগ দিক/ ভগবান তাদের শান্তি দিক, তাদের সন্তানদের এই খেলা করার সুযোগ দিক। আর এই খেলা খেলতে খেলতে যারা ধরাশয় ছেড়ে চলে গিয়েছেন, আল্লায় তাদের বেহেশত নসীব করুক/ ভগবান তাদের আত্মার শান্তি দিক। বেহেশত/ স্বর্গ থেকে তাদের বিদেহী আত্মা এসে তাদের সন্তানদের উপর ভর করুক – যেন সেই সন্তানগণ তাদের যোগ্য উত্তরসূরী হতে পারে।
লেখক: আসিফ ইকবাল আরিফ
শিক্ষক, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here