ছোট গল্প ‘রতি গড়বড়’

Share It
  • 3
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    3
    Shares

আজ সন্ধ্যের পরপরই বাজার থেকে বাড়ি ফিরেছে আক্কাছ সাহেব। বাড়ির দরজার সামনে এসেই বাজার-সদায় ভর্তি ব্যাগ ঘরের দুয়ারে ফেলে চৈত্রের রোদে কোনো বদজাত লোকের তাবড়ানি খেয়ে হাঁপিয়ে ওঠা কুকুরের মত হাঁপাচ্ছে আক্কাছ। গিন্নিকে গলা ছেড়ে ডেকে একগ্লাস ঠান্ডা আর শীতল পানির আবদার করে সে। গলা ছেড়ে টানা তিনবার ডাক দেওয়ার পরে হেঁশেল ঘর থেকে পানি নিয়ে আসে শুকতারা। শুকতারা আক্কাছ সাহেবের দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রী। শুকতারার বয়স পয়ত্রিশ বছরের মত হবে। শুকতারারও আগে একবার বিয়ে হয়েছিলো। বিয়ের সাতদিন পরেই বজ্রপাতে স্বামী মরে যায়। যাইহোক, আক্কাছ সাহেবের প্রথম স্ত্রী মঞ্জুরা বিবি ক্যান্সারে ভুগে মরে যাওয়ার পরে আবার শুকতারার সাথে সংসার পেতেছে সে। দীর্ঘ দুইবছর একটানা বিছানাগত হয়ে পয়ত্রিশ বছর বয়সে মারা গিয়েছিল মঞ্জুরা। আক্কাছ সাহেবের আগের পক্ষের চৌদ্দ বছরের এক ছেলেও আছে।
আক্কাছ সাহেবের বয়স চল্লিশ বা তার দু’য়েক বছর বেশি হবে। পেশায় সে  একজন স্কুলের কেরানি। বটেতলা গ্রামের উত্তর দিকে বিলের ধারে যে হাইস্কুলটি আছে, সেই স্কুলেই কেরানির পদে চাকরি করে আক্কাছ সাহেব। চাকরির পাশাপাশি আক্কাছ সাহেবের  প্রায় দুই বিঘার মত জমাজমিও আছে।  বটেতলা গ্রামের দক্ষিণ দিকে মুচিপাড়ায় যে একটি মাত্র মুসলমানের ঘরবসতি আছে, সেটা হচ্ছে আক্কাছ সাহেবের। বসতবাড়ির ন্যায় আক্কাছ সাহেবের অন্যান্য জমাজমিও এই মুচিপাড়াতেই। এই জমির অধিকাংশই তার নিজের মেহনতের রোজগারে কেনা। বাকী যে জমি আছে সেসব তার পৈতৃক সম্পত্তি। আর চাকরী করেন বলেই এই পাড়ার লোকজন তাকে সাহেব বলে সম্বোধন করে। যাইহোক, শুকতারা বেগমের হাত থেকে পানির গ্লাস নিয়ে ঢকাঢক শব্দে সব পানি গিলে নিলো আক্কাছ। ক্লান্ত কায়া নিয়ে ঘরে ঢুকে আর্ধ্বভাঙ্গা খাটের উপর চিৎপটাং হয়ে শুয়ে শুয়ে পকেট থেকে একটি সিগারেট বের করে দিয়াইশলাই দিয়ে আগুন ধরিয়ে টানতে লাগলো।
আক্কাছ সাহেবের চোখ-মুখে পাহাড়সম চিন্তার ভার। আর তার এই চিন্তার ভার যে, যে কেউ ঠেলে সরাতে পারবে তা কিন্তু  নয়। যে সমস্যার আদিপাতে তার এই চিন্তার ভার তা কাটিয়ে ওঠার জন্য অন্য কাউকে বলে সমাধান বের করার পথ অত্যন্ত লজ্জ্বাজনক। বিশেষ করে নিজ গ্রামের আর পাড়া-প্রতিবেশীদের বলা তো আরও লজ্জ্বার ব্যাপার! পাড়া-প্রতিবেশীদের কাউকে বললে হয়তো তাদের অভিজ্ঞতা থেকে সদপরামর্শ প্রদান করবে কিন্তু দুইদিন পরে যদি এটা নিয়ে রীতিমত খোঁচাতে শুরু করে তখন তা আর আক্কাছ সাহেবের সহ্য হবেনা – এই ভেবে সে কাউকে তার মনের কথা বলেনা। ইতোমধ্যে আক্কাচ সাহেবের সিগারেটের আগুন প্রায় ফিল্টারে এসে ঠেকেছে। কাল সকালে সে দুর গ্রামের বদরুদ্দীন কবিরাজের কাছে যাবে বলে মনস্থির করে কিছুক্ষণের জন্য চোখ বন্ধ করে।
যে গড়বড়ে অবস্থার মধ্য দিয়ে আক্কাছ সাহেব শুকতারার সাথে সংসার জীবন পার করছে, বিশেষ করে স্বামী-স্ত্রীর একান্ত সোহাগের সময় – তাতে আক্কাছ সাহেব বড্ড ক্লান্ত হয়ে যাচ্ছে। আক্কাছ সাহেবের মনের মধ্যে যে দ্বন্দ্বের মিছিল চলছে, সেটার একটা অবসানের পথ বের না হলে তার এই চল্লিশ বছরের বেশি বয়সের জীবন আরও বেশি বিষণ্ণ হয়ে উঠতে পারে বলে সে মনে মনে ভাবতে থাকে। আবার আগের বউ মঞ্জুরা বিবির ভাবনায় ডুবে যায় সে কিছু সময়ের জন্য। মঞ্জুরা বিবি বড্ড সংবেদনশীল একজন নারী ছিল। নিজের যে সুখ বলে কিছু ছিলো, তার কাছে তা মনে হতোনা। সেই তুলনায় শুকতারা বড্ড স্বেচ্ছাচারী স্বভাবের। কোনো নিয়ম কানুনের ধার ধারেনা, নিজের খেয়াল মত চলে। এইসব ভাবনা যখন আক্কাছের মনের গভীরে দানা বাঁধছে, ঠিক তখনই শুকতারা ঘরে ঢুকলো। “হেঁশেল ঘরে খাবার আছে” – এই কথা বলে কোমল ঠোঁটে শ্বাস-প্রশ্বাস চেপে ধরে ছিঁটি বাজিয়ে ঘরের কোনার ড্রেসিং টেবিলে নিজের সুরত খানি দেখতে লাগলো।
শুকতারার চলাফেরা আর কথাবার্তা আক্কাছের কাছে রীতিমত গড়বড় মনে হচ্ছে। গত ক’য়েক মাস ধরেই সে এইগুলো দেখে যাচ্ছে। আক্কাছ সাহেব তার ‘প্রাইভেট জীবনে’ মানে তার সাংসারিক জীবন সম্পর্কে যে জ্ঞান অর্জন করেছে আর সমাজের পারিপার্শ্বিকতায় যা দেখেছে বা শুনেছে, শুকতারার আচরণ আর আক্কাছ সাহেবের শিক্ষা – সবকিছুই গোলমাল হয়ে যাচ্ছে। এক ধরণের বিভ্রান্তির জাল তৈরি করছে  রীতিমত। আর সঙ্গমের সময় বা রতিকালীন সময়ে শুকতারা যে বড্ড কামাতুর আর আগ্রাসী হয়ে আক্কাছ সাহেবের শরীরের উপর চেপে বসে – এই ধরণের আচরণ কোনো নারীর হতে পারেনা বলে আক্কাছ সাহেবের কাছে মনে হয়েছে। কাম বা সঙ্গমের ইচ্ছা স্ত্রী লোক মনে পুষে রাখে আর পুরুষ কামের ইচ্ছা প্রকাশ করে। যুগযুগ ধরে এই বটেতলা গ্রামে এটাই হয়ে আসছে। সুতরাং স্বামী-স্ত্রীর সোহাগ বা মিলনে শুকতারার পুরুষসুলভ আচরণ বড্ড প্রথাবিরোধী এবং বেমানান। তাই শুকতারার এমন কর্ম লীলাকে স্ত্রী লোকের আচরণ হতে পারে বলে মেনে নিতে পারেছেনা আক্কাছ সাহেব।
রাত বেশ ভার হচ্ছে। শনশন করে কার্তিকের মৃদু হাওয়া বইছে। আধা ঘুম চোখে নিয়ে আবার আর একটি সিগারেট ধরায় আক্কাছ। এদিকে শুকতারারও চোখে ঘুম চলে এসেছে। তবে পয়ত্রিশ বছরের যৌবনা শুকতারার ভেতরটা  আবেশ পাথরে মধুর মধুর আঘাত পেতে থরথর করে কাঁপতে শুরু করেছে। এই মুহুর্তে সে যে রীতিমত সঙ্গমে লিপ্ত হতে চায় তা কিন্তু আক্কাছ সাহেব বুঝতে পেরেছেন। এমন সময় অর্ধঘুম আর পূর্ণ সঙ্গমের বাসনা নিয়ে আক্কাছ সাহেবের শরীরে চেপে বসে শুকতারা। “লাজলজ্জ্বা বলে কি কিছুই নেই! মেয়ে মানুষ হয়ে পুরুষ মানুষের শরীলে লাফ দিস” – আক্কাছ সাহেব রেগে গিয়ে এইকথা বলে।
স্ত্রী লোক থেকে কামচিত্তের প্রকাশ – এটা আক্কাছ সাহেব মেনে নিতে পারছেননা। আগেই বলা হয়েছে যে সে যে গ্রামে বসবাস করে, সেই গ্রামের মধ্যে আর দশজন নারীও শুকতারার মত এইরকম কাম ক্ষুধার প্রকাশ ঘটায় – এমনটা আক্কাছ সাহেবের অজানা। আর সবচেয়ে বড় কথা আক্কাছ সাহেবের যে প্রথম পক্ষের স্ত্রী ছিলেন, সে অত্যন্ত সংবেদনশীল নারী ছিলেন। মঞ্জুরা বিবির সাথে কাটানো দীর্ঘ দিনের সংসার জীবনে আক্কাছ সাহেব সংসারের সকল সময় জুড়ে নিজের ইচ্ছাতেই সঙ্গম করেছেন। আবার মঞ্জুরার অনিচ্ছা স্বত্বেও তিনি অসংখ্যবার স্ত্রী মিলন করেছেন। মিলনকালীন সময়ে পঞ্চমায়া নিষ্ক্রিয় আর নিথর হয়ে পড়ে থাকতেন।
আক্কাছ সাহেবের অতীত রতিক্রিয়ার অভিজ্ঞতা আর বর্তমান রতিক্রিয়ার যে চিত্র তা পুরোপুরি উল্টো। সুতরাং আক্কাছ সাহেবের মনে যে এক ধরণের রতি গড়বড় অবস্থা যাচ্ছে তা কিন্তু বলাই যায়। আর এই রতির গড়বড়ই বড্ড ভাবাচ্ছে তাকে। পুরুষের কাম প্রকাশ আর কাম ভাব দেখলে বটেতলা গ্রামের পুরুষদের মনে কোনো প্রশ্ন জাগেনা। তবে স্ত্রী লোক যদি স্বামীর নিকট কাম-সোহাগের আবদার জানায় তাহলে কেলেংকারী হয়, সংসার ভাঙ্গার ভয় আসে, এমন কি স্ত্রী লোক অন্য পরপুরুষের প্রতি আসক্ত হতে পারে বলে সন্দেহ করা হয়। আর যদি কোনো স্ত্রী লোকের স্বামীর চেহারা রোগগ্রস্থ হয় তাহলে সে ‘ভাতার খেকো’, ‘রাক্ষুসী’  ইত্যাদি বিশেষণে বিশেষায়িত হয় সমাজের কাছে। আর কোনো পুরুষ লোকের স্ত্রী যদি রোগগ্রস্থ হয় তাহলে সংসারের দায় চাপিয়েই সেখান থেকে পুরুষগণ বের হয়ে আসেন। ‘সংসারের কাজেই স্ত্রী লোক কাবু বা রোগাটে হয়ে গিয়েছে’ – বলে পুরুষ দাবি করে। আর শুধু পুরুষই নয়, অনেক স্ত্রী লোকও এমন দাবি করে অনায়াসে। আবার মাঝে মাঝে সমাজ তাদেরকে লক্ষ্মী উপমাতেও উপমিত করে।
আজ রাতে আর রতিক্রিয়া হলোনা। কোনো ইচ্ছা নেই বলে সাফ সাফ জানিয়ে দেয় আক্কাছ সাহেব। “বেহায়া মাগির চলন-বলন; ধর্মকর্ম আর সমাজের কোনো শিক্ষার বালাই ভেতরে নেই” – একথা বলে উল্টোদিকে শুয়ে গভীর মনোযোগ দিয়ে কি যেন ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে যায় আক্কাছ সাহেব। অন্যদিকে কামের আবেশ চাদরে না জড়াতে পেরে মেজাজ দেখিয়ে শুকতারও ঘুমিয়ে গেলো।
পাড়ার মোরগ ডাকা ভোরের আগেই আক্কাছ সাহেবের ঘুম ভাঙে। নিজের একান্ত ব্যক্তিগত কাজ সেরে আক্কাছ আলী বদরুদ্দীন কবিরাজের বাড়ির উদ্দেশ্যে মদনপুরে যাত্রা শুরু করলো। সারা দুই ঘণ্টার বাইসাইকেল চালিয়ে সে কবিরাজের বাড়ি এসে পৌছালো। নিজেরর পরিচয় দিতে দিতেই আধভাঙা এক কাঠের চেয়ারে বসে পড়লো সে। প্রাথমিক আলাপ-চারিতা শেষে গভীর আলোচনায় গেল তারা।
“বড্ড বিপদে আছি বাবা। বউ বড়ই বেহায়া আচরণ দেখায়; রতি, কাম আর দেহের ক্ষুধার কথা মুখে প্রকাশ করে আর শরীরের উপর চেপে বসে, কোনো লাজ-লজ্জ্বার বালাই নেই একেবারে” – এই বলে আক্কাছ সাহেব ফরিয়াদ জানায় কবিরাজের কাছে। “বলিস কি রে আক্কাছ? জমিন ওঠে লাঙ্গলের উপর! এই তো মেয়ে লোকের রতিক্রিয়ায় স্বৈরাচারী আচরণ! তোর কপালে তো শনি আছে রে আক্কাছ! আবার তোর স্ত্রী কামের ভাব প্রকাশ করে তোর কাছে! আর কামে সক্রিয় তো পুরুষের চরিত্র রে”! – আক্কাছের ফরিয়াদের বিপরীতে বলে কবিরাজ। সমাজ আর সংসারের ভারে যে স্ত্রী জাতের কাম ভাব দমন পীড়নের যাতাকলে পড়ে নিথর আর নিস্ক্রিয় হয়ে থাকে তা কবিরাজ মশাই জানলেও বহুদূর থেকে ছুটে আসা আক্কাছকে সে হতাশ না করে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করে।
“সংসার টিকিয়ে দাও বাবা! তার রতির আগ্রহ আমাকে নাশ করে দিলো। আমি কোনো কাজেই মন দিতে পারিনা। আর দিন নেই, রাত নেই, আমার উপর চেপে বসে। আর তার থেকেও বড় বিপদের কথা সে সঙ্গমের কথা মুখে বলে। লজ্জ্বায় আমার মাথা যায়” –আবারও কবিরাজের কাছে নিজের কথা জানায় আক্কাছ। গ্রামের আর দশজনের কাছে বলতে না পারলেও কবিরাজের কাছে হুড়হুড়িয়ে সব বলে দিল আক্কাছ কেননা এখানে তথ্য দিলে তথ্য ফাঁস হবেনা  বরং সমাধানের পথ বের হবে।
 নর-নারীর রতিক্রিয়ায় যে দুইজনেরই সমান আগ্রহ থাকে আর সমান আগ্রহের কারনেই যে মিলন মধুর হয় – এটা কবিরাজ জানা সত্বেও স্বজাতির দিকেই নিজের অবস্থান নিলো।
রতিক্রিয়াতে শুকতারার মুখফুটে ইচ্ছা প্রকাশের বিষয়টি কবিরাজও ভালোভাবে মেনে নিতে পারেনি। ধর্মগ্রন্থে তো এটা বলা নেই। কেননা সমাজে তো এটা চলে না।  তবে সমাজ আর সমাজের পারিপার্শ্বিক চাপের কারনে যে সঙ্গম স্ত্রী লোকের কাছে বড়ই লজ্জ্বার বিষয় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে – এ কথা কবিরাজ নিজেও জানতেন না বা সেই জ্ঞানের গভীরে সে এখনও পৌছাতে পারেনি। সুতরাং রতিক্রিয়ার আচার বিধি নিয়ে সমাজে যা কিছু প্রচলিত আছে, সেইগুলোই কবিরাজ এবং আক্কাছের মাথায় গেঁথে আছে। “স্ত্রী লোকের বুক ফেঁটে চৌচির হয় কিন্তু মুখ তো ফোটেনা” – এ কথা বলে আক্কাছের কাছে। “তোর কোনো সমস্যা নেই তো? মানে মেশিন ঠিক আছে তো? তেল কি বের হয় ঠিকঠাক”? – আক্কাছের চোখের দিকে তাকিয়ে আবার জিজ্ঞাসা করে কবিরাজ। “আমার তো সব ঠিকঠাক আছে। ঠিক না থাকলে কি আমি সন্তানের বাপ হতাম বাবা! তবে দেহের অবস্থা দিনদিন খুব খারাপই হচ্ছে। আর পেরে উঠছিনা” – কবিরাজকে সহসা বলে আক্কাছ।
আক্কাছের বিষয়টি বদরুদ্দীন কবিরাজ এর কাছে কিছুটা অস্পষ্ট ছিলো। কিছু বুঝতে পারলো আর কিছু না বুঝে অনুমান করে নিলো। তবে আক্কাছের স্ত্রী কর্তৃক রতিক্রিয়া আহ্বানের বিষয়টি কবিরাজকেও ভাবনায় ফেলে দেয়।  যাইহোক, কবিরাজ একটি তাবিজ দিলো ঘরের কোনায় পুতে রাখার জন্য আর আক্কাছ সাহেবকে কিছু শালসা কবিরাজি গাছ-গাছড়া দিলো যাতে তার যৌন শক্তি কিছুটা হলেও বৃদ্ধি পায়। আবার সাথে সাথে এটাও বলল যে বউকে যেন আক্কাছ একটু ধর্মকর্মের দিকে নিয়ে আসে। ধর্মের বিধান জানলে রতিক্রিয়ায় লজ্জ্বাবোধ আসলেও আসতে পারে। কবিরাজ বাড়ী থেকে ফিরে এসে নাওয়া-খাওয়া সেরে যথারীতি আক্কাছ সাহেব স্কুলে চলে গেলো। তবে যাওয়ার আগে বউয়ের কাছে কিছু আদেশনামা পেশ করতে মোটেও ভুল করলেন না। “ধর্মকর্মের কাজ কিছু কর। আর টেবিলের উপর ‘স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক’ নামের যে বইটি আছে একটু বানান করে করে পড়তে থাক” – এই কথা বলে আক্কাছ সাহেব ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ে।
এর পরের দু’য়েক রাত ভালো গেলো তাদের। আক্কাছ সাহেব ভাবলেন মনে হয় লজ্জ্বার আবেশ কিছুটা হলেও শুকতারার মনে আটকাচ্ছে।
একদিন রাতে আবার তারা ঘুমাতে গেলো। আজ আবার রতিক্রিয়ার আহ্বান শুকতারার দিক থেকে আগে এলো। আক্কাছ রেগে গিয়ে নিজের কান-মুখ চুলকাতে লাগলেন। “মাগির কি কোনো লাজলজ্জ্বা নেই। খানকি একটা………” – এইসব মুখে অনর্গল বলাবলি শুরু করলো আক্কাছ।
শুকতারার রতিকর্মে সক্রিয়তাকে আক্কাছ সাহেব কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেনা। স্ত্রী লোককে যদি কামে বশীভূত করা না যায় বা স্ত্রী লোক যদি সঙ্গমে সংবেদনশীল না হয় তাহলে সংসারে অমঙ্গল আসবে বলে অনেক পুরুষই মনে করেন। স্ত্রী লোককে অবদমন করে রাখবার জন্য  সমাজে যে প্রচলিত নিয়ম আর রীতির বেড়াজালে লজ্জ্বা নামক যে রশি রয়েছে, সেই জ্বালের আবরণে শুকতারাকে বাঁধতে না পারলে যে সমাজ ও সংসারে আক্কাছের ক্ষমতা হ্রাস পাবে তা আক্কাছের হাড়ে হাড়ে জানা। আক্কাছ সাহেব শুকতারার নিকট কামবাসনা প্রকাশ করবে, শুকতারার দেহে ঝাপিয়ে পড়ে কামসুখ উপভোগ করবে এটাই তার কাছে স্বাভাবিক ঘটনা। আর এতোদিন ধরে চলে আসা সেই চর্চারই অংশ সে। একটি ডাহা মিথ্যা কথাকে দশবার মুখে উচ্চারণ করলে যেমনি সত্যের মত মনে হয় তেমনি আক্কাছ সাহেবের সঙ্গম চিন্তা আর চর্চা নিজের কাছে মহা সত্য মনে হয়। সে যেমন কামাগ্রাসী হতে পারে, এমন যে শুকতারাও হতে পারে এটা আক্কাছ সাহেব মেনে নিতে পারেনা। রতিক্রিয়া আক্কাছ সাহবের যে সক্রিয়তা সেটা তার কাছে চরম সত্য। আর শুকতারা যে নিষ্ক্রিয় থাকবে এটাও তার কাছের সত্যের মত। তাই নিজের সত্য প্রতিষ্ঠা করার জন্য শুকতারার সত্য তার কাছে মিথ্যা বা অসত্যের মত মনে হয়। আর তাই দীর্ঘদিনের চর্চা, চিন্তা এবং বিশ্বাসের ফলে রতিক্রিয়ার এই চিন্তাগুলো আক্কাছ সাহেবের মনে নীল নকশার মত গেঁথে গেছে।
রতিক্রিয়ায় সাধারণত পুরুষই সক্রিয় থাকবে। আর নারী থাকবে নিষ্ক্রিয়। একজন পুরুষ তার সমস্ত ক্রিয়াশীল যৌন অঙ্গ-প্রতঙ্গের মাধ্যমে কামে লিপ্ত থাকবে আর নারী দেহ থাকবে শুধুমাত্র সেই ক্রিয়ার গ্রাহক হিসেবে। সমাজের এই ধরণের প্রচলিত মতবাদ আরও বেশি আক্কাছ সাহেবের মনে সঙ্গম নিয়ে ঝাপসা জ্বাল তৈরি করেছিলো।  রতিক্রিয়ায় শুকতারার চাল-চলন দেখানো আক্কাছের মনে রীতিমত অস্বাভাবিক ঝড় তুলেছিলো। তবে রতিক্রিয়ায় কার যে কি দায়িত্ব – বিশেষ করে কে সক্রিয় থাকবে আর কে নিষ্ক্রিয় থাকবে – তার কোনো নিয়ম নীতি আছে কি বা নাই বা তার উৎপত্তি কোথায় এবং কেমনভাবে হয়েছে তা কেউই জানেনা। আর যদি এমন বিধিমালা থাকে যা যুগে যুগে পরিবর্তিত হয়েছে কি হয়নি বা ভবিষ্যতে পরিবর্তন হবে কি হবেনা তা নিয়ে ভাবনার বাইরে গিয়েই দু’জনে দুজনের মতেই আবদ্ধ থাকে। দু’জনের মনেই রতির গড়বড় হচ্ছে। তাদের রতিক্রিয়ার ইচ্ছা সঙ্গমে পরিণত হওয়ার সুযোগ হারাচ্ছে।
তারপর আর অনেকদিন খবর নেওয়া হয়নি। আক্কাছ আর শুকতারার মন থেকে রতিক্রিয়ার গড়বড় দুর হয়েছে কি হয়নি!
লেখকঃ আসিফ ইকবাল আরিফ
সহকারী অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়, ত্রিশাল, ময়মনসিংহ।

Share It
  • 3
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    3
    Shares

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here