বেশকিছু দিন যাবত বীর মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযুদ্ধের প্রজন্মের মধ্য থেকে মুক্তিযোদ্ধা সংসদের নির্বাচনের জোরালো দাবি উঠেছে এবং দাবিটি সংগতকারণে দিনকে দিন প্রবল থেকে প্রবলতর হচ্ছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই । কিন্তু মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী মহোদয় কেনো ও কী কারণে এতোকাল সেই নির্বাচন স্থগিত করে রেখেছেন তা অনেকের কাছেই বোধগম্য ছিলো না । তবে সচেতন মুক্তিযোদ্ধারা হয়তো এর পেছনের কারসাজিটা বুঝতে পারেন ।

মূলত: মুক্তিযোদ্ধা ক্রীড়া চক্রের জুয়া ও অমুক্তিযোদ্ধাদের মুক্তিযোদ্ধা বানানোর বিশাল বাণিজ্যকে কেন্দ্র করেই মুক্তিযোদ্ধা সংসদকে অকার্যকর করে রাখা হয়েছে । এক অভিযানে ক্যাসিনো বন্ধ হওয়ার ফলে মুক্তিযোদ্ধা ক্রীড়া চক্রের জুয়াও বন্ধ হয়ে গেছে । অপরদিকে বিশাল ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা বাণিজ্য প্রকল্পের কাজও গুটিয়ে এসেছে । ইতোমধ্যে মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্টদের উদরপূর্তিও ঘটেছে । ফলে এখন মুক্তিযোদ্ধা+অমুক্তিযোদ্ধা = মুক্তিযোদ্ধা তালিকা প্রকাশ ও মুক্তিযোদ্ধা সংসদের নির্বাচন দেয়াই যায় । এই নিরিখে সম্প্রতি মুবিম মন্ত্রী বাহাদুর আগামী ষোলো ডিসেম্বরের মধ্যে  মুক্তিযোদ্ধাদের তথাকথিত তালিকা প্রকাশসহ আগামী জানুয়ারি মাসে মুক্তিযোদ্ধা সংসদের নির্বাচন অনুষ্ঠানের একটা ইংগিত দিয়েছেন । যদিও মুক্তিযোদ্ধারা ফালতুকথা, মিথ্যাচার ও অতিকথনপ্রিয় মন্ত্রী বাহাদুরের কোনো কথার ওপর আস্থা রাখেন না, তারপরও কেনো জানি এবার সবাই একটু নড়েচড়ে বসেছে । পর্দার অন্তরালে, এমনকি কোনো কোনো  ক্ষেত্রে কেউ কেউ প্রকাশ্যে অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচন নিয়ে তৎপরতা শুরু করে দিয়েছেন ! বিভিন্ন উৎসাহী পর্যবক্ষেকরা ইতোমধ্যেই মুক্তিযোদ্ধা সংসদের নির্বাচনে কারা চেয়ারম্যান প্রার্থী হতে পারেন, তা নিয়ে আগাম বায়বীয় আভাস-ইংগিত দিয়ে নানান জরিপকর্ম করে যাচ্ছেন ।

মুক্তিযোদ্ধা সংসদ মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিনিধিত্বশীল একটি একক বৃহত্তম সংগঠন তা বলার অপেক্ষা রাখে না । বাংলাদেশের প্রতিটি জেলা-উপজেলায় মুক্তিযোদ্ধা সংসদের পাকা অফিসসহ বিভিন্ন হাট-বাজার ও বিভিন্ন  সরকারি স্থাপনার সাথে মুক্তিযোদ্ধা সংসদের একটা অর্থনৈতিক সংযোগ আছে । সরকার বিভিন্ন সময় মুক্তিযোদ্ধা মাসিক ভাতা ছাড়াও মুক্তিযোদ্ধাদের কল্যাণে যৎকিঞ্চিত আর্থিক সহযোগিতাও করে থাকে । ফলে মুক্তিযোদ্ধা সংসদকে কেন্দ্র করে মুক্তিযোদ্ধাদের মনে একটা আগ্রহ রয়েছে । এরই পরিপ্রেক্ষিতে মুক্তিযোদ্ধা সংসদের নির্বাচন সংক্রান্ত মন্ত্রী বাহাদুরের বক্তব্যে সবাই সংগতকারণে বেশ তৎপর হয়ে উঠেছে ।

কিন্তু সবচে’ বড়ো প্রশ্ন, মুক্তিযোদ্ধা সংসদের নির্বাচন যে হবে, কিন্তু ভোটার কারা ? আমরা জানি, যেখানে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের সংখ্যা দেড়লক্ষের নিচে, সেখানে সরকারি গেজেটে আসছে দু’লক্ষ পঁয়ত্রিশ হাজার মুক্তিযোদ্ধা । শহীদ ও মৃত মুক্তিযোদ্ধাদের ভোটার তালিকায় নাম না থাকার ফলে কমবেশি এক লক্ষ আটাত্তর হাজার মুক্তিযোদ্ধা ভোটার বলে গণ্য হবেন । অর্থাত্ জীবিত মুক্তিযোদ্ধারাই হবেন ভোটার ।

আমাদের হিশেবে বিদ্যমান মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় কমবেশি পঁচাশি হাজার অমুক্তিযোদ্ধা রয়েছে যারা তুলনামূলক একটু কমবয়সী । প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধার একটি বিরাট সংখ্যক শহীদ ও মৃত । সে-নিরিখে  ভোটারদের মধ্যে হয়তো প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের থেকে অমুক্তিযোদ্ধাদের সংখ্যা একটু বেশিই হবে । অমুক্তিযোদ্ধারা স্বভাবত: প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের রোষানলে থাকার ফলে অমুক্তিযোদ্ধা ভোটাররা তাই ঐক্যবদ্ধ । ফলে অমুক্তিযোদ্ধা মুক্তিযোদ্ধারা নিজেদের অস্তিত্ব রজায় রাখার জন্যে তারা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ নির্বাচনে বিপুল ভূমিকায় অবতীর্ণ হবে । বিশেষ করে উপজেলা/জেলা পর্যায়ের নির্বাচনে অমুক্তিযোদ্ধা যারা প্রাথী হবে, তাদের পক্ষে অমুক্তিযোদ্ধারাই ভোট দেবে । এর প্রভাবে কেন্দ্রীয় পর্যায়ে যে প্যানেল ভুয়াদের ব্যাপারে নমনীয়, সেই প্যানেলকে জিতিয়ে আনার লক্ষ্যে অমুক্তিযোদ্ধারা আদাজল খেয়ে নামবে । ফলে নির্বাচনে মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাদের দখলে চলে যাবে  বলে প্রবল শঙ্কা রয়েছে ।
তবে যদি প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধারা অতীতের পুরাতন  নেতাদের দুর্নীতি ও লুটপাটের কথা, তাদের নিজেদের বঞ্চনা ও আত্মমর্যাদার কথা স্মরণসহ অমুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি তাদের ক্ষোভকে যথাযথভাবে চেতনায় শানিত করে সত্যিকার অর্থে কোনো মুক্তিযোদ্ধা-বান্ধব আদর্শবান সৎ ও সাহসী নেতৃত্ব তথা নতুন নেতৃত্ব সৃষ্টি করার লক্ষ্যে ইস্পাত কঠিন ঐক্যবদ্ধ ভূমিকা রাখতে পারেন, তাহলে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের একটা বিজয়ের সম্ভাবনা রয়েছে । এ প্রেক্ষিতে ১৯৭০ সালের জাতীয় নির্বাচন প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের সামনে একটা চেতনার উদাহরণ হয়ে উঠতে পারে । পাকিস্তানের প্রবল প্রতাপশালী সামরিক শক্তি, বেসামরিক আমলাতন্ত্র,  ধনবান বাইশ পরিবারসহ সাম্প্রদায়িক ও অন্যান্য সমাজশক্তির বিরুদ্ধে বাঙালিরা যেমন করে বঙ্গবন্ধুর পক্ষে ইস্পাত কঠিন দৃঢ়তা নিয়ে সেই নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয় লাভ করেছিলো, তেমনি যদি প্রকৃত বীর মুক্তিযোদ্ধারা সর্বপ্রকার ভয় শঙ্কা ও লোভকে পদদলিত করে ঐক্যবদ্ধ হয়ে তাদের মনোনীত নেতৃত্বের পক্ষে নেমে পড়েন, তাহলে তাদের বিজয়কে কেউ ঠেকিয়ে রাখতে পারবে না ।

* আবীর আহাদ
চেয়ারম্যান, একাত্তরের মুক্তিযোদ্ধা সংসদ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here