তার পরও ফিরতে হবেই

Share It
  • 2
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    2
    Shares

উত্তরের ট্রেন মিলছে বড্ড দেরিতে

সড়কপথে বাসযাত্রায় সংকটের মুখে ঈদে ঘরমুখো মানুষ ছুটছে রেলস্টেশনে। গতকাল সোমবার রাজধানী থেকে ছেড়ে যাওয়া প্রতিটি ট্রেনের ভেতরে তো বটেই, ছাদেও উপচে পড়ছিল যাত্রী। কমলাপুর রেলস্টেশনের পর অন্য কোনো স্টেশন থেকে ট্রেনে ওঠাই দুঃসাধ্য। এ অবস্থায় কমলাপুর অভিমুখী ট্রেনগুলোতে বিমানবন্দর স্টেশন থেকেই যাত্রীরা উঠে বসে। আন্ত নগর, লোকাল, মেইল ট্রেন—সর্বত্র গতকাল ছিল একই চিত্র। বিশেষ করে ঢাকা থেকে উত্তরাঞ্চল ও খুলনা অভিমুখী ট্রেনগুলোর যাত্রীদের গতকাল কমলাপুর রেলস্টেশনে অপেক্ষায় থাকতে হয়েছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা।

কমলাপুর রেলস্টেশনে গতকাল সকালে গিয়ে দেখা যায়, ট্রেনের জন্য তিন থেকে চার ঘণ্টা ধরে অপেক্ষা করছে হাজার হাজার যাত্রী। রাজশাহী যাওয়ার আন্ত নগর ধূমকেতু এক্সপ্রেস ট্রেনের যাত্রী মুনিরা ইমন বলেন, ‘ভোর থেকে বসে আর দাঁড়িয়ে তিন ঘণ্টা কেটেছে। এখনো কেউ বলতে পারছে না যে ট্রেন কখন আসবে।’ ভিড়ের মধ্যে মালপত্র নিয়ে একবার এখানে আবার ওখানে কোনো রকমে বসে বা দাঁড়িয়ে থাকা মুনিরার চোখে-মুখে ঈদ যাত্রার আনন্দরেখার পরিবর্তে বিরক্তি।

খোঁজ নিয়ে জানা গেল, ধূমকেতু এক্সপ্রেস কমলাপুর থেকে ছেড়ে যাওয়ার নির্দিষ্ট সময় সকাল ৬টা। কিন্তু ট্রেনটি কমলাপুর রেলস্টেশনেই পৌঁছায় সকাল পৌনে ৯টায়। সোয়া ৯টায় ভেতরে-বাইরে ঠাসাঠাসি করে যাত্রী নিয়ে সেটি গন্তব্যের উদ্দেশে কমলাপুর ছেড়ে যায়। এবার মুনিরা ইমনের চোখে-মুখে বিরক্তির জায়গায় দেখা গেল আনন্দরেখা। ভিড়ের মধ্যে জানালা দিয়ে হাত নেড়ে বললেন—যাচ্ছি।

গতকাল দীর্ঘ অপেক্ষার পর নির্ধারিত ট্রেনযোগে যাত্রীরা ছোটে রাজশাহী, খুলনা, চট্টগ্রাম, সিলেট, সিরাজগঞ্জ, দিনাজপুর, রংপুরসহ বিভিন্ন রুটে। তবে বড় বেশি অপেক্ষা করতে হয়েছে উত্তরের বিভিন্ন রুটের ট্রেনের জন্য। কমলাপুর রেলস্টেশন থেকে রংপুরগামী ট্রেনটি সকাল ৯টায় ছাড়ার কথা। সেটি ছাড়ে দুপুর ১টায়। ওই ট্রেনের যাত্রী জুবায়ের আহমদ বললেন, ‘আগাম টিকিট কিনেছি সাত ঘণ্টা দাঁড়িয়ে। এবার টিকিট হাতে নিয়ে ট্রেন পাচ্ছি না। প্রতি ঈদেই এমন অবস্থা হয়। বাধ্য হয়েই আমাদের তা মেনে নিতে হচ্ছে।’

গতকাল সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় রেলওয়ের কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রে সন্ধ্যা ৬টায় খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ওই সময় পর্যন্ত আন্ত নগর রংপুর এক্সপ্রেসের বিলম্ব ছিল পাঁচ ঘণ্টা ৪৩ মিনিট। সে সময়ও ট্রেনটি চাটমোহর স্টেশন থেকে কিছুটা দূরে অবস্থান করছিল। ঢাকা থেকে নীলফামারীর চিলাহাটি অভিমুখী আন্ত নগর নীলসাগর এক্সপ্রেস ট্রেনটি সকাল ৮টায় কমলাপুর ছাড়ার কথা ছিল। সেটি ছাড়ে চার ঘণ্টা বিলম্বে। গতকাল সন্ধ্যা ৬টা ৪০ মিনিটে ট্রেনটি আত্রাই অতিক্রম করছিল। তখন পর্যন্ত বিলম্ব ছিল পাঁচ ঘণ্টা ২০ মিনিট। এভাবে একতা এক্সপ্রেস ছাড়া উত্তরাঞ্চল অভিমুখী বিভিন্ন রুটের প্রতিটি ট্রেনই বিলম্বে যাত্রা করে।

গতকাল চারটি বিশেষ ট্রেন ছাড়ে যাত্রী নিয়ে। বিশেষ ট্রেনও চলেছে বিলম্বে। ঢাকা থেকে লালমনিরহাটমুখী লালমনি ঈদ বিশেষ ট্রেন ছাড়ার নির্ধারিত সময় ছিল সকাল সোয়া ৯টা। সেটি কমলাপুর ছেড়ে যায় বিকেল পৌনে ৩টায়। এই ট্রেনের জন্য অপেক্ষমাণ ক্ষুব্ধ যাত্রীরা বলে, সকালের ট্রেন বিকেলে যাবে এমনটা আগে হয়নি। এবার হয়েছে।

এ ছাড়া ঢাকা থেকে দেওয়ানগঞ্জ অভিমুখী ঈদ বিশেষ ট্রেন আধাঘণ্টা দেরিতে সোয়া ৯টায় কমলাপুর ছেড়ে যায়।

রেলের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা জানান, ঈদে যাত্রীর চাপ বেড়ে যাওয়ায় বিভিন্ন রেলস্টেশনে ট্রেনের বিরতির সময় দ্বিগুণ বা তারও বেশি হয়েছে। এ কারণে সময়সূচি ঠিক রাখা সম্ভব হচ্ছে না। ঈদ যাত্রা শুরুর পর ঢাকা থেকে খুলনা যাওয়ার ট্রেন সুন্দরবন প্রতিদিনই বিলম্বে যাত্রা করছে। সকাল ৬টা ২০ মিনিটে ট্রেনটি কমলাপুর ছাড়ার কথা থাকলেও গতকাল সেটি ছেড়ে যায় সকাল সাড়ে ৮টায়।

সদরঘাটে মানুষ আর মানুষ

চাঁদপুরসহ অন্যান্য গন্তব্যে ছেড়ে যেতে থাকে একের পর এক লঞ্চ। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভিড় আরো বাড়তে থাকে। দুপুরের মধ্যেই প্রায় অর্ধশত লঞ্চ ছেড়ে যায় সদরঘাট থেকে। আগের দিন ছেড়ে যাওয়া লঞ্চগুলোও একে একে ফিরে আসতে থাকে ঘাটে। বিশেষ করে দক্ষিণাঞ্চলের দূরপাল্লার লঞ্চগুলোতে যাত্রী বোঝাই হতে শুরু করে দুপুর নাগাদ।

খাদেমুল ইসলাম স্ত্রী, সন্তানসহ মিরপুরের বাসা থেকে দুপুর ২টা নাগাদ ঘাটে এসে সুন্দরবন লঞ্চে উঠে বসেন। জানতে চাইলে বললেন, ‘আগেই শুনেছিলাম যে সিডিউল ভেঙে যেকোনো সময় লঞ্চ ছেড়ে দেওয়া হবে। তাই আগেভাগেই ঘাটে এসেছি। কিন্তু এখনই যে ভিড় দেখছি তাতে লঞ্চ ছাড়া পর্যন্ত যদি আরো লোক ওঠে তবে তো ভয়ের ব্যাপার। এমনিতেই আবহাওয়ার অবস্থা ভালো না।’

বরিশাল রুটের কীর্তনখোলা লঞ্চের যাত্রী কহিনুর আক্তার বললেন, ‘কেবিন বুকিং দিয়ে টিকিট কেটে রেখেছিলাম। তবু লঞ্চ থেকে বলা হয় আগেভাগে আসতে। তাই চলে এসেছি। মনে হচ্ছে আরো দুই-তিন ঘণ্টার আগে লঞ্চ ছাড়বে না। অথচ এখনই তো উপচেপড়া ভিড়।’

তিনি বলেন, ‘ডেকের যাত্রীরা কিছুই মানছে না। উঠছে তো উঠছেই। আর লঞ্চের লোকেরাও অতিরিক্ত আয়ের লোভে যত পারে লোক তুলছে। এতে তো ঝুঁকি বাড়ছে। প্রশাসনের এটা দেখা উচিত।’

বিআইডাব্লিউটিএর যুগ্ম পরিচালক ও ঢাকা নৌবন্দরের ট্রাফিক ইন চার্জ আলমগীর কবীর গতকাল রাতে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত সদরঘাট থেকে দূরপাল্লার বিভিন্ন রুটে ৯০টি লঞ্চ ছেড়ে গেছে। রাত ১০টা পর্যন্ত এই সংখ্যা ১৫০টি ছাড়িয়ে যাবে। গত কয়েক দিনের মধ্যে আজই (গতকাল) সবচেয়ে বেশি ভিড় হয়েছে। অফিস ও গার্মেন্ট বন্ধ হওয়ায় একসঙ্গে চাপ পড়েছে। আজও তা অব্যাহত থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।’

ঢাকা নৌবন্দর কর্মকর্তা ও বিআইডাব্লিউটিএর যুগ্ম পরিচালক এ কে এম আরিফ উদ্দিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এই দুই দিন কোনো সিডিউল থাকবে না। যাত্রী বোঝাই হলেই লঞ্চ ঘাট ছেড়ে যাবে। সাধারণত সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত সাড়ে ৯টা পর্যন্ত দূরপাল্লার বেশির ভাগ লঞ্চ ছাড়ার পূর্বনির্ধারিত সিডিউল থাকে। বিশেষ করে বরিশালগামী লঞ্চগুলো রাত সাড়ে ৮টা থেকে সাড়ে ৯টার মধ্যে ছেড়ে যায়। কিন্তু ঈদের বিশেষ সার্ভিসের সময় পূর্বনির্ধারিত ওই সিডিউল রক্ষা করা যায় না। কারণ অতিরিক্ত যাত্রী বোঝাই বন্ধে আমরা কোনো লঞ্চে ভিড় বেশি দেখলেই দ্রুত সেটিকে ঘাট ত্যাগে বাধ্য করি। এ ব্যাপারে যাত্রীদেরও সচেতন থাকা জরুরি।’


Share It
  • 2
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    2
    Shares

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here