দেশের সর্বশ্রেষ্ঠ কবি মাইকেল  অনাথ ও ভিক্ষুকদের সঙ্গে প্রাণত্যাগ কররেছিলেন

Share It
  • 4
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    4
    Shares

জেমস  আব্দুর রহিম রানা, যশোর : নিজের ‘এপিটাফ’ বা সমাধি লিপি তিনি নিজেই রচনা করে গিয়েছিলেন। মৃত্যুর পনেরো বছর পরে তাঁর সমাধিক্ষেত্রে সেই সমাধিলিপি উৎকীর্ণ করা হয়েছিল। তিনি মাইকেল মধুসূদন দত্ত, আধুনিক বাংলা সাহিত্যের পিতৃপুরুষ। ২৯ জুন, মধুসূদন দত্তর মৃত্যু দিন।
‘দাঁড়াও পথিক-বর
জন্ম যদি তব বঙ্গে ! এ সমাধি স্থলে
(জননীর কোলে শিশু লভয়ে যেমতি
বিরাম) মহীর পদে মহানিদ্রাবৃত
দত্ত কুলোদ্ভব কবি শ্রী মধুসূদন !
যশোরে সাগরদাঁড়ী কপোতাক্ষ তীরে
জন্মভূমি ; জন্মদাতা দত্ত মহামতি
রাজনারায়ন নামে, জননী জাহ্নবী !’
মাত্র ৪৯ বছরের জীবনের শেষ প্রান্তে, চরম অনাদর, অবহেলা, নিঃসঙ্গতা পেয়েছিলেন বঙ্গজননীর এই শ্রেষ্ঠ সন্তান। উনিশ শতকের নবজাগৃতির গর্ব করা বাঙালীর সেই কলঙ্ক দূর হবার নয়। মধুসূদনের জীবনীকার যোগীন্দ্রনাথ বসু তাঁর ‘মাইকেল মধুসূদন দত্তের জীবন চরিত’ গ্রন্থে লিখেছিলেন ‘তাঁহারা যদি, কোনরূপে মধুসূদনের দাতব্য চিকিৎসালয়ে মৃত্যু নিবারণ করিতে সক্ষম হইতেন, তাহা হইলে বঙ্গসমাজ একটি গুরুতর লজ্জা হইতে রক্ষা পাইত। বঙ্গদেশের আধুনিক সময়ের সর্বশ্রেষ্ঠ কবি যে অনাথ ও ভিক্ষুকদিগের সঙ্গে প্রাণত্যাগ করিয়াছেন, পরে কবির স্বর্ণময় প্রতিমূর্তি স্থাপন করিলেও এ কলঙ্ক মোচন হইবে না’।
সম্পন্ন পিতার সন্তান হয়েও আর্থিক অনটন কখনোই মধুসূদনের সঙ্গ ছাড়েনি। ১৮৪৩ সালে রেভারেন্ড কৃষ্ণমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়ের নিকট মধুসূদন খ্রিস্টধর্ম গ্রহণের ইচ্ছা ব্যক্ত করেন। এরপর ওই বছরই ১৩ ফেব্রুয়ারি মিশন রো-তে অবস্থিত ওল্ড মিশন চার্চ নামে এক অ্যাংলিক্যান চার্চে গিয়ে তিনি খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করেন। তাঁকে দীক্ষিত করেছিলেন পাদ্রী ডিলট্রি। তিনিই তাঁর ‘মাইকেল’ নামকরণ করেন। মধুসূদন পরিচিত হন ‘মাইকেল মধুসূদন দত্ত’ নামে। তাঁর এই ধর্মান্তর সমাজে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। রাজনারায়ণ দত্ত তাঁর ‘বিধর্মী’ পুত্রকে ত্যাজ্যপুত্র ঘোষণা করেন। রাজনারায়ণ দত্ত তাঁকে পরিত্যাগ করলেও, বিশপস কলেজে পড়াশোনার ব্যয়ভার বহন করছিলেন। চার বছর পর তিনি টাকা পাঠানো বন্ধ করেন। বিশপস কলেজে কয়েকজন মাদ্রাজি ছাত্রের সঙ্গে মধুসূদনের বন্ধুত্ব হয়েছিল। বিশপস কলেজে অধ্যয়ন শেষ করে যখন কলকাতায় চাকরির চেষ্টা করে ব্যর্থ হন মধুসূদন।
তখন তাঁর সেই মাদ্রাজি বন্ধুদের সঙ্গে ভাগ্যান্বেষণে মাদ্রাজে (অধুনা চেন্নাই) চলে যান মধুসূদন। মধুসূদন মাদ্রাজেও বিশেষ সুবিধা করে উঠতে পারেন নি। স্থানীয় খ্রিস্টান ও ইংরেজদের সহায়তায় তিনি একটি স্কুলে ইংরেজী শিক্ষকের চাকরি পান। তবে বেতন যা পেতেন, তাতে তাঁর ব্যয়সংকুলান হতো না। এই সময় তাই তিনি ইংরেজী পত্রপত্রিকায় লিখতে শুরু করেন। পঁচিশ বছর বয়সে নিদারুণ দারিদ্র্যের মধ্যেই তিনি দ্য ক্যাপটিভ লেডি তাঁর প্রথম কাব্যটির রচনা করেন। কবি ও দক্ষ ইংরেজী লেখক হিসেবে তাঁর সুনাম ছড়িয়ে পড়ে।
মাদ্রাজে আসার কিছুকাল পরেই মধুসূদন রেবেকা ম্যাকটিভিস নামে এক ইংরেজ যুবতীকে বিবাহ করেন। উভয়ের দাম্পত্যজীবন আট বছর স্থায়ী হয়েছিল। রেবেকার গর্ভে মধুসূদনের দুই পুত্র ও দুই কন্যার জন্ম হয়। মাদ্রাজ জীবনের শেষ পর্বে রেবেকার সঙ্গে বিবাহ বিচ্ছেদ হওয়ার অল্পকাল পরে মধুসূদন এমিলিয়া আঁরিয়তো সোফিয়া নামে এক ফরাসী তরুণীকে বিবাহ করেন। আঁরিয়াতো মধুসূদনের সারাজীবনের সঙ্গিনী ছিলেন। ১৮৫৬ সালে মধুসূদন কলকাতায় ফিরে আসেন। মধুসূদনের শেষ জীবন চরম দুঃখ ও দারিদ্র্যের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হয়। তাছাড়া অমিতব্যয়ী স্বভাবের জন্য তিনি ঋণগ্রস্তও হয়ে পড়েন। ১৮৪৮ থেকে ১৮৫৫ দীর্ঘ আট বছর মাদ্রাজ অবস্থানকালে তাঁর পৈত্রিক বাসভনটিও বেদখল হয়ে গিয়েছিল। পিতা-মাতার মৃত্যু সংবাদও তাঁকে জানানো হয়নি। ১৮৫৬তে কলকাতা ফিরে এসে সামান্য পুলিশ কোর্টে কেরানির চাকরিগ্রহণ করেন পেটের দায়ে। ১৮৫৮ থেকে ১৮৬২ এই পাঁচ বছরেই মধুসূদনের যাবতীয় সাহিত্যরচনা।
১৮৬২ সালের ৯ জুন পৈত্রিক সম্পত্তি জনৈক ব্যক্তিকে পত্তনি দিয়ে হেনরিয়েটাকে কলকাতায় রেখে অনটনকে সঙ্গী করেই ইংল্যান্ডে রওনা দিলেন মধুসূদন। পত্তনি দেয়ার শর্ত ছিল যে ওই পত্তনিদার মাসে মাসে হেনরিয়েটাকে সংসার খরচের অর্থদেবেন। কিন্তু মধুসূদন প্রতারিত হন। দুমাস টাকা দেয়ার পর ওই ব্যক্তি অর্থ দেয়া বন্ধ করে দেন। হেনরিয়েটা বাধ্য হয়ে লন্ডনে মধুসূদনের কাছে চলে গেলেন। মধুসূদনের আর্থিক অনটন অসহনীয় হয়ে গেল। ওই সময় বিদ্যাসাগর মহাশয়ের আর্থিক সাহায্য না পেলে হয়তো তাঁকে কারান্তরালে থাকতে হতো। ১৮৬৭তে ব্যারিস্টারি পাস করে কলকাতায় ফিরে এলেন ও কলকাতা হাইকোর্টে প্র্যাকটিশ করার অনুমতি পেলেন। কিন্তু সফল হলেন না ওকালতি ব্যবসায়ে। ‘মেঘনাদ বধ’ মহাকাব্যের স্রষ্টা ওকালতির কূট-কচালিতে পারদর্শী হবেন কি করে? ব্যারিস্টারি করে অর্থ রোজগারের রাস্তা খুললো না। ওকালতি ছেড়ে দিলেন।
১৮৭২ সালের সেপ্টেম্বর মাস থেকে মধুসূদন গুরুতর অসুস্থ হয়ে শয্যাশায়ী হয়ে পড়েন।
মধুসূদন তখন হিন্দু সমাজে পরিত্যক্ত, খ্রিস্টানরাও আপনজন মনে করতেন না তাঁকে। কারণ তিনি কোন গির্জায় যেতেন না। ‘মেঘনাদ বধ’ মহাকাব্য প্রণেতা তখন ইন্টালির কলকাতার বেনেপুকুরে এক অপরিসর গৃহকোণে মলিন শয্যায় চিকিৎসা, পথ্যহীন শায়িত। হেনরিয়েটাও অসুখে চিকিৎসাহীন শয্যাশায়ী। চিকিৎসা দূরের কথা, দুবেলা অন্নের জোগাড়ও অনিশ্চিত। কোন সঞ্চয় নেই, কোন রোজগার নেই। শুভানুধ্যায়ী দু’একজনের সামান্য অর্থ সাহায্যে কতটুকু জীবনযুদ্ধ করা যায়! এইসময় উত্তরপাড়ার জমিদার জয়কৃষ্ণ মুখোপাধ্যায় দয়াপরবশ হয়ে মধুসূদনকে স্ত্রী, দুই সন্তানসহ উত্তরপাড়া লাইব্রেরিতে নিয়ে আসেন। গঙ্গাতীরে লাইব্রেরি গৃহে নির্বান্ধব মধুসূদন গুরুতর ব্যাধি আক্রান্ত হয়ে শায়িত। হেনরিয়েটাও গুরুতর পীড়ায় আক্রান্ত, শয্যাশায়িনী। বাল্যবন্ধু গৌরদাস বসাক একদিন উত্তর পাড়ায় মধুসূদনকে দেখতে এসেছিলেন। গৌরদাস তাঁর স্মৃতিকথায় লিখেছেন ‘আমি সেই হৃদয় বিদারক দৃশ্যের কথা কোনদিন ভুলবো না। দেখলাম, বিছানায় শায়িত মধু রক্তবমি করছেন আর মেঝেতে শুয়ে হেনরিয়েটা রোগ যন্ত্রণায় ছটফট করছেন। তাঁর সন্তান দুটি খিদের জ্বালায় পচা পান্তাভাত খেয়ে ঘরের এক কোণে শুয়ে আছে। আর তাদের ভুক্তাবশেষ সেই পান্তা ভাতের ওপরে শত শত মাছি পড়েছে। আমি হেনরিয়েটার কাছে গেলাম, তিনি তাঁর স্বামীর দিকে আঙ্গুলি নির্দেশ করে অস্ফুট শব্দে বললেন, আমাকে নয় ওঁকে দেখুন’। গৌরদাসকে দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন মধুসূদন।
গৌর দাস বাবুরা মধুসূদনকে আলিপুর জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করে দিলেন। ১৮৭৩ খ্রিস্টাব্দের ২৯ জুন সেখানে কপর্দকহীন (অর্থাভাবে) অবস্থায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর শয্যাপার্শে হাসপাতালের নার্স এবং দু’একজন ওয়ার্ডবয় ছাড়া আর কেউ উপস্থিত ছিল না। এর পরের ঘটনা আরও মর্মবিদারি। মধুসূদনের মরদেহকে কপর্দকহীন খ্রিস্টানের মৃতদেহের মতো লোয়ার সার্কুলার রোডের কবরখানায় সমাধিস্থ করা হয় ২৪ ঘণ্টা মৃতদেহ ফেলে রাখার পর।
১৮২৪ সালের ২৫ জানুয়ারি বাংলা প্রেসিডেন্সির যশোর জেলার কেশবপুরের সাগরদাঁড়ি গ্রামে মধুসূদন দত্তের জন্ম হয়।তিনি ছিলেন রাজনারায়ণ দত্ত ও তাঁর প্রথমা পত্নী জাহ্নবী দেবীর একমাত্র সন্তান।

Share It
  • 4
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    4
    Shares

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here