নোয়াখালীতে বেদখল ৩০ কিল্লা উদ্ধারের উদ্যোগ নেই কারো

Share It
  • 2
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    2
    Shares

১৯৭০ সালে ঘূর্ণিঝড় ‘গোর্কির’ আঘাতে নোয়াখালীতে প্রাণ হারায় অন্তত ৫০ হাজার মানুষ। গৃহপালিত পশু মারা যায় লক্ষাধিক। এ ঝড়ের তাণ্ডবে সর্বস্বান্ত হয়েছিল দেশের উপকূলবাসী। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর এ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে প্রাকৃতিক দুর্যোগে প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে পদক্ষেপ নেয় বঙ্গবন্ধুর সরকার। ১৯৭২ সালে অন্য উপকূলীয় জেলার মতো নোয়াখালীতেও আশ্রয়কেন্দ্রের পাশাপাশি নির্মাণ করা হয় ৩৩টি উঁচু মাটির কিল্লা। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে নির্মাণ হয়েছিল বলে স্থানীয়রা কিল্লাগুলোর নাম দেন ‘মুজিব কিল্লা’।

দ্বীপ উপজেলা হাতিয়া ও সুবর্ণচরে নির্মাণ শেষে এসব কিল্লার দেখভাল ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব দেয়া হয় বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটিকে। তবে অভিযোগ রয়েছে, প্রতিষ্ঠানটি এ দায়িত্ব পালনে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। ৩৩টি কিল্লার মধ্যে তিনটি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। বাকি ৩০টি চলে গেছে স্থানীয় প্রভাবশালীদের দখলে।

রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি নোয়াখালী জেলা ইউনিটের তথ্য অনুযায়ী, প্রাকৃতিক দুর্যোগকালীন আশ্রয়স্থল হিসেবে সাইক্লোন শেল্টারের পাশাপাশি মানুষ ও গবাদি পশুর জন্য এসব মাটির কিল্লা নির্মাণ করা হয়। এর মধ্যে হাতিয়ায় ১৮টি ও সুবর্ণচরে নির্মাণ করা হয় ১৫টি কিল্লা। এগুলো মাটি থেকে ৪৫-৫০ ফুট উঁচু। প্রতিটি কিল্লার অনুকূলে পাঁচ একর জমি বরাদ্দ হয়। একটি কিল্লা নির্মাণের জন্য কাটা হয় দুটি পুকুর। কিছু ব্যক্তি মালিকানাধীন জমি বাদে বেশির ভাগ কিল্লার জমিই সরকারি। আর ব্যক্তি মালিকানাধীন জমির মালিকরা কিল্লার জন্য জমিগুলো সরকারকে দান করেন বলে জানা যায়।

অভিযোগ রয়েছে, টিকে থাকা কিল্লাগুলো দখলমুক্ত করতে তেমন কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করেনি রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি। দীর্ঘদিনেও জমিদাতাদের কাছ থেকে দলিল বুঝে নেয়া হয়নি। ফলে রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে কিল্লাগুলোর প্রকৃত আকার নষ্ট হয়ে গেছে। দখলদাররা ইচ্ছামতো মাটি কেটে আকার পরিবর্তন করে গড়ে তুলেছে বিভিন্ন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে রয়েছে মাছের ঘের, মুরগি ও গরুর খামার। স্থানীয়রা জানান, এখনই কিল্লাগুলো দখলমুক্ত করতে না পারলে আগামীতে এসবের অস্তিত্ব থাকবে না। ফলে যে উদ্দেশ্যে এগুলো তৈরি করা হয়েছিল, তা ব্যর্থ হবে।

সরেজমিন দেখা যায়, সুবর্ণচর উপজেলার ৮নং মোহাম্মদপুর ইউনিয়নের চর আলাউদ্দিন গ্রামের কিল্লাটিতে আড়াআড়িভাবে বাঁধ দিয়ে বাণিজ্যিকভাবে মাছের ঘের করা হয়েছে। কেটে ফেলা হয়েছে অসংখ্য গাছ। স্থানীয় খালেকুজ্জামান, জামাল ব্যাপারী ও মিয়া মাঝি যৌথভাবে কিল্লাটি দখল করে রেখেছেন বলে জানা গেছে।

একই অবস্থা সুবর্ণচর উপজেলা পরিষদসংলগ্ন মাইজদী-চেয়ারম্যান ঘাট সড়কের পাশে ৬নং চর আমান উল্যাহ্ ইউনিয়নের কাটাবুনিয়া গ্রামের কিল্লাটিরও। এ কিল্লার আকার পরিবর্তন করে বাণিজ্যিকভাবে মুরগি, মাছ ও গরুর খামার গড়ে তোলা হয়েছে। দখল পাকাপোক্ত করতে কিল্লার তিন পাশে তোলা হয়েছে সীমানা প্রাচীর। জানা গেছে, উপজেলা বিএনপির অর্থবিষয়ক সম্পাদক আবুল কাশেম এ খামার গড়ে তুলেছেন।

এদিকে উপজেলার ২নং চরবাটা ইউনিয়নের শিবচরণ এলাকার একটি কিল্লা দখল করেছেন সাবেক ইউপি সদস্য গৌরাঙ্গ চন্দ্র দাস। শুধু এ তিনটিই নয় উপজেলার ১৫টি কিল্লারও একই অবস্থা। এদিকে প্রভাবশালীদের দখলে রয়েছে হাতিয়ার টিকে থাকা ১৫টি কিল্লা।

দখলের বিষয়ে কথা হলে সুবর্ণচরের আবুল কাশেম বলেন, তিনি কিল্লাটি তার চাচা নুরুল হক মিয়ার কাছ থেকে কিনেছেন। তার চাচা কিনেছেন ভারতে চলে যাওয়া হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের কাছ থেকে। মূল মালিকদের কাছ থেকে কিনে তার চাচা নুরুল হক মিয়া এখানে বনায়ন করেন। পরে তিনি মাছ, মুরগি ও গরুর খামার গড়ে তুলেছেন।

অন্যদিকে শিবচরণের গৌরাঙ্গ চন্দ্র দাস বলেন, কিল্লার জায়গার মালিকরা তার আত্মীয়। সরকার তাদের কাছ থেকে মৌখিক অনুমতি নিয়ে কিল্লা নির্মাণ করে। ওই জমির দাম প্রদান করার কথা থাকলেও তা দেয়া হয়নি। রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটিও তাদের কাছ থেকে জমির দলিল বুঝে নেয়নি। ফলে বর্তমানে এ জমি তার তত্ত্বাবধানে রয়েছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির একাধিক স্বেচ্ছাসেবক জানান, জেলায় সোসাইটির ইউনিট কমিটিতে সব দলেরই প্রভাবশালী নেতারা রয়েছেন; যা কিল্লাগুলো দখলমুক্ত করতে না পারার বড় কারণ।

এদিকে সবগুলো কিল্লা বেদখল হওয়ার কথা স্বীকার করেছেন বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির কেন্দ্রীয় পরিচালনা পর্ষদের সদস্য ও নোয়াখালী ইউনিটের সেক্রেটারি অ্যাডভোকেট শিহাব উদ্দিন শাহিন। শিহাব উদ্দিন বণিক বার্তাকে বলেন, সারা দেশে বেদখলকৃত কিল্লা পুনরুদ্ধার কমিটির প্রধান তিনি নিজেই। এরই মধ্যে জেলার বেদখলকৃত কিল্লাগুলো উদ্ধারে স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে একাধিকবার বৈঠক করেছেন। কিন্তু প্রশাসনের সহযোগিতা না পাওয়ায় এ বিষয়ে বিলম্ব হচ্ছে।

এ বিষয়ে কথা হলে নোয়াখালীর জেলা প্রশাসক তন্ময় দাস বলেন, তিনি এ জেলায় নতুন যোগদান করেছেন। কিল্লা বেদখল হওয়া নিয়ে এখনো তিনি বিস্তারিত জানেন না। তবে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় খোঁজখবর নিয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া হবে।


Share It
  • 2
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    2
    Shares

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here