পোশাকখাতে উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারের তাগিদ সিপিডির

Share It
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

রফতানির লক্ষ্যমাত্রা পূরণে পোশাকখাতে উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারের তাগিদ দেয়া হয়েছে। সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ সিপিডির তথ্যমতে, ২১ শতাংশ কারখানায় উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার হচ্ছে। এই শিল্পে বছরে নারী এবং পুরুষ শ্রমিকদের মধ্যে মজুরি বৈষম্য কমলেও বেতন পার্থক্য উদ্বেগজনক। এছাড়া ৯৭ দশমিত ৫ ভাগ কারখানায় কোন ট্রেড ইউনিয়ন নেই। রানা প্লাজা দুর্ঘটনার পর দেশে গড়ে উঠা অতিরিক্ত ১৯ শতাংশ কারখানা এখনও ভাড়া বাড়িতে পরিচালিত হচ্ছে।

বৃহস্পতিবার রাজধানীর গুলশানের একটি হোটেলে ‘পোশাক খাতে রানা প্লাজা পরবর্তী পরিবর্তন’ শীর্ষক সেমিনারে এসব তথ্য প্রকাশ করে সিপিডি। দিনব্যাপি এ সংলাপে তৈরি পোশাক শিল্পের উদ্যোক্তা, ক্রেতা প্রতিষ্ঠান ও শ্রমিক নেতারা বক্তব্য রাখেন। সকালে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সিপিডির চেয়ারম্যান অধ্যাপক রেহমান সোবহানের সঞ্চালনায় বস্ত্র সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি সাবের হোসেন চৌধুরী, এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি সফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন প্রমুখ বক্তব্য রাখেন।

সিপিডির মতে, রানা প্লাজা পরবর্তী সময়ে পোশাক শিল্পের কর্মপরিবেশের উন্নতির জন্য গৃহীত কার্যক্রমের অগ্রগতি এখনো সন্তোষজনক নয়। বেশিরভাগ উদ্যোগ শুধু কর্মস্থলের নিরাপত্তাকেন্দ্রিক। ২১ শতাংশ কারখানায় উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার হচ্ছে। খুবই নিম্ন মানের প্রযুক্তির ব্যবহার হচ্ছে ১৬ শতাংশ প্রতিষ্ঠানে। এছাড়া, গার্মেন্টস কারখানাগুলোর মালিকানা পরিবার ভিত্তিক, যেখানে ৬৫ শতাংশ গার্মেন্টসই দ্বিতীয় প্রজন্ম দ্বারা পরিচালিত। এসব প্রতিষ্ঠানে নেই কোনো স্বাধীন পরিচালক। ভিশন-২১ সামনে রেখে রফতানির লক্ষ্যমাত্রা পূরণে করতে হলে পোশাকখাতে উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহারসহ নিরাপদ কর্মস্থল তৈরি এবং শ্রম অধিকার রক্ষার মতো চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার তাগিদ দিয়েছে।

সিপিডির সম্মানীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের সঞ্চালনায় গার্মেন্টস সেক্টরের মালিকানা, ব্যবস্থাপনা ও প্রযুক্তি বিষয়ক এই প্রবন্ধ তুলে ধরেন সিপিডির সহযোগী গবেষক অবীর খন্দকার।

মালিকানা, ব্যবস্থাপনা ও প্রযুক্তি শীর্ষক এই প্রবন্ধে কারখানার অভ্যন্তরের বিভিন্ন চিত্র তুলে ধরা হয়। সিপিডির গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের পোশাক কারখানাগুলোয় পারিবারিক প্রাধান্য রয়েছে। কারখানাগুলোর অধিকাংশই দ্বিতীয় প্রজন্ম দ্বারা পরিচালিত। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এসেছে তৃতীয় প্রজন্মও।

সিপিডির গবেষণা বলছে, ৬৫ শতাংশ গার্মেন্টস দ্বিতীয় প্রজন্ম দ্বারা পরিচালিত। ৮৮ শতাংশ প্রতিষ্ঠানের ৩ জন পরিচালকের মধ্যে দু’জনই একই পরিবারের। সেসব প্রতিষ্ঠানে কোনো স্বাধীন পরিচালক নেই। একই সঙ্গে ৫৩ শতাংশ প্রতিষ্ঠান একই গ্রুপের ভিন্ন কোনো প্রতিষ্ঠানকে ভর্তুকি দিচ্ছে। রানা প্লাজা দুর্ঘটনার পর দেশে ১৯ শতাংশ কারখানা গড়ে উঠেছে। তবে আশঙ্কার বিষয়, এর বড় অংশটিই ভাড়া বাড়িতে পরিচালিত হচ্ছে।

গবেষণায় কারিগরি উন্নয়নের ক্ষেত্রে দেখা গেছে, ছোট প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে ৪ শতাংশে উন্নত প্রযুক্তি এবং ৩৮ শতাংশে মধ্যম ও বৃহৎ পরিসরে প্রযুক্তির ব্যবহার হয়। এছাড়াও, বিকেএমইএ’র চেয়ে বিজিএমইএ’র প্রতিষ্ঠানগুলোর দক্ষতা ৩ দশমিক ১ শতাংশ বেশি। ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, পোশাক কারখানাগুলোর উন্নয়নে প্রযুক্তির অভিমুখী অবশ্যাম্ভাবী। এ উন্নয়নের লক্ষ্যে কর্মকৌশল ও ব্যবস্থাপনা হতে হবে শ্রমিকদের স্বার্থে। সামগ্রিকভাবে যে নীতি কাঠামো আছে এবং সরকারের পক্ষ থেকে যেসব প্রণোদনা দেয়া হয় সেগুলোকে পুনর্বিবেচনা করা দরকার। যে উত্তরণ আমরা চাচ্ছি, সেই রূপান্তরের সঙ্গে এই নীতিগুলো সামঞ্জস্যপূর্ণ কি-না সেগুলো আরেকটু ভালো করে বিবেচনা করতে হবে।

অনুষ্ঠানে অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেন, রানা প্লাজার ধসের পর তৈরি পোশাক শিল্পে কর্মপরিবেশের পাশাপাশি এ খাতে আধুনিয়কায়ন শুরু হয়েছে। এর ফলে দেশের প্রধান রফতানি খাতের যে সব চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতো তার পূর্ব প্রস্তুতি হিসাবে কাজে লেগেছে। তবে এগুলো যথেষ্ট নয়। বৈশি^ক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হলে তৈরি পোশাক শিল্প সম্পর্কিত আধুনিকায়নের কাজ করতে হবে।

সাবের হোসেন চৌধুরী বলেন, ১০ বছর আগেও তৈরি পোশাক শিল্প বৈদেশিক বাণিজ্যের ৭৫ শতাংশ আসতো তৈরি পোশাক শিল্প থেকে। এখন তা দাঁড়িয়েছে ৮৫ শতাংশ। এ খাতে এখন মানুষ কর্মরত আছে প্রায় ৫০ লাখ। দেশে মোট রফতানি ৩৪ বিলিয়ন। ২০২১ সাল নাগাদ ৫০ বিলিয়ন করতে হলে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করতে হবে। আর এজন্য শ্রমিকের দক্ষতা ও উচ্চ প্রযুক্তির মেশিন পত্র সংযোহন করতে হবে।

এসময় এফবিসিসিআই সভাপতি বলেন, তৈরি পোশাক শিল্পের বড় ধরনের দুঘটনা রানা প্লাজার ধস। এ দুর্ঘটনায় অনেক হতাহত হয়েছে। তারপরও এ দুর্ঘটনা আমাদের অনেক কিছু শিক্ষা দিয়েছে। আমরা সামনের দিকে মালিক-শ্রমিক মিলে মাথা আরও উঁচু করে দাঁড়াতে চাই। একইসঙ্গে সরকারের ভিশন ২০২১ ও ২০৪১ বাস্তবায়নে বড় ধরনের ভূমিকায় থাকতে চাই।

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, পোশাক রফতানি বহুমুখীকরণের অগ্রগতি খুবই সীমিত। তবে একেবারেই যে নেই, তা নয়। বড় কারখানাগুলোর ক্ষেত্রে কিছুটা হলেও ছোট কারখানার ক্ষেত্রে তা একেবারেই কম। তবে পোশাক রফতানিতে গড় লিড টাইম (পণ্য পরিবহণের বেঁধে দেয়া সময় বা নির্দিষ্ট সময়কাল) কমেছে।

জাহিদ হোসেন আরও বলেন, প্রযুক্তির উন্নয়নের ক্ষেত্রে কারখানার আয়তন ও স্থান সম্পৃক্ত। সব কারখানায় প্রযুক্তির উন্নয়ন ঘটছে না। কারখানায় ব্যবস্থাপনা পরিচালনার ক্ষেত্রে খুব একটা উন্নয়ন হচ্ছে না। প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় আমাদের উৎপাদনশীলতা এখনও খুবই নিম্ন।

বিজিএমইএ’র সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট ফারুক হাসান বলেন, অনেক গার্মেন্টস পাবলিক লিমিটেড কোম্পানিতে গেছে। মালিকানায় পরিবর্তন আসছে। শুধু দ্বিতীয় প্রজন্ম নয়, কোনো কোনো কোম্পানিতে তৃতীয় প্রজন্মও এসেছে। করপোরেট ম্যানেজমেন্ট শুরু হয়েছে। দিনে দিনে পরিবর্তন আসছে। ভবিষ্যতে মূলধনের জন্য আমাদেরকে শেয়ার মার্কেটেও যেতে হবে। এছাড়াও পোশাক রফতানি বাড়লেও বাইরে থেকে জনবল আমদানি কমেছে। আমরা চাই, ভবিষ্যতে যেন টপ ম্যানেজমেন্টের কর্মী দেশেই গড়ে উঠে।

শ্রমিক নেতা মন্টু চন্দ্র ঘোষ বলেন, কারখানার ভবন ও বৈদ্যুতিক ক্ষেত্রে উন্নতি হলেও শ্রমিকদের উপর আর্থিক, মানকি ও শারীরিক চাপ তৈরি হচ্ছে। রানা প্লাজা ধস ও নতুন মজুরি বোর্ড কার্যকর হওয়ার ফলে একদিকে জীবনের ধারণের প্রয়োজন বেড়েছে, ব্যয় বেড়েছে কিন্তু সে অনুপাতে আয় বাড়েনি।

তৈরি পোশাক উদ্যোক্তা ড. রুবানা হক বলেন, তৈরি পোশাক শিল্পের শ্রমিকদের জীবন মান মজুরি দেয়া যাচ্ছে না-এটা ঠিক। কিন্তু আমরাও ক্রেতারাদের কাছে থেকে সঠিক দাম পাচ্ছি না। তারপরও শ্রমিকদের কল্যানের কথা চিন্তা করতে হবে। সংলাপের শেষ পর্ব অনুষ্ঠিত হয় সিপিডির সম্মানীয় ফেলো ড. মুস্তাফিজুর রহমানের সঞ্চালনায়। এ পর্বে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ড. খোন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম। ড. মোয়াজ্জেম তার প্রবন্ধে বলেন, তৈরি পোশাক শিল্পের শ্রমিকরা যে মজুরি পান তা দিয়ে শ্রমিকের পুরো মাসের অর্ধেক ব্যয় নির্বাহ হয়। বাকী মাসের ব্যয় মেটানোর জন্য পরিবারের অন্যের উপর নির্ভর করতে হয়। এ কারণে শ্রমিককে একটা বড় সময় ব্যয় করতে হয় উৎপাদন বর্হিভুত এ সবের জন্য চিন্তা করে।


Share It
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here