আজ ২৪ অক্টোবর। মহান মুক্তিযুদ্ধে গাইবান্ধার সাঘাটা-ফুলছড়ি এলাকার এক স্মরণীয় দিন। ১৯৭১ সালের এই দিনে সাঘাটা উপজেলার প্রাণ কেন্দ্র বোনারপাড়ার অদূরে ত্রিমোহনী ঘাটে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সঙ্গে ৬ ঘন্টাব্যাপী সম্মুখযুদ্ধে শহীদ হন ১২ মুক্তিযোদ্ধা। একই সময় ২৭ পাক সেনাকে হত্যার মধ্য দিয়ে যুদ্ধের পরিসমাপ্তি ঘটে।

দিনটি উপলক্ষে আজ দিনব্যাপী স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা সংসদ বিভিন্ন কর্মসূচির আয়োজন করা হয়েছে। স্মরণ সভায় জেলা প্রশাসক মো. আবদুল মতিন, ইউএনও মো. মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর, মুক্তিযোদ্ধা সংসদ গাইবান্ধা জেলার সাবেক ডেপুটি কমান্ডার ও যুদ্ধকালীন কমান্ডার আলহাজ্ব সামছুল হকসহ অন্যান্য মুক্তিযোদ্ধা, সাংবাদিক ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা উপস্থিত থাকবেন।

’৭১ এর ওই দিন স্থানীয়দের উদ্যোগে মুক্তিযোদ্ধাদের সমাহিত করা হয় দলদলিয়া গ্রামে। শহীদদের গণকবর ও স্মৃতিস্তম্ভটি সারাবছরেই অযত্ন ও অবহেলায় পড়ে থাকলেও স্থানীয় জনসাধারণের কাছে শুধুই স্মৃতি। চারদিকে ধান ক্ষেত মাঝখানে ৬ মুক্তিযোদ্ধা কবর। এখান থেকে একটু দূরেই আরও ৬ মুক্তিযোদ্ধা ঘুমিয়ে চিরনিদ্রায় শায়িত রয়েছেন ফুলছড়ির শহিদুল্লাহ, হাবিবুর রহমান, সাঘাটার আনছার আলী, আ. হাই, লালমনিরহাটের হাতিবান্ধার আহস্মদ আলী, প্রভাত চন্দ্র, ভরত চন্দ্র, বোঁচারাম দাস, ধনঞ্জয়, গাইবান্ধা সদরের হামিদুল হক মধু, পাবনার আ. হাই এবং হাবিবুর রহমান।

মুক্তিযোদ্ধারা জানান, স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় গাইবান্ধার ভরতখালী-বোনারপাড়ার পার্শ্ববতী পদুমশহরে অস্ত্র ও গোলাবারুদ বহনকারী রেল ওয়াগনে হামলা, সিংড়িয়া রেল ব্রিজ পাহারায় নিয়োজিত ১২ রাজাকারকে হত্যা, ভরতখালী-গাইবান্ধা সড়কে পাক সেনা কনভয়ের ওপর হামলা এবং বাদিয়াখালী ব্রিজ ধ্বংসের সফল অভিযান পরিচালনা করে ১১নং সেক্টরাধীন রোস্তম আলী খন্দকার কোম্পানির মুক্তিযোদ্ধারা। পরে বোনারপাড়া পাক সেনাশিবির আক্রমণের সিদ্ধান্ত নেন এবং ফুলছড়ির গলনা থেকে ২২ অক্টোবর গভীর রাতে বোনারপাড়ার ত্রিমোহনী ঘাট এলাকার কয়েকটি বাড়িতে আশ্রয় নেন।

২৪ অক্টোবর সূর্যোদয়ের আগেই পাক সেনাদের একটি বিশাল বাহিনী ত্রিমোহনী ঘাট এলাকা চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে। শুরু হয় সস্মুখযুদ্ধ। সকাল থেকে শুরু হয়ে ৬ ঘন্টাব্যাপী যুদ্ধে শহীদ হন ১২ মুক্তিযোদ্ধা। মুক্তিযোদ্ধারাও ২৭ পাক সেনাকে হত্যা করার মধ্য দিয়ে যুদ্ধের পরিসমাপ্তি ঘটে। ওই দিন বিকেলে স্থানীয় লোকজন যুদ্ধক্ষেত্রে বিচ্ছিন্নভাবে পড়ে থাকা ১২ শহীদ মুক্তিযোদ্ধার লাশ উদ্ধার করে পার্শ্ববতী দলদলিয়া গ্রামের দু’টি স্থানে সমাহিত করে। ২০০১ সালে স্থানীয় উদ্যোগে এখানে নির্মিত হয়েছে একটি স্মৃতিস্তম্ভ। দীর্ঘদিন অযত্ন ও অবহেলায় থাকায় সেটি এখন সংষ্কার করা হচ্ছে।

শহীদ ধনঞ্জয় বিশ্বাসের ছোট ভাই দলদলিয়া গ্রামের বাসিন্দা নির্মল চন্দ্র বিশ্বাস জানান, ২৪ অক্টোবর আসলেই শুধু পরিস্কার ও ধোয়া-মোছা করা হয়। ওই দিন পেরিয়ে গেলেও সারাবাছর ময়লা-আর্বজনা দিয়ে ঢেকে থাকে শহীদদের গণকবর। একই গ্রামের বাসিন্দারা জানান, সরকারি ভাবে এই মুক্তিযোদ্ধাদের কবরগুলো সংরক্ষণ করা প্রয়োজন। এখানে অনেক অফিসার কবর দেখবার আসে, কিন্ত পরে আর কোন খোঁজ নেয় না।

স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা জানান, এখানে শহীদ ১২ মুক্তিযোদ্ধাকে সমাহিত করা হয়েছে। কারা শহীদ হয়েছেন তাদের নাম ঠিকানা সংম্বলিত কোন সাইন বোর্ড কিংবা তালিকা নেই এখানে।

মুক্তিযোদ্ধা গৌতম চন্দ্র মোদক জানান, স্মৃতি স্তম্ভটির ইতিমধ্যে সংস্কার করা হয়েছে। এখানে শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের স্মরণে একটি মুক্তিযোদ্ধা যাদুঘর নির্মাণের বরাদ্দ হয়েছে। দিনটি উপলক্ষে আজ দিনব্যাপী স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা সংসদ বিভিন্ন কর্মসূচির আয়োজন করা হয়েছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here