বীর মুক্তিযোদ্ধা ও পোশাক শিল্পের পথিকৃৎ

Share It
  • 15
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    15
    Shares

মোহাম্মদ নুরুল কাদের খান। একাত্তরে ছিলেন পাবনার ডিসি। মার্চের শুরুতে বুলবুল কলেজে সামরিক প্রশিক্ষণের পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে তার মুক্তিযুদ্ধের শুরু। ২৫ মার্চের পর অস্ত্রাগার খুলে দিলেন। অবসরপ্রাপ্ত ও ছুটিতে থাকা সৈনিক, ইপিআর ও পুলিশের হাতে ধরিয়ে দিলেন সেই অস্ত্র। স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী, ছাত্রলীগের মতো তরুণরাও যুক্ত হলো যুদ্ধে। ১০ এপ্রিল পর্যন্ত পাবনায় ১৭টি খণ্ডযুদ্ধের অধিকাংশের নেতৃত্ব দিলেন পাকিস্তান বিমানবাহিনীর সাবেক জিডি পাইলট নুরুল কাদের। মুক্ত পাবনায় প্রতিষ্ঠা করলেন সরকারের আদলে সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ। এমএনএ আমজাদ হোসেন ও এমপিএ আব্দুর রব বগা ভাই হলেন এর সদস্য। বাংলাদেশে সরকার গঠনেরও আগে ‘বাংলাদেশ সরকার’ রাবার স্ট্যাম্প ব্যবহার করে সরকারি নির্দেশনা জারি করলেন পাবনায়। আনুষ্ঠানিকভাবে অসহযোগ আন্দোলন প্রত্যাহার করলেন মুক্ত পাবনায়। রেশন দোকান, পোস্ট অফিস, টেলিগ্রাফ অফিসসহ সরকারি অফিস-আদালত, ব্যাংক-ট্রেজারি খুলে দিলেন বাংলাদেশের প্রশাসন চালাতে গিয়ে। ডিসি বাংলোর যুদ্ধ, টেলিফোন এক্সচেঞ্জ যুদ্ধ, পুলিশ লাইন যুদ্ধের মতো দুর্ধর্ষ লড়াইয়ে জয়ী হওয়ার পরও ১০ এপ্রিল পাকিস্তানিরা পাবনা দখল করে নেয়। তিনি চলে যান মেহেরপুর। ১৭ এপ্রিল বাংলাদেশ সরকারের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানের অন্যতম আয়োজক হলেন সেখানে। দায়িত্ব পালন করলেন নিরাপত্তা বিধানের। মেহেরপুর-চুয়াডাঙ্গা অঞ্চলের ব্যাংক ও ট্রেজারি থেকে টাকা ট্রাকে করে বিএসএফের মাধ্যমে পৌঁছে দিলেন বাংলাদেশ সরকারের কোষাগারে। পুরো মুক্তিযুদ্ধকালে প্রশাসনিক ব্যয় নির্বাহ হলো সেই টাকায়। মুজিবনগরে একমাত্র সচিব হিসেবে যোগ দিলেন এপ্রিলের দ্বিতীয়ার্ধে। অন্য কয়েকজন ব্যুরোক্র্যাট যোগ দেওয়ার পর হলেন সংস্থাপন সচিব। ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে দায়িত্ব পালন করলেন প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের সঙ্গে। সরকার পরিচালনায় সহযোগিতার পাশাপাশি পরিদর্শন করতে থাকলেন বিভিন্ন যুদ্ধক্ষেত্র। পাকিস্তানি খানদের ঘৃণা জানাতে গিয়ে নিজের নাম থেকে পারিবারিক পদবি খান ত্যাগ করলেন ঘনিষ্ঠ বন্ধু পটুয়া কামরুল হাসানের বিখ্যাত ছবি দেখার পর।

১৬ ডিসেম্বর স্বাধীন হলো দেশ। ১৮ তারিখেই ঢাকা এলেন মুজিবনগর থেকে সরকার স্থানান্তরের প্রথম ব্যক্তি হিসেবে। জনবলহীন সচিবালয়ে কাটালেন দিনরাত। পালিয়ে থাকা ও স্বেচ্ছা-কারাগারে যাওয়া ব্যুরোক্র্যাটদের বাংলাদেশের প্রতি আনুগত্যের শর্তে প্রবেশ করালেন সচিবালয়ে। আনুগত্য প্রকাশে অনীহা প্রকাশকারীদের ঢুকিয়ে দিলেন জেলে। ঢাকায় চালু হলো বাংলাদেশ সরকারের প্রশাসন।

কয়েক বছরে সচিব হিসেবে একের পর এক প্রতিষ্ঠান সৃষ্টি করলেন। বঙ্গভবন, বিমান বাংলাদেশ, বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের নামও তার দেওয়া।

বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে স্বাধীনতার সংগ্রাম শেষ হলেও তিনি দেখলেন তার কাঙ্ক্ষিত মুক্তির সংগ্রাম রয়েছে বাকি। দৃষ্টি দিলেন দেশের অর্ধেক মানুষ নারীকে উৎপাদন কাজে সংশ্নিষ্ট করার মাধ্যমে অর্থনৈতিক উন্নয়ন সাধনের দিকে। প্রথম ‘ব্যাক টু ব্যাক এলসি’র মাধ্যমে তৈরি পোশাক শিল্প প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিলেন। প্রারম্ভে ১৩১ জন কর্মীকে কোরিয়ার দাইয়ু কোম্পানির সঙ্গে যুক্ত করলেন প্রশিক্ষণ ও উৎপাদন প্রক্রিয়ায় দক্ষতার জন্য। তাদের মধ্যে নারী কর্মীও ছিলেন। যাত্রা হলো দেশ গার্মেন্টস লিমিটেডের। তৈরি পোশাক শিল্পের জগতে ইতিহাস তৈরি করল এ প্রতিষ্ঠান। আজ বাংলাদেশ হাজার হাজার কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করছে; প্রায় ৪৫ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে এই তৈরি পোশাক শিল্প মাধ্যমে। এর পথিকৃৎ মোহাম্মদ নুরুল কাদের।

১৯৯৮ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর লন্ডনে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মারা যান মোহাম্মদ নুরুল কাদের। কিন্তু তার সৃষ্টির সুফল ভোগ করছে বাংলাদেশে ৪৫ লাখ পরিবার। দেশ এগিয়ে যাচ্ছে বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত সংগ্রাম অর্থনৈতিক মুক্তির দিকে।

 

 


Share It
  • 15
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    15
    Shares

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here