সম্প্রতি মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে মুক্তিযোদ্ধাদের নামের পূর্বে ‘বীর’ শব্দটি ব্যবহারের নির্দেশনাকে সাধুবাদ জানিয়ে একাত্তরের মুক্তিযোদ্ধা সংসদের চেয়ারম্যান লেখক গবেষক আবীর আহাদ বলেছেন, বিষয়টির ঐতিহাসিক গুরুত্বের আলোকে সর্বাগ্রে মুক্তিযোদ্ধাদের সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেয়া একান্ত প্রয়োজন । অন্যথায় এ-নির্দেশনা টেকসই হবে না ।

আজ এক বিবৃতিতে উপরোক্ত মন্তব্য করে আবীর আহাদ বলেন, বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সুমহান নেতৃত্বে ও নির্দেশনায় মুজিবনগর সরকারের পরিকল্পনায় বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সীমাহীন শৌর্য ত্যাগ রক্ত ও বীরত্বে, এক সর্বাত্মক রক্তাক্ত মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে পৃথিবীর মানচিত্রে বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটেছে । কিন্তু পরিতাপের বিষয় এই যে, স্বাধীনতা অর্জনের পর রচিত বাংলাদেশের জাতীয় সংবিধানের মূল স্তম্ভ ‘প্রস্তাবনা’র কোথাও ‘মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধা’ শব্দের কোনোই অস্তিত্ব নেই ! এর অর্থ আমাদের সংবিধানে মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের অবদান সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃত হয়নি যা অত্যন্ত বেদনাদায়ক ।

আবীর আহাদ বলেন, আমাদের সংবিধানের প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে : আমরা বাংলাদেশের জনগণ——–‘মুক্তি সংগ্রামের’ মাধ্যমে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত করিয়াছি ‘——এখানে ‘মুক্তিযুদ্ধে’র কথাটি স্বীকৃত হয়নি । অনুরূপ ‘দেশের জনগণ ও শহীদদের প্রাণোৎসর্গের বিনিময়ে’ কথাটি থাকলেও মুক্তিযোদ্ধাদের অবদানের কথা স্বীকৃত হয়নি । সংবিধানে যখন মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধা শব্দদ্বয় স্বীকৃত নয়, সেখানে মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের হাজারো গুণকীর্তন করা হলেও সাংবিধানিক আইনের চোখে তা ধোপে টেকে না । আজকে মুক্তিযোদ্ধাদের নামের আগে ‘বীর’ লেখার যে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে এটার কোনো সর্বজন শাশ্বত গ্রহণযোগ্যতা নেই । কেনো না, কোনো সময় যদি মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষ শক্তি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসীন হয়, তখন তারা এ-প্রশাসনিক আদেশ আরেকটি প্রশাসনিক আদেশ দিয়ে প্রত্যাহার করে নিতে পারবে । এমনকি চলমান সময়েও সবাই এ-নির্দেশনা মানবে, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই ।

আবীর আহাদ বলেন, অনেক বিদগ্ধজন বলে থাকেন যে, সংবিধানে ‘মুক্তি সংগ্রাম’ শব্দটি ‘মুক্তিযুদ্ধ’ শব্দটির নামান্তর—-একে অপরের পরিপূরক, একই অর্থ বহন করে । তাহলে তো বাংল ভাষার অভিধানে মুক্তিসংগ্রাম, মুক্তিযুদ্ধ বা স্বাধীনতা যুদ্ধ, স্বাধীনতা সংগ্রাম বলে পৃথক পৃথক প্রসঙ্গ বা শব্দ থাকতো না—–যে-কোনো একটি প্রসঙ্গ দিয়ে সব প্রসঙ্গকে চিহ্নিত করা যেতো ! অনুরূপভাবে ইংরেজী ভাষায়ও শব্দগুলোকে পৃথক পৃথকভাবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যেমন : Liberation Struggle, Liberation war বা War of Liberation, Independence War, independent Struggle.

বিবৃতিতে আবীর আহাদ সংবিধানের পবিত্রতা ও ইতিহাসের স্বার্থে মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযুদ্ধকে সাংবিধানের যথাযথ স্থানে লিপিবদ্ধ করার দাবি জানিয়ে বলেন, সংবিধানে মুক্তিযোদ্ধাদের ঐতিহাসিক অবদান স্বীকৃত হলেই কেবল ‘বীর মুক্তিযোদ্ধা’ নামের  সার্থকতা মহিমান্বিত হয় ।

একই বিবৃতিতে আবীর আহাদ ভুয়ামুক্ত মুক্তিযোদ্ধা তালিকা প্রণয়নে বঙ্গবন্ধুর বাহাত্তর সালের মুক্তিযোদ্ধা সংজ্ঞার আলোকে একটি বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশনের মাধ্যমে বিষয়টি ফয়সালা করার জন্যে সরকারের প্রতি দাবি জানান এবং বিধিবহির্ভূত পন্থায় বিভিন্ন সময় যেসব অমুক্তিযোদ্ধাদের মুক্তিযোদ্ধা বানানো হয়েছে, সেগুলোকে ঝেঁটিয়ে বিদায় করে তাদের ও যারা তাদেরকে অর্থ আত্মীয়তা ও রাজনৈতিক বিবেচনায় মুক্তিযোদ্ধা বানিয়েছে তাদের সবার বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তি প্রদানের আহ্বান জানিয়েছেন ।

——আবীর আহাদ
চেয়ারম্যান, একাত্তরের মুক্তিযোদ্ধা সংসদ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here