“ভোগান্তি”

Share It
  • 3
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    3
    Shares

শ্রাবণঢলের টানা বর্ষণে লোকালয় পানিতে প্রায় ডুবে গিয়েছে। আকাশের সব জল অষাঢ় হয়ে ঝরে পড়ছে আজ ক’দিন ধরেই। বৃষ্টির টানা জলধারা দেখে এমন মনে হচ্ছে যে মনে হয় বৃষ্টিদেবী বাপের বাড়ী থেকে চিরতরে স্বামীর ঘরে চলে এসেছে, তাই তার কান্না থামছেনা। আর মেঘ দেবতার সমস্ত রাগ মর্ত্যলোকে অবিরত আঁচড়ে পড়ছে। পানিডাঙ্গা ইউনিয়নের সবথেকে নিচু গ্রাম হচ্ছে পানিফুয়ারা গ্রাম। আর এই গ্রামের সবচেয়ে নিচু বাড়িটি মজুর মায়ের। মজুর মায়ের বাড়ি অপেক্ষাকৃত একটু নিচু জায়গায়  হওয়াতে বর্ষাকালে বৃষ্টির জল জমে থাকে। আর এরকম টানা বর্ষণ হলে তো রীতিমত উঠোনে প্রায় সাঁতার পানি জমে যায়। তবে মজুর মায়ের বাড়ির উঠোনে পানি জমার কারন যে শুধুমাত্র নিচু ভিটায় বাড়ি, তা কিন্তু নয়। বাড়ি থেকে একটু দূরে যে খালটা রয়েছে এই খালের মুখ প্রায়ই বন্ধ থাকে। খালের মুখ খুলে দিলেই পানি একটু একটু করে কমে যেতে শুরু করে। গ্রাম থেকে কালবৈভব নদী বেশ দূরে। গ্রামের পানি প্রথমে খালে নামে তারপর গজুমতি বিল পেরিয়ে নদীতে ঢলের পানি নামে। সলিম মেম্বরের ধানক্ষেত না ডুবে গেলে খালের মুখ খোলার সাহস পায়না কেউ। সলিম মেম্বরের ধানক্ষেত ডুবলে দলবল নিয়ে খালের সামনে হাজির হয় সে আর খালের মুখ খুলে দেয়।   তবে বড় বর্ষা নামলে এই গ্রামের মানুষ যে পানি বন্দী হয়ে ভোগান্তিতে পড়ে একথা বলায় যায়। আর সবথেকে বড় ভোগান্তি পোহায় মজুর পরিবার।
সন্ধ্যাকালে প্রায় আধঘণ্টার মত বৃষ্টি পড়া বন্ধ থাকে। আর বৃষ্টির এই বিরতিতে মজুর মা তার ছাগলের পালের জন্য বাড়ির পাশের উচু ঝোপ থেকে গাছের পাতা কেটে আনে। এই ফাঁকে মজুর বউ রশিদা কোনো রকম শাঁক-পাতা ভাতের উপর বসিয়ে রান্না করে নেয়।
মজুদের বাড়িটা আধপাকা আর টিনের চালার তৈরি। বছর বছর উঠোনে বিপুল বৃষ্টির জলরাশি জমাট হয় বলে ঘরের পুতা একটু বেশি উচু করে বানিয়েছে। এই মোটামুটি কোমর পানি উঠলেও ঘরের মেঝে বা ফ্লোরে পানি উঠবেনা। তবে কোমরের উপরে পানি উঠলে ঘরের মেঝে ছাপাবে। এই বছরেই মজুর বৌয়ের পীড়াপীড়িতে মজু ঠিক বর্ষার আগে রান্নাঘরটা ভালো করে পোতায় ইট দিয়ে উচু করে বানিয়েছে। মজুর বৌয়ের পীড়াপীড়ির অনেক কারন ছিলো বটে। কেননা শুষ্ক মৌসুমে যেখানে সেখানে রান্না করা যায় কিন্তু বর্ষাকালে হেঁশেল ঘর ছাড়া গ্রামের কোনো গিন্নিরই চলেনা।  বর্ষাকালে বৃষ্টির সাথে যুদ্ধ করে রান্না করতে করতে ক্লান্ত মজুর বউ। এইবার আর এই ভোগান্তি পেতে চায়না বলে সে আগেভাগেই রান্নার জায়গা প্রস্তুত করার জন্য মজুকে চাপ দেয়। তবে মজু এখনও গোয়াল ঘর পাকা আর উচু করে বাঁধতে পারেনি। বড় বর্ষা হলে ছাগলগুলো তার মায়ের ঘরে রেখে দেয় আর গরুগুলোকে গোয়ালে রেখেই গলার দড়ি খুলে ছেড়ে দেয়।
মজুর বয়স চল্লিশ বছরের মত হবে। পানি ডাঙ্গা ইউনিয়ন পরিষদের সে একজন চৌকিদার। চৌকিদারি করে বেতন যা পায় সে, সেটা তার পুরপুরিই সঞ্চয়। বড় বিপদ না আসলে বেতন থেকে টাকা তুলে সে খরচ করে না। চৌকিদারের পাশাপাশি সে কৃষিকাজও করে। তার পৈতৃক সম্পত্তি প্রায় দুই বিঘার মত জমি। বিশ বছর বয়সের ছেলে খোকা মিয়া সারাদিন মাঠেই পড়ে থাকে। লেখাপড়া কিছুই কপালে জোটেনি খোকা মিয়ার। যেটা বলছিলাম, মজুর বেতনের টাকা তোলা লাগেনা। পাশাপাশি মজুর মা যে ছাগল পালে তা থেকে কিছু না হলেও বছরে সত্তর-আশি হাজার টাকা আসে।  হাঁস-মুরগী আর কবুতর তো আছেই। যাইহোক, বৃষ্টি আবার শুরু হয়েছে। একের পর এক ছন্দ পরিবর্তন করে বৃষ্টি ঝরা চলছে  চলছেই।
বাড়ির উঠোনে কুলা ব্যাঙ গলা ছেড়ে ঘ্যাঙর ঘ্যাঙ করে কর্কশ গোছের গীত গাচ্ছে। এমন সময় মজুর বাতিক উঠে গিয়েছে। শলাকায় ধুম্রছাড়া আর পানের পাতায় চুন, সুপারি আর জর্দার মিশেল গালের মধ্যে নিয়ে কচমচ করে যতক্ষণ না পর্যন্ত সে চিবাতে পারছে, ততক্ষণ পর্যন্ত তার বাতিক থামানোর আর কোনো বিকল্প পথ নেই। কাল বিলম্ব না করেই ছাতা নিয়ে সে বশীরের দোকানে চলে গেল।
বশিরের দোকানে গিয়ে পান বিড়ির নেশা সেরে বাড়ি ফেরে মজু। উঠোনের কুলা ব্যাঙ রীতিমত রক গান শোনাচ্ছে, ক’দিন আগের সদ্য জন্ম নেওয়া ছাগলের বাচ্চাগুলো মজুর মায়ের ঘরে প্যাঁ প্যাঁ করে ডাকছে। পা তার আর ধৌত করা লাগেনা। উঠোনের কোমর পানি ভেঙ্গে সরাসরি ঘরের বারান্দায় ওঠে মজু। বৈদ্যুতিক বাতির আলো জ্বেলে ভাত খাওয়া শুরু করে সে। খাওয়া-দাওয়া শেষ করেই ঘুমোতে যায়।
মজুর ছোট ছেলের বয়স আট বছর মত। সে এখনও বাপ-মায়ের সাথেই ঘুমায়। মজুরা যে চৌকিতে ঘুমায় সেটা এই তিনজনের জন্য খুব ঠাসাঠাসি বটে। ছেলের ঘুম গভীর হলে মজুর মায়ের কাছে রেখে আসবে মজু। তবে আজ যেহেতু দিন ঠাণ্ডা আছে, সেক্ষেত্রে চাপাচাপি করে শোয়া যাবে হয়তো।  নানান চিন্তা আর দুশ্চিন্তা মাথায় নিয়েই মজু ঘুমাতে গেল।
মজুর মুখের পান বিড়ির গন্ধ মজু না পেলেও রশিদা কিন্তু ঠিকই পায়। বিশ্রী দুর্গন্ধে ঘুম থেকে উঠে টর্চের আলো জ্বেলে মজুর গোঁফ টেনে ধরে রশিদা। আচমকা ঘুম থেকে ওঠে মজু। রাগ আর বিরক্ত দেখানোর আগেই রশিদার চোখে যে চাহনী সে দেখে, তাতে সে নিজেই ছেলেটাকে এক পাশে সরিয়ে রেখে রশিদার নদী বক্ষে ঝাপিয়ে পড়ে। যাইহোক, নিজেদের কাজ কর্ম সেরে ক্রোশ ক্রোশ মাইল পথ পাড়ি দেওয়া ক্লান্ত পথিকের মত আবার ঘুমিয়ে যায় তারা।
মজুর মা আজ বেশ ক্লান্তকায় আর বড্ড ভঙ্গুর মন নিয়ে বিছানায় ঘুমাতে গিয়েছিলো। বড় দুঃসংবাদ বুকের মধ্যে পাথরের ন্যায় চেপে রাখলে যেমন অবস্থা হয় তেমনি সেইরকম ছাপই রশিদা তার শাশুড়ীর চোখে-মুখে দেখেছিলো। রাতের খাওয়াটা পুরো না খেয়েই উঠে গিয়েছিলো মজুর মা।
বৃষ্টির ঝনঝনানি এখন একটু থেমেছে। একটু পরেই মুয়াজ্জিন ফজর নামাজের আযান দিবে। এমন সময়ে মজুর মা ক্লান্ত শরীর নিয়ে ঘুম থেকে উঠে নিজের প্রাকৃতিক কার্য সেরে অজু করে বারান্দায় ওঠে। নামাজের পাটি বিছিয়ে নামাজ পড়তে বসবে সে। এমন সময় ধপ করে মাথা ঘুরে পড়ে যায়। এমন ধপ শব্দে মজু আর রশিদার ঘুম ভাঙে। ঘরের দুয়োর থেকে বারান্দায় চোখ মুছতে মুছতে এসে তারা দেখে মা মাটিতে পড়ে আছে। মা মা বলে ডাকতে থাকে মজু। মায়ের কাছ থেকে আওয়াজ না পেয়ে মজু আর রাশিদা চিৎকার করে কান্না শুরু করে। কান্নার আওয়াজ শুনে আশে পাশের বাড়ি থেকে লোকজন ছুটে আসে। মহুর্তেই অর্ধকোমর উঠোন পানিতে লোকজনে ভরে যায়। “কেউ একজন ভ্যান নিয়ে আয়। এখনও দম চলছে” – এই কথা বলে হাকিমের মা।
একজন অটোভ্যান খুঁজে বাড়ি থেকে একটু দূরে উচু রাস্তায় রেখে আসে। আবার আরেকজন গ্রামের হাতুড়ে ডাক্তার বোরহান শেখকে ডেকে আনে। “মনে হয় স্ট্রোক করেছে” – প্রেশার মাপার মেশিনটা গলায় ঝুলিয়ে এই কথা বলে বোরহান শেখ। ইতোমধ্যে আবার অনেকে মজুর মায়ের মাথায়  পানিও ঢালছে। জ্ঞান ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেছে তাদের সাধ্যমত। যাইহোক, মজু এক পা দেরি না করে মাকে নিয়ে জেলার সদর হাসপাতালে আসে। সদর হাসপাতালে চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে কত যে ভোগান্তি মজুকে পোহাতে হয় তা কেবল মজুই বুঝেছে। জরুরী বিভাগে মজুর মাকে ভর্তি করা হয়। দায়িত্বরত ডাক্তার রোগীর উপসর্গ আর দেহের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রতঙ্গের গতিবিধি পরীক্ষা করে সে নিশ্চিত হয় যে রোগী স্ট্রোক করেছে। “বাঁচবে কি বাঁচবেনা তা কিছুই বলা যাচ্ছেনা। ক’য়েক ঘণ্টার ‘অবজারভেশনে’ রাখতে হবে। পরিবর্তনবনা হলে বিভাগীয় শহরের বড় হাসপাতালে রোগীকে নিয়ে যেতে হবে” – এই কথা বলেন ডাক্তার।
ইতোমধ্যেই মজুর আত্মীয় স্বজনের অনেকেই হাসপাতালে চলে এসেছে। মজুর আশি বছরের নানিও হাসপাতালে এসেছে। নিজের মেয়ের পাশে বসে ভগ্ন হৃদয়ে চোখের নিষ্পাপ জল ঝরিয়ে অন্তরাত্মা আহাজারি করছে তার। কিছুক্ষণ বাদে ডাক্তারের কাছে আরও কিছু উচ্চতর রিপোর্ট আসে। মজুর মা’কে এখানে আর রাখা যাবেনা। বড় হাসপাতালে নিতে হবে। একদিকে মায়ের জ্ঞান ফেরেনি আর অন্যদিকে ডাক্তার অন্য হাসপাতালে নিতে বলছে। এমন অবস্থায় মজুর মনোবল যেভাবে ভেঙ্গে চুর্ন-বিচুর্ণ হচ্ছে তা কেবল বাইরে থেকে অনুভব করা যায় কিন্তু সেই ভাঙণ যে কত বড় আঁচড়ের ঢেউ ফেলে মনকে ক্ষত-বিক্ষত করছে তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন।
টাকা পয়সা কীভাবে আসছে আর কীভাবে যে হাসপাতালের দ্বার গোড়ায় মজু মাকে নিয়ে যাচ্ছে তা মজু নিজেই জানেনা। আর জানার মত বোধ এখন তার আর নেই। আত্মীয় স্বজন যারা আসছে তারা মজুর হাতে টাকা ধরিয়ে দিচ্ছে। নিতান্তই বড় অংকের টাকা না হলে ফেরত নিবেনা। এমন কী এমন বিপদের সময়ে আত্মীয় স্বজনদের মধ্যে সব থেকে কঞ্জুস ব্যক্তির পকেট থেকেও টাকা বের হয়ে আসে। ‘জান বাঁচানো যে ফরয’ কাজ –  এটা কমবেশি সবাই মানে। পানিডাঙ্গা গ্রামের লোকের মধ্যে তা মানতে আরও বেশি পরিমাণে দেখা যায়। আর দু’য়েকজন সহকারি লোকজন তার সাথেই আছে। এই যেমন, বি এ পাস করা মজুর মামাতো ভাই তো জোঁকের মত লেগে আছে।
যাইহোক, সদর হাসপাতাল ত্যাগ করে মজু মাকে নিয়ে বিভাগীয় শহরের বড় সরকারী হাসপাতালে যায়। সেদিনই হাসপাতালে সন্ধ্যের দিকেই জ্ঞান ফেরে মজুর মায়ের। জ্ঞান হারানো মজুর মায়ের আর জ্ঞান হারিয়ে আবার জ্ঞান ফিরে পাওয়া মজুর মায়ের মধ্যে রয়েছে দিন আর রাত সম পার্থক্য। শরীরের বাম পাঁজর পড়ে গেছে, মুখ বেঁকে গেছে। কথা যা বলার চেষ্টা করছে তা বড্ড অস্পষ্ট। ষাট বছর বয়সী মজুর মায়ের দু’চোখের কিনার দিয়ে অঝরে শান্ত আর শুভ্র ব্যাথার জল গড়িয়ে পড়ছে। যাইহোক, ছয় থেকে সাতদিন হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পায় সালেহা ভানু।
ছালেহা ভানু নামটা তার হারিয়ে গেছে অনেক আগেই। বিয়ের পরে তছিমের বউ আর মজু জন্ম নেওয়ার পরে মজুর মা –গ্রামের লোক সবাই তাকে এই নামগুলোতেই ডাকে। আর যখন ভোট কেন্দ্রে বিভিন্ন সময়ে ভোট দিতে যায় তখন ভোটার তালিকা থেকে তার এই বাবা-মায়ের দেওয়া নাম খুঁজে বের করা হয় টেনে টেনে।
মজু মাকে নিয়ে বাড়ি ফেরে। এই সাতদিন আগের যে সময় তারা পার করেছিলো আজ তার রঙ ধুসর হয়ে বড্ড বিবর্ণ হয়ে গিয়েছে। সংসাসের নিত্য দিনের কাজগুলো জমে গিয়েছে। যত জায়গা থেকে ধার দেনা করে টাকা জোগাড় করেছিলো সেগুলো ফেরত দিতে হবে।মজুর মায়ের ছাগলের পাল রোগা হয়ে গেছে।  মজুর বৌ এই কয়দিনে সামলে উঠতে পারেনি। যে মানুষ এই সংসারে বট গাছের মত শীতল ছায়া যুগিয়ে গেছে সেই আজ বিছানায় পড়ে পরছায়ায় শীতল হওয়ার বৃথা চেষ্টা করছে।
নিজের চলাফেরার শারীরিক সামর্থ হারিয়েছে মজুর মা। যতটুকু পারে তা হচ্ছে সামান্য নড়াচড়া ছাড়া আর কিছুই না। আর তার অল্প অল্প তোতলানো কথাও তেমন কেউ বুঝতে পারেনা। এতদিনে মজুর মায়ের ছাগলের পাল উজাড় হয়ে গিয়েছে। একটি ছাগলও আর নেই, সবগুলোই বিক্রয় করা হয়েছে।
একদিন মজু বিকাল বেলা বাজার থেকে বাড়ি ফিরে মাকে আনার ফলের রস মুখে তুলে খাওয়াচ্ছে। “কী হইলো রে মা সেইদিন”? – মজু জিজ্ঞেসে করে।  “ঐদিন কাল সন্ধ্যের সময় সজনে গাছের ডাল ভাঙছিলাম। ঐগাছে তিনটে ডাল ছিল। একটা ডাল ভাঙার পরেই আমার শরীলের সব শক্তি পড়ে আসে। আমার মাথা ঘুরতি থাকে। ঐগাছে কিছু ছিলো বাপ” – নিজের অসুস্থ্য হওয়ার পেছনের কথা বিড়বিড়িয়ে বলে মজুকে। মজুর মা স্ট্রোকের অর্থ জানেনা। আবার কেন কি কারনে স্ট্রোক হয় তাও জানেনা। তাই সেইদিনের সেই কাল সন্ধ্যের সময়ের সজনে গাছের ডাল ভাঙাকে তার অসুস্থতার কারন মনে করে নিজের কপালের ফের বলে সান্ত্বনা খোঁজে।
মাকে সুস্থ করে তোলার জন্য মজু কোনো রকম ত্রুটি রাখেনা। একবার ডাক্তার তো পরেরবার কবিরাজ – কোনো জায়গা যেতে তার বাকি থাকেনা। ছাগলের পাল আগেই শেষ। দুইটি গরুও বিক্রি করা হয়েছে চিকিৎসার জন্য। যে মজু চৌকিদারদের চাকরির বেতন তুলতো না বিপদে না পড়লে, সে এখন রীতিমত টাকা ধার করে। এত কিছু করেও কিন্তু মা আর সুস্থ হয়ে ওঠেনা।
সারাদিন বাড়িতে যে এত কাজে বিভোর থাকতো সেই মানুষটি আজ ঘরের বারান্দায় এক চৌকিতে সারাক্ষণ শুয়ে থাকে।  সবল থাকাকালীন সময়ে মজুকে এত বড় বয়সেও সংসার নিয়ে তার তেমন ভাবা লাগেনি। রশিদার মাথার উপরও ছায়া ছিলো। এখন তারা দুইজনে বড্ড বিষণ্ণভার সময় পার করছে। যাইহোক, মজুর মায়েত শরীরের সব হাড়গুলো গুনে গুনে বের করা যাবে। পায়ে হেঁটে পথ চলতে না পারা আর নিজের হাতে খাবার খেতে না পারার  ভোগান্তির যে ছবি দিনরাত অবধি মজু দেখে তাতে তার অন্তরাত্মা ভেতরে গুমরে গুমরে কান্না ছাড়া আর কিছুই করতে পারেনা। মৃত্যু যন্ত্রনার যে ভোগান্তি সে সহ্য করছে তা না যায় দেখা আর না যায় সইতে পারা। আর এমন ভোগান্তি এটা যা কেউ ভাগ করে নিতে পারেনা। রোগের ভোগান্তির কষ্ট শুধুমাত্র রোগীরই। যত আপন মানুষই হোক না কেন এই ভোগান্তি কেউ ভাগ করে নিতে পারেনা। যার টাকা আছে সেও টাকা খরচ করে তবে সুস্থতা অন্য কাউকে দিতে পারেনা। যাইহোক, স্ট্রোক করে মৃত্যু  থেকে বাঁচার জন্য যে মজুর মা প্রতিনিয়ত লড়াইয়ে নেমেছে, সেই লড়াইয়ের মোড় ঘুরে গিয়েছে। এখন ধুঁকে ধুঁকে ভোগান্তির বেঁচে থাকা থেকে মুক্তি পেয়ে মরে বাঁচতে চায় সে।
একটানা দুইবছর রোগে ভুগছে মজুর মা। একদিন কাল সন্ধ্যে বেলা একপাল কাক এসে মজুর বাড়িতে কা কা করে চিৎকার করে। ঐ সময় থেকেই মৃত্যুর টান বোধ করে সে। গ্রামের ময়-মুরব্বী চাচীরা, মামীরা কানে আল্লাহর কালাম দেয়। সেই রাত শেষে ভোরের সুর্য ওঠার আগেই ভগ্ন আর রুগ্ন দেহ থেকে মজুর মায়ের প্রাণ বায়ু ধরাশয় ত্যাগ করে।
সাড়ে তিনহাত মাটির ঘরে চির নিদ্রায় শুয়িয়ে রেখে এসে সবার মত মজুও বাড়ি ফিরে আসে। চোখে জল গড়াচ্ছে অঝোর ধারায়। এই জল একদিন শুকিয়ে যাবে। ঠিক যেমনিভাবে ছয় বছর আগে পিতার মৃত্যুর পরে চোখের জল শুকিয়ে গিয়েছিলো। আত্মীয়-স্বজন আর পাড়া-প্রতিবেশি সবাই পরশ পাথর মাখস সান্ত্বনার চাদর বিছিয়ে দেয়। এক সময় চোখের জল কমে যায়, কান্নার কোলাহল থামে।
সময়ের স্রোতে গভীর শোকও পাথর হয়ে যায়। বড্ড ঝাপসা হয়ে যায় আপজনের সাথে কাটানো সময়ের ছবিগুলো। মজুও স্বাভাবিক হয়। জীবন-যাপনের তরীর হাল বাইতে আবার শুরু করে সে। মা ছাড়া সংসার চালানো যে কতটা কঠিন তা মজু আর রশিদা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে। মজুর বড়ছেলে আর ছোট ছেলের মধ্যেও পরিবর্তন এসেছে। মসজিদে যায়, নামাজ পড়ে। দাদীর জন্য দোয়া করে তারা। মাকে মজু মাঝে মাঝেই মনে করে। ঈদ আসলে বাবা আর মায়ের কবরের পাশে গিয়ে দোয়া করে। তবে মায়ের ভোগান্তির সেই ছবি যেই চোখের সামনে আসে, সে আর মায়ের কথা মনে করতে চায়না। তার মা যে মরে গেছে, এটা তাকে মেনে নিতে হয়, মানতে হয়।
একদিন রাতে ঘুমের মধ্যে মজু স্বপ্ন দেখে। একহাটে সে গরু কিনতে গেছে। গোহাটার এক কোনায় এক বাউল ফকির গান গাচ্ছে; “কে বলে মানুষ মরে…………।মানুষ মরে গেলে পরে বিচার হবে কার?” স্বপ্নে দেখা এই গান মজুকে নাড়া দেয়। আসলে স্রষ্টা মানুষের আত্মাকে বাঁচিয়ে রাখে বিচারের মুখোমুখি করার জন্য। “আমার মা বেঁচে আছে” – মনে মনে বলে মজু। এখনও তার মায়ের ছবি তার মনে আছে, তার সে মজু মজু বলে ডাক দেওয়া, মায়ের কথা আর মায়ের সেই ভোগান্তির স্মৃতি সবকিছুই মনকুঠিরে জমে আছে। সত্যিই তো। মানুষ তো মরেনা। মানুষের কথা থেকে যায়, ভাষা থেকে যায়। অন্তরাত্মা দেহ থেকে বিদায় নিলেই মানুষের মরন হয়না। দেহ থেকে আত্মা ত্যাগী মানুষ বেঁচে থাকে মানুষের মনে, যতক্ষণ পর্যন্ত মাটির পৃথিবীর মানুষ তাদের মনে বাঁচিয়ে রাখে, বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করে। আবার অন্যদিকে সৃষ্টিকর্তা মৃত দেহের আত্মা বাঁচিয়ে রাখে বিচার কার্যের জন্য। মায়ের আত্মা বেঁচে আছে এই সান্ত্বনা নিয়েই মায়ের ভোগান্তির ছবি ভুলতে থাকে মজু।
লেখক: আসিফ ইকবাল আরিফ
সহকারী অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, জাককাইবি, ত্রিশাল, ময়মনসিংহ।

Share It
  • 3
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    3
    Shares

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here