মেয়েকে এক মুক্তিযোদ্ধা বাবার চিঠি

Share It
  • 275
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    275
    Shares

দুনিয়া জুড়ে এখন করোনা মহামারী। তাই কারো জীবনের কোন নিশ্চয়তা নেই। এটাই চরম সত্য যে, আমি, তোমার মা, তুমি তোমার ভাই যে কেউ যখন তখনই দুনিয়া ছেড়ে চলে যেতে পারি। তবে তোমাদের টিকে যাবার সম্ভাবনা অনেক বেশি কারণ তোমাদের বয়স অনেক কম, তোমাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তুলনামূলক বেশি, আমাদের মত বয়সী মানুষদের চেয়ে। অনিশ্চিত আমাদের জীবনে তবুও হতাশ হবার কিছু নেই। কিছু করার, কিছু দেবার চেষ্টা যেন চালিয়ে যেতে পারো সেই জন্য এই চিঠি লিখছি।

শিক্ষা এখন আর শিক্ষকদের জন্য ব্রত নেই, গোটা দুনিয়া জুড়েই শিক্ষা এখন একটা বড় বাণিজ্য। তাই মান সম্মত, সময় উপযোগী আধুনিক ও সঠিক শিক্ষা আমাদের মত গরীব দেশে নেই বললেই চলে। তার নানা কারণ, এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে আমাদের মধ্যে পারিবারিক নৈতিকতার শিক্ষা বা চর্চা নেই, তাই ব্যক্তিগত নৈতিকতা প্রায় শূন্যের কোঠায়। সংগত কারণেই সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন স্থাপনা ও দপ্তরে, নানা পেশায়ও নৈতিকতার বালাই নেই। এমন কী শিক্ষা প্রদানে, আর শিক্ষা ব্যবস্থায় কোন নৈতিকতা শিক্ষা দেওয়া হয় না। মনে হচ্ছে আমাদের জীবন থেকে নৈতিকতা যেন হারিরে গেছে।

তুমি বড় বোন হিসেবে তোমার ভাইকে উন্নত শিক্ষা গ্রহণে অবশ্যই সাহায্য করবে। তুমি হয়তো জান ইজরাইলের শিক্ষা ব্যবস্থা। তারা সবাইকে জ্ঞান বিজ্ঞানের উন্নত শিক্ষা দেয়। শুনে অবাক হবে যে, তারা সবাইকে প্রযুক্তি শিক্ষা দেয়। তারা সবাইকেই কম্পিউটার শিক্ষা দেয়, হ্যাকার হতে উৎসাহিত করে। এদের মধ্যে যারা ভালো করে তাঁদের উন্নত প্রযুক্তির শিক্ষা দেয়। আইটি’র এই যুগে কম্পিউটারে দক্ষ না হলে কোন জাতিকে উন্নত করা যাবে না। উন্নত দেশগুলোতে জনসংখ্যা দিন দিন কমবে। তারা সবাই প্রযুক্তি নির্ভর হয়ে পড়বে। ষে সময় টিকে থাকতে প্রযুক্তি জ্ঞানের কোন বিকল্প নেই।

তুমি জান গ্লোবাল ওয়ার্মিং এর কারণে আগামীতে করোনার মর আরও অনেক নতুন নতুন ভাইরাসের আক্রমণ আসবে। তাই শরীর ঠিক রাখা মানে শরীরের ইমিউন সিস্টেম ডেভেলপ করা ছাড়া উপায় নেয়। খাদ্যাভ্যাস, ও জীবনাচরণ পরিবর্তন করে এটা করতে হবে। তোমার ভাইকে তা শিখাবে। তাঁকে মন শান্ত বা  স্থির রাখার জন্য যোগ ব্যায়াম বা ধ্যান করতে শিখাবে। তাঁকে আরও শিখাবে যে, সে যেন খারাপ লোকের উস্কানিতে যে রাগ না করে আমার মত। ক্রোধের আগুন ষে যেন ভিতরে পুষে রেখে সঞ্চারিত সমমনাদের মাঝে। যাতে করে সময় মত তাঁদের সাথে নিয়ে অপশক্তিকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ভস্ম করে দেওয়া যায়।

আরেকটা জরুরী জিনিস তুমি তোমার ভাইকে শিখাবে। সেটা হলো সে যেন অর্থ লোভী বা বহুগামী না হয়। অর্থ আর নিত্য নতুন নারী সম্ভোগ মানুষকে সুখি তো করেই না, বরং আরও অতৃপ্ত করে, হতাশায় নিমজ্জিত করে। যার পরিণাম, অসম্মান আর অপমৃত্যু, সন্তানদের আর স্বজন, পরিজনদের কাছে ছোট করে দেয়। অসম্মান নিয়ে, মানসিক যন্ত্রণা নিয়ে বেঁচে থাকার মত কষ্ট পৃথিবীতে আর দ্বিতীয়টি নেই। বিপুল অর্থ আর নিত্য নতুন নারী সম্ভোগ মানুষকে সুখ শান্তি দেয় না তার প্রমাণ এখন বাংলাদেশে দেখা যাচ্ছে। জি কে শামীম, ক্যাসিনো সেলিম, পাপিয়া, ডা. সাবরিনা, মেডিক্যাল যন্ত্রপাতি ও পণ্য সরবরাহকারী মিঠু, সাহেদ করিম, সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই শহরের ৪টি হোটেলে জোরপূর্বক বাংলাদেশি নারীদের আটকে রেখে ড্যান্সবারে নাচানো ও দেহব্যবসায় বাধ্য করানোর অভিযোগে আটক বিএনপি নেতা আজম খান, মানব ও অর্থ পাচারের অভিযোগে কুয়েতে গ্রেফতার পাপুল নামের বাংলাদেশের এমপি’রদের মত অসংখ্য মানুষ আছে যারা কিছু সরকারী অসৎ আমলা, কিছু নষ্ট সাংবাদিক, কিছু অসৎ রাজনীতিবিদের মদদে দেশটার জনগণের টাকা লুটে নিচ্ছে, বিদেশে পাচার করছে। আর কিছু বেসরকারি হাসপাতালের কর্মকাণ্ড দেখে তুমি অবাক হবে। বঙ্গবন্ধু প্রায় ৫০ বছর আগে শিক্ষিত মানুষের দুর্নীতি নিয়ে যে বক্তব্য দিয়েছে তা শুনলে মনে হয় উনি আমাদের বর্তমান সময়ের কথাই বলছেন।

তুমি জেনে অবাক হবে যে, ৪৬ বছর বয়সী চট্টগ্রামের  ব্যবসায়ী করোনা আক্রান্ত জনৈক সেলিম সেখানকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে সাধারণ বেডে ১২ দিন ভর্তি থাকার পরে মারা গেছেন। তাঁর মোট বিল হয়েছে ৬ লাখ ৯৭ হাজার টাকা। ২ লাখ ৯৭ হাজার টাকার জন্য লাশ আটকে রাখা হয়েছে হাসপাতালে। ১২ দিনের সার্ভিস চার্জ ১ লাখ ৫০ হাজার, দুই বার অক্সিজেন দেবার খরচ ২ লাখ টাকা, ১২ দিনের সাধারণ বেডের চার্জ ১ লাখ ৩২ হাজার টাকা। আমাদের দেশের মানুষের নৈতিকতা কোথায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে তা কী আর বলার দরকার আছে? সব খাতের অবস্থাই প্রায় এক।

বাবা, দুর্নীতি করে, অবৈধ উপায়ে অর্থ কামায় করলে সেটা থাকে না। ঐ টাকা ঘুষ দিতে, ডাক্তার দেখাতে দেখাতে শেষ হয়ে যায়। যারা এটা অর্জন করে তারা ব্যাংকের ক্যাশিয়ারের মত শুধু টাকা নাড়াচাড়া করে, আর টেনশনে রোগী হয়ে যায়। নিজে বা পরিবারের কেউ সেটা ভোগ করতে পারে না।

তোমার ভাই যেন, যে কোন উপায়ে পড়ালেখা চালিয়ে যায়। পৃথিবীতে জ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় যে অগ্রগতি তা যেন জেনে রাখে। তুমি তো জান ২য় বিশ্ব যুদ্ধের পরে সব দিক থেকে বিধ্বস্ত জাপান শুধু মেধাবীদের দেশ বিদেশ থেকে শিক্ষা লাভে উৎসাহিত করে মাত্র ৫০ বছরেরও কম সময়ে পৃথিবীর অন্যতম পরাশক্তি হয়ে উঠে। তোমার বাবা মুক্তিযুদ্ধ করেছিলো, দেশ স্বাধীন করতে জীবন বাজি রেখে লড়াই করেছিলো। সেটা ভুলে যেও না। সরকার জনগণের ৫ টি মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে পারছে না, এই সব দুর্নীতিবাজ মানুষের জন্য; দেশ-প্রেমিক মেধাবী মানুষের সাহায্যের অভাবে। ভাইকে শিখিয়ে দেবে, দেশটা আমাদের। তাই ওকে বিদেশে লেখাপড়া শিখিয়ে কিছু বাস্তব অভিজ্ঞতা নিয়ে যে করেই হউক দেশে ফেরত পাঠাবে।

নিজের ভালো অভিজ্ঞতার কথা দেশের সবার সাথে শেয়ার করা খুব জরুরী। ওকে বল সে যেন প্রতিদিন ১ ঘণ্টা করে কোন বিষয়ে পড়ে সপ্তাহে একটা করে হলেও ভালো লেখা লিখবে যাতে দেশের মানুষ সচেতন হয়।  শিক্ষায় নৈতিকতা চালু করার পক্ষে সে যেন সোচ্চার হয়। নৈতিকতায় বলিয়ান মানুষ দেশের সম্পদ। তাঁকে বলবে নিজের জীবনের পাশাপাশি দেশের জন্য কিছু করার লক্ষ্য নির্ধারণ করে পরিকল্পিতভাবে এগুতে থাকে। দেশ প্রেম কাকে বলে তা জানার ও শেখার জন্য আসমানি কিতাবের অনুসারী ইজরাইলীদের কাছে  থেকে শিক্ষা নিতে বলো। ভয় নেই ওরা পাসপোর্টে সীল দেয় না, আলাদা কাগজে এন্ট্রি ভিসা দেয়। জিয়া আমাদের জন্য ইজরাইল ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা দিয়ে গেছেন, যদিও তাঁদের ধর্মীয় নেতাকে আমরা নবী মানি। তাঁদের ধর্মগ্রন্থকে আমরা আসমানি কিতাব বলি। ওরা মুসলিমদের কাছে এক ঘরে হয়ে নিজেদের জ্ঞান বিজ্ঞান চর্চায় ও দৈনন্দিন জীবনে তা বাস্তবায়নে বর্তমান বিশ্বে উন্নতির চরম শিখরে উঠে গেছে। মুক্তিযোদ্ধারা দেশের মধ্যে অনেকটা ইজরাইলের মত কোন ঠাঁসা। তাই খুব নীরবে নিজের ও দেশের জন্য একনিষ্ঠ-ভাবে কাজ করে যেতে হবে, জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত।

বাবা, তোমার ভাইকে একটা কথা ভালো করে বুঝিয়ে দিও। সে বা তাঁদের কেউ যেন এমন কোন কাজ না করে যা প্রকৃতির বিরুদ্ধে না যায়। প্রকৃতির প্রতিশোধ খুব ভয়াবহ। তাঁকে প্রকৃতি প্রেমিক হতে শিক্ষা দিও। মানুষকে ভালবাসতে, পৃথিবীর সকল প্রাণীকে ভালবাসতে শিখাবে।

কেন তোমাকে চিঠিটা না পাঠিয়ে বালিশের নীচে রেখে দিয়েছিলাম, তা তুমি বুঝতে পারবে। তোমার যেন আগে থেকেই মন খারাপ না করো তাই তমাকে চিঠিটা পাঠায় নি। তোমার মা’কেও খুলতে নিষেধ করেছি। আমি জানি এটা তোমার হাতে পড়বেই। ক্ষমা করে দিও বাবা, তোমাদের জন্য একটা পতাকা আর একটা ভূখণ্ড দিলেও তোমাদের আর্থিক ও সামাজিক নিরাপত্তা দিতে পারিনি আমরা। ভালো থেকো, নিরাপদে থেকো।

 

ইতি

তোমার

বাবা

অনুলিখন: সায়েদুল আরেফিন


Share It
  • 275
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    275
    Shares

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here