রোহিঙ্গা সংকট: কান্নার ৩৬৫ দিন, দেশে ফেরার আকুতি

Share It
  • 3
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    3
    Shares

রাখাইন রাজ্যে মিয়ানমার বাহিনীর নিধনযজ্ঞ শুরুর বার্ষিকীতে শনিবার কক্সবাজারের বিভিন্ন ক্যাম্পে বিক্ষোভ করেন হাজার হাজার রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ। এ সময় বিচার চেয়ে তারা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। ছবিটি উখিয়ার কুতুপালং ক্যাম্পের- এএফপি

গত বছরের ২৫ আগস্ট থেকে মিয়ানমারের রাখাইনে নতুন করে শুরু হয়েছিল রোহিঙ্গাদের ওপর নিধনযজ্ঞ। কালো এই দিনটিকে গণহত্যা দিবস হিসেবে পালন করেছে কক্সবাজারের টেকনাফ ও উখিয়ায় আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গারা। দিনটি স্মরণে গতকাল শনিবার তারা মিয়ানমারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ সমাবেশ করেছে, নিপীড়নের বিচার চেয়ে স্লোগানে কাঁপিয়ে তুলেছে চারদিক। উদ্বাস্তু রোহিঙ্গারা দেশে ফিরে যাওয়ার আকুতি জানিয়েছে। এ জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সক্রিয় ভূমিকা চেয়েছে নিপীড়িত এই জনগোষ্ঠী।

গতকাল সকালে উখিয়ার কুতুপালং, বালুখালী, জামতলী, ময়নারঘোনা, ডি ফাইভ, কাঁঠালতলী এবং টেকনাফের শালবাগান ও নয়াপাড়া রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশের আয়োজন করা হয়।

সকাল থেকে দল বেঁধে কক্সবাজারের উখিয়া কুতুপালংয়ে রোহিঙ্গা নারী ও শিশুরা আসতে শুরু করে। এ সময় গাছে লাগানো বড় বড় ব্যানারে লেখা ছিল- ‘কান্নার ৩৬৫ দিন, এখন আমরা ক্ষুব্ধ’। পরে গণহত্যার বিচার চেয়ে রোহিঙ্গারা উখিয়া কুতুপালং বাজারে বিশাল মিছিল বের করে। বিক্ষোভ মিছিলে বৃদ্ধ, যুবক, নারী ও শিশুরা অংশ নেয়। তাদের মুখে ছিল একটাই ধ্বনি- ‘বিচার চাই, বিচার চাই।’

বিক্ষোভে অংশ নেওয়া রোহিঙ্গা নেতা মাওলানা হাবিব উল্লাহ বলেন, ‘আজকের এই দিনে রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা নিধনের জন্য গণহত্যা শুরু করেছিল সেনাবাহিনী ও মগরা। এখানে (উখিয়া-টেকনাফ) যারা আশ্রয় নিয়েছে, তাদের অনেকের ভাই, বোন, মা-বাবা বা আদরের সন্তান কেড়ে নিয়েছে মিয়ানমার সেনাবাহিনী। আমরা এই গণহত্যার বিচার চাই।’

বিক্ষোভে অংশ নেওয়া আমেনা খাতুন বলেন, ‘আরা একখান বছর হাইনদি, চোখর পানি ফুরাই গিয়েও, এহন ইনসাফ চাই (আমরা একটি বছর কেঁদেছি, ফলে চোখের পানি শেষ হয়ে গেছে, এখন আমরা বিচার চাই।’ মিয়ানমারের মংডু বড়গজবিল গ্রামের বাসিন্দা এই নারী সেনাবাহিনীর হাত থেকে প্রাণে বাঁচতে গত বছরের এই দিনে পাহাড়, জঙ্গল ও নাফ নদ পেরিয়ে এখানে আশ্রয় নেন। আমেনা বলেন, আজকের দিনটি রোহিঙ্গাদের জন্য বড়ই কষ্টের। গত বছরের এই দিন থেকে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ও মগরা রোহিঙ্গাদের গুলি ও গলা কেটে, নারী ও শিশুদের আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করেছে। তারা ধর্ষণ করার পর বহু নারীকে হত্যা করেছে। অনেককে গুম করে ফেলেছে, লুট করেছে সহায়-সম্বল। তিনি এই কালো দিনকে গণহত্যা দিবস ঘোষণা এবং দায়ীদের বিচারের দাবি জানান।

তিনি বলেন, ‘মানবাধিকার পেলে আমরা এখনই দেশে চলে যাব। তবে বলপ্রয়োগ করে আমাদের পাঠানোর চেষ্টা করা হলে আমরা যাব না। মিয়ানমার সরকার আমাদের দাবি মেনে নিলে আমরা যাব। নয়তো গুলি করে আমাদের এখানে মেরে ফেলা হলেও আমরা যাব না।’

টেকনাফের নয়াপাড়া রোহিঙ্গা শিবিরে সকালে কপালে কালো কাপড় বেঁধে হাতে ব্যানার ও ফেস্টুন নিয়ে মিছিল করেছে হাজারো রোহিঙ্গা নারী, শিশু ও পুরুষ। পরে তারা সেখানে সমাবেশ করেন। এ সময় রোহিঙ্গা নেতা নুরুল আমিন বলেন, ‘বাংলাদেশ সরকারের মাধ্যমে বিশ্বের কাছে এই গণহত্যার বিচার চাই। আমরা আর শরণার্থী জীবন চাই না। অধিকার নিয়ে বাঁচতে চাই আমরা। বিশাল রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে আশ্রয় দেওয়ার জন্য বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ‘মা’ সম্বোধন করেন তিনি।

আব্দুর রহিম নামের এক বিক্ষোভকারী বলেন, ‘আশ্রয় শিবিরে আজ আমাদের এক বছর পূর্ণ হলো। এখনও মিয়ানমারে নিরাপদ পরিবেশ তৈরি হয়নি। আমরা দেশে ফিরতে চাই। কিন্তু সেখানে যাওয়ার মতো পরিবেশ তৈরি না হলে আমরা কীভাবে যাব?’

রোহিঙ্গা যুবক সৈয়দ করিম বলেন, ‘এখানে খেতে পারছি, নিরাপদে থাকতে পারছি। তারপরও শরণার্থী জীবন ভালো লাগে না। এখানে উন্মুক্ত জায়গা নেই, খেলার মাঠ নেই। আমরা দেশে ফিরে যেতে চাই।’

প্রয়োজন আন্তর্জাতিক চাপ :উখিয়ায় বিক্ষোভ মিছিলে নেতৃত্ব দেওয়া কুতুপালং ক্যাম্পের সেক্রেটারি মোহাম্মদ নূর বলেন, ‘রোহিঙ্গাদের ওপর যে গণহত্যা, নিপীড়ন চালানো হয়েছে আমরা তার বিচার চাই। এ জন্য আন্তর্জাতিক মহলের সহযোগিতা দরকার। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে এখনও ফেরার মতো পরিবেশ নেই। তাই সেখানে নিরাপত্তা জোরদার করতে হবে। তারপর আমরা ফেরত যাব।’

রোহিঙ্গা নেতা ফয়জুর বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও জার্মানির মতো ক্ষমতাধর দেশগুলো যদি চায় তাহলে আমরা ন্যায়বিচার পাব। সারাবিশ্বই এখন জানে মিয়ানমার সরকার আমাদের ওপর কী ধরনের নির্যাতন করেছে। আমরা আশা করি বিশ্ববাসীও বিচারের দাবি তুলবে।’

টেকনাফের লেদা রোহিঙ্গা শিবিরের চেয়ারম্যান আবদুল মতলব জানান, রাখাইনে মংডুর কেয়ারিপালং, বড় গববিল ও বুড়া সিকদারপাড়া গ্রামে এখনও কিছু রোহিঙ্গার ঘর রয়েছে। সেখানে এখনও ‘আরসা’ (কথিত রোহিঙ্গা জঙ্গি) ঢুকেছে অভিযোগ তুলে সেনাবাহিনী অভিযান চালিয়ে থাকে। তবে ‘আরসা’ নামটি মিয়ানমারের তৈরি। এক বছরেও কি কেউ ‘আরসা’ দেখেছে, কেউ আটক হয়েছে? রোহিঙ্গাদের নির্মূল করতে সেনাবাহিনী ‘আরসা’কে জীবিত রাখছে। রাখাইনে যেসব গ্রামে রোহিঙ্গারা রয়ে গেছে, সেনারা সেখানে আরসা খোঁজার নামে এখনও অভিযান চালাচ্ছে। ফলে এখনও সেখানে ফেরত যাওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়নি।

উখিয়ায় মাথায় লাল ফিতা বেঁধে বিক্ষোভ : গণহত্যার বিচার চেয়ে ও নিরাপদে নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার দাবি জানিয়ে উখিয়ার কুতুপালং বাজারের সামনের প্রধান সড়কে মাথায় লাল ফিতা বেঁধে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছেন রোহিঙ্গারা। কুতুপালং ক্যাম্পের ব্লক-৩-এ বিক্ষোভ সমাবেশে রোহিঙ্গা নেতারা বলেন, বাংলাদেশ সরকারকে ধন্যবাদ আমাদের আশ্রয় দেওয়ার জন্য। কিন্তু আমরা কতদিন এ দেশে থাকব? আমরা দিনে দিনে এ দেশের বোঝায় পরিণত হচ্ছি। তাই আমরা ফিরে যেতে চাই। আন্তর্জাতিক মহলকে অনুরোধ, মিয়ানমারের ওপর চাপ প্রয়োগ করুন, যাতে সরকার দ্রুত আমাদের ফিরিয়ে নেয়।

বিক্ষোভ মিছিলে থাকা মো. আইয়ুব বলেন, আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্যই আমরা আজকের এই বিক্ষোভ করেছি। আমরা যুদ্ধ চাই না, শান্তি চাই। নিজ দেশে ফিরে যেতে চাই। সে জন্য আন্তর্জাতিক মহলের সহযোগিতা চাই। আমরা দোষীদের বিচার চাই।

বিক্ষোভ সমাবেশে বক্তব্য দেন রোহিঙ্গা নেতা শামশুল আলম, মনজুর, সিরাজুল মোস্তাফা, নুরুল ইসলাম, মো. রফিক, মাস্টার আবুল কালাম, মাস্টার তাহের, শামসুল আলম প্রমুখ।

এ বিষয়ে উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. নিকারুজ্জামান চৌধুরী বলেন, নিরাপদ প্রত্যাবাসন, মিয়ানমারে নাগরিকত্ব প্রদান ও গণহত্যার বিচারের দাবিতে রোহিঙ্গারা শান্তিপূর্ণভাবে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছে।


Share It
  • 3
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    3
    Shares

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here