সংকটে মার্কেটিং – ২ অধ্যাপক ড. মীজানুর রহমান    

Share It
  • 6
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    6
    Shares

সব মন্দা একরকম হয় না। বাজার মোকাবেলার কৌশলও একরকম হবে না। স্বাভাবিক সময়ে বাজারীরা তাদের উদ্ভাবন ও বিজ্ঞাপন দিয়ে পৃথিবীটাকে বদলাতে চায়। সংকটকালে বাজারীরা নিজে বদলে নতুন “নরম্যাল” এর সাথে খাপ খাওয়াবে। করোনা সৃষ্ট সংকট আমাদের অর্থনীতিতে দীর্ঘায়িত হবে, এটা নিশ্চিত করে বলা যায়। WHO -এর বিশেষজ্ঞ মাইক রায়হান যেমনটি বলেছেন, টিকা দিয়ে এই ভাইরাস সম্পূর্ণ নির্মূল হবে না। হামের টিকা দেয়া হচ্ছে হাম নির্মূল হয়নি, এইচআইভি এর টিকা আবিষ্কার হয়নি। করোনার সাথেই আমাদের অনেকদিন থাকতে হবে, তবে বিশ্ব মহামারী আকারে বেশি দিন থাকবে না, যা থাকবে মহামারীর কারণে সৃষ্ট মন্দা। তবে মন্দাও কোন অর্থনীতিতে দীর্ঘস্থায়ী হয় না। প্রত্যেকটি মন্দার তিনটি স্তর থাকে– প্রাথমিক বিক্রয় কমে যাওয়া , ধীরে ধীরে বিক্রয় ফিরে আসা, এবং ঘুরে দাঁড়ানো অর্থাৎ প্রবৃদ্ধি। মন্দার প্রভাব নির্ভর করে বাজার পতনের গভীরতার উপর এবং স্বাভাবিক অবস্থায় আসতে কত সময় লাগে তার উপর। এ মুহূর্তে আমরা অতল পড়তির দিকে আছি। কোথায় গিয়ে ঠেকবে তাও বলা যাচ্ছে না। বাজারজাতকরণের সাথে সংশ্লিষ্টরা এ সময় হাত গুটিয়ে বসে থাকলে মন্দার ক্ষতের গভীরতা আরো বাড়বে। এখনই টিকে থাকার ভিত্তি তৈরি করতে হবে যার উপর কোম্পানি দাঁড়িয়ে থাকবে। ব্যাপক খরচ কমিয়ে নগদ টাকা সংরক্ষণ করার নীতি কোম্পানির পতনের গর্তকে গভীর করবে। খরচ কমিয়ে স্বল্পমেয়াদে কিছু অর্থ সাশ্রয় করা গেলেও মহামারী কেটে গেলে এর ফল হিতে বিপরীত হবে। মন্দা কালে খরচ না কমানো কোম্পানিগুলোর নিকট হারানো বাজার পুনঃদখল করার জন্য যে পরিমাণ ব্যয় করতে হবে তা মন্দা কালে খরচ বাঁচিয়ে সাশ্রয়ী অর্থের অনেক বেশি হবে। আগের ধাঁচে চলার অর্থ হচ্ছে কোম্পানি মন্দার ক্ষতের গভীরতা কমানোর জন্য বিনিয়োগ করছে না। মনে রাখতে হবে প্যারাসুটধারী যাত্রীরাই কেবল আকাশে ক্রাশ করা উড়োজাহাজ থেকে জায়গা মতো নামার চেষ্টা করতে পারবে। ক্রেতা গতকাল যা কিনতো আজ বা আগামীকাল তা কিনবে না। ক্রেতার বর্তমান ও ভবিষ্যৎ চাহিদার সাথে সংগতি রেখে উদ্ভাবনই বাঁচাতে পারে কোম্পানিকে।

করোনা পরবর্তী কালে ভোক্তারা দরিদ্র হয়ে যাবে অথবা তাদের মধ্যে দারিদ্র্যের অনুভূতি চলে আসবে। তারা অনেক ভেবেচিন্তে খরচ করবে। এই সময় বাজারীকে ক্রেতাকে অভয় দিয়ে বলতে হবে, ‘চলুন আমরা একসাথে মিলে সময়টা পাড়ি দেই’।
মন্দার সময় ক্রেতার সাথে থেকে পরিস্থিতি মোকাবেলাই হবে বাজারজাতকারীর একমাত্র উপায়। সাশ্রয়ী দামে যে কোম্পানি অনাড়ম্বর কিন্তু গুনে ভালো (গুড-ভ্যালু) এমন পণ্য বিক্রি করবে তারাই মন্দার সময় ভালো করবে। ন্যূনতম বিজ্ঞাপন দ্বারা সমর্থিত স্বল্প দামের পণ্যগুলো তাদের বাজার অংশ ধরে রাখতে পারবে। মধ্য আয়ের বাজার খণ্ডকে টার্গেট করা কোম্পানিগুলো এসময়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
বাজারজাতকারীকে করোনা পরবর্তী দীর্ঘ মন্দা অর্থনীতির জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে। মনে রাখতে হবে গতি কমানো যাবেনা বরং সিট বেল্ট বেঁধে গতি বাড়াতে হবে। ক্রেতা বাজার থেকে কোন কিছু কিনেই ক্রয়কৃত পণ্য থেকে প্রাপ্ত সুবিধা মূল্যের সাথে টালি করে দেখবে। অনেক ক্রেতাই ভালো সময়ে এমন অনেক কিছু কেনে যা বছরের পর বছর ঘরেই পড়ে থাকে (যেমন ডিনার সেট, দামি বেড কভার) তারা হুজুগে পড়ে, চোখের ভাল লাগা বা অন্যের ক্রয়ে ঈর্ষান্বিত হয়ে বা প্ররোচিত হয়ে এমন পণ্য কিনে যা জীবনে এক দুই বার ব্যবহার করে অথবা কোনদিনই ব্যবহার করে না। এ ধরনের পণ্যের ক্রয় কমে যাবে। মন্দার সময় বাজার গবেষণার খরচ না কমিয়ে বরং বাড়াতে হবে। কোম্পানিকে জানতে হবে মন্দার সময় ভোক্তা কিভাবে ‘ভ্যালু’ কে পুন:সংজ্ঞায়িত করছে। কিভাবে ক্রেতার মূল্য স্থিতিস্থাপকতা রেখা পরিবর্তিত হচ্ছে। ক্রেতারা স্থায়ী পণ্য ক্রয় যাচাই-বাছাইয়ে বেশি সময় নেবে এবং দরকষাকষি করবে, ক্রয় বাতিল অথবা বিলম্বিত করবে অথবা পরিমাণে কম কিনবে। পণ্যের যে অতিরিক্ত বৈশিষ্ট্য (অগমেন্টেড প্রোডাক্ট )তাকে পুলকিত করতো মন্দার সময় সে এগুলো বাদ দিয়ে মৌলিক পণ্য পেতে চাইবে। বাজারে সুনামধারী কোম্পানিগুলো নতুন ব্র্যান্ড ছাড়তে পারে। তবে এক্ষেত্রে হঠাৎ উড়ে ধপ করে নিভে যাওয়ার (ফ্যাড) সম্ভাবনা আছে। ভোক্তার আগ্রহ স্থায়িত্ব নাও পেতে পারে।
করোনার কালে লকডাউন ও হোম কোয়ারান্টাইনের কারণে শহুরে ক্রেতারা পরিবারমুখি হবে ৪০ দিন কোন জীবন ধাঁচ টানা মেনে চললে সেটা অনেকেরই কিছুকালের জন্য হলেও অভ্যাসে পরিণত হয়ে বলে অনেক সমাজবিজ্ঞানী মনে করেন। তাই করোনা উত্তর বাজারে ক্রয় কালে পরিবার প্রাধান্য পাবে। সামাজিক দূরত্ব এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যবিধি মেনে রেস্টুরেন্ট চালাতে হবে। তখন রেস্টুরেন্টে বসে খাওয়ার চেয়ে বাড়িতে নিয়ে পরিবারের সাথে খাওয়ার প্রবণতা বাড়বে। তখন কেএফসি বা বার্গার কিং এর ফ্যামিলি প্যাকের জনপ্রিয়তাও বাড়বে। স্বাস্থ্যবিধি মানতে গিয়ে অনেক রেস্টুরেন্টের দরজা বন্ধ করে জানালা খুলতে হবে ‘থ্রো ওয়ে’ বিক্রির জন্য।
এসময়ে বিজ্ঞাপন খরচ কমানো যাবে না। মন্দার সময় বিজ্ঞাপন কমিয়ে ভালো ফল পাওয়া যায় না। কেউ কেউ এসময়ে বিজ্ঞাপন বাড়িয়ে প্রতিযোগীর বাজার অংশ দখল করে নিবে। এসময়ে বহিরাঙ্গন বিনোদন অপেক্ষা ভোক্তারা ঘরেই বেশি সময় কাটাবে এবং টেলিভিশন ও সোশ্যাল মিডিয়ার প্রতি বেশি নজর দিবে। তাই এসময়ে কম খরচে বিজ্ঞাপনের বার্তা নিয়ে সহজেই ক্রেতার নিকট পৌঁছানো যাবে। এসময়ে মিডিয়াগুলো আর্থিক টানাটানির মধ্যে থাকে বিধায় কম খরচে বিজ্ঞাপন প্রচারের জন্য তাদেরকে সহজে রাজি করানো যায়। বিজ্ঞাপনের দৈর্ঘ্য কমিয়ে পৌনঃপুনিকতা বাড়ানো যায়।
কোম্পানিগুলোকে তাদের প্রত্যেকটা পণ্যের বিক্রয় পূর্বাভাস পুনঃবিবেচনা করতে হবে। কারণ ক্রেতারা পণ্যের অতিরিক্ত অপশনগুলো বাদ দিয়ে মৌলিক পণ্যের দিকে ঝুঁকবে। যে পণ্যের বহু ব্যবহার আছে ক্রেতা সেটা পেতে চাইবে । কম্বাইন্ড হারভেস্টার দিয়ে ধান কাটা ও মাড়াই করা যায় কিন্তু পাওয়ার টিলার এর সাথে হারভেস্টার যুক্ত করে দিলে পাওয়ার টিলারের চাহিদা বাড়বে, কারণ পাওয়ার টিলার দিয়ে কৃষক ইতিমধ্যেই অনেকগুলো কাজ করে।
মুদি পণ্যের জাতীয় ব্র্যান্ডগুলোর কিছু জায়গা দখল করবে বিক্রয়কারী দোকানদারের নিজস্ব ব্র্যান্ড । অবস্থা এমন দেখা গেলে জাতীয় ব্র্যান্ডের কোম্পানিগুলো বস্তায় ভরে বাল্ক হিসেবে বাজারে পণ্য ছাড়তে পারে। এক্ষেত্রে স্থানীয় বিক্রেতা তার দোকানের নামে পণ্য প্যাকিং করবে। এই প্রক্রিয়ায় ব্র্যান্ডকৃত পণ্য বিক্রয় কারী কোম্পানির বিজ্ঞাপন ও বিতরণ খরচ কমবে, একই সাথে তার জাতীয় ব্র্যান্ডের বিক্রিও কমে যাবে। এই অবস্থাটা জাতীয় ব্র্যান্ডের জন্য মন্দের ভালো কারণ জাতীয় ব্র্যান্ডের পণ্য বাল্ক আকারে পাওয়া না গেলে বিদেশি পণ্য বা প্রতিযোগীর খোলা ও অপ্যাকেটকৃত পণ্য দিয়ে দোকানিরা নিজস্ব ব্র্যান্ডিং শুরু করলে অবস্থা আরো খারাপ হবে।
শিল্পপণ্যের ক্রেতারা পণ্য ও সেবা আলাদা করে পেতে চাইবে । মূল্যও আলাদাভাবে নির্ধারণ করতে চাইবে। পুরোনো ক্রেতারা সেবা বাদ দিয়ে কেবল শিল্প পণ্যটি পেতে চাইবে কারণ পুরনো ব্যবহারকারীরা নিজের অভিজ্ঞতা দিয়ে পণ্যটি ব্যবহার করতে চাইবে।
দৃষ্টি আকর্ষনী (gimmick) উপাদানের চেয়ে নির্ভরযোগ্যতা, স্থায়িত্ব, নিরাপত্তা এবং কার্যসম্পাদন বেশি গুরুত্ব পাবে। ক্রেতাদের নতুন বাস্তবতা অনুধাবন করে যারা নতুন পণ্য বাজারে নিয়ে আসবে তারা প্রতিযোগীর উপর চাপ তৈরিতে বেশি সমর্থ্য হবে। এ সময় পণ্যের মূল্য এবং কার্যসম্পাদন যোগ্যতার প্রতি বেশি নজর দিতে হবে। মন্দার সময় “কর্পোরেট ইমেজ” পৃথকীকরণের হাতিয়ার হিসাবে তেমন কার্যকর থাকে না।
মন্দার সময় কোন বিতরনকারী অতিরিক্ত পণ্য মজুদ করে বেশি ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল আটকাতে চাইবেনা। দ্রুত ক্রয় করলে, বেশি পরিমাণে ক্রয় করলে বা প্রোডাক্ট বান্ডেল (ধীরে চলা ও দ্রুত চলা পণ্যের মিশ্রণ ) ক্রয় করলে, বিশেষ আর্থিক প্রণোদনা দিয়ে বিতরণ কারীর গুদামে বেশি পণ্য ঢুকানো যেতে পারে। বাজারে নতুন আসা পণ্যের ক্ষেত্রে এই কৌশল ফলপ্রসূ হতে পারে। তবে সুনামবিহীন যেনতেন চ্যানেলে পণ্য মজুদের চেষ্টা করলে ব্র্যান্ড ইমেজ ক্ষুন্ন হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তবে অদক্ষ বিতরণ কারীদের সাথে সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন করার এটাই মোক্ষম সময়। অদক্ষ কোম্পানির দক্ষ এবং ভালো চাকরি হারানো বিক্রয়কর্মীদের নিজের কোম্পানিতে টানার ভালো সময় হচ্ছে মন্দা কাল। আর্থিক টানাটানিতে থাকা ক্রেতাদের কিস্তিতে মূল্য পরিশোধের সুযোগ দেয়া যেতে পারে। ছোট প্যাক মিনিপ্যাক ছেড়েও এ ধরনের ক্রেতাদের ধরে রাখা যেতে পারে। সাশ্রয়ী জ্বালানি, উন্নত প্রযুক্তি, ভিন্ন কাঁচামাল ব্যবহার করে ব্যবসায়ের খরচ কমিয়ে পণ্যের মূল্য কাঠামো সমন্বয় করে বাজার অংশ ধরে রাখার চেষ্টা করতে হবে। এ সময় মূল্য নীতির উদ্দেশ্য হওয়া উচিত বাজারে টিকে থাকা এবং বাজারের অংশ ধরে রাখা। এসিআই কনজিউমার ব্র্যান্ডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ আলমগীর যেমনটি বলেছেন,-” টিকে থাকলে মুনাফা হবে”। করোনা লক ডাউন এর সময় এসিআই তার ভোগ্য পণ্যের দাম কেজি বা লিটারপ্রতি ৪/৫ টাকা করে কমিয়ে দিয়েছে।
সবশেষ কথা হচ্ছে কোম্পানির প্রধান নিবার্হীকে তার ক্রেতা ও কর্মচারীসহ অন্যান্য স্টেকহোল্ডারদের প্রতি অধিক মনোযোগী হতে হবে।
লেখক-
অধ্যাপক ড.মীজানুর রহমান স্যার 
উপাচার্য 
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।

Share It
  • 6
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    6
    Shares

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here