সাড়ে তিন বছর ধরে প্রশাসক দিয়ে চলছে মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিল। সারাদেশে মুক্তিযোদ্ধাদের এ সংগঠনের নেতৃত্বে রয়েছেন জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তারা (ইউএনও)। মুক্তিযোদ্ধা সংসদের নির্বাচিত কমিটির মেয়াদ শেষ হওয়ায় ২০১৭ সালে কেন্দ্রীয়, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে প্রশাসক নিয়োগ দেয় মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়। ফলে এ নিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে ক্রমেই অসন্তোষ দানা বাঁধছে। নির্বাচনের দাবিও জোরালো হচ্ছে। মুক্তিযোদ্ধাদের অভিযোগ, অনেক ডিসি এবং ইউএনও তাদের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করেন না। তাছাড়া মুক্তিযোদ্ধা হয়েও তাদের তুলনায় অনেক কম বয়সী এবং নবীন কর্মকর্তাদের সঙ্গে নিজেদের সুবিধা-অসুবিধা নিয়ে কথা বলতেও তারা আগ্রহী নন। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় বলছে, আইনি জটিলতায় মুক্তিযোদ্ধা সংসদের নির্বাচন যথাসময়ে করা যায়নি। তবে এখন আইনগত কোনো সমস্যা নেই। শিগগির নির্বাচন আয়োজনের উদ্যোগ নেওয়া হবে। মুক্তিযোদ্ধা সংসদ পরিচালনায় ডিসি ও ইউএনওর কর্তৃত্বের সমালোচনা করে বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী গোলাম দস্তগীর গাজী বীরপ্রতীক বলেন, ‘দেশে মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্সগুলোতে দীর্ঘদিন ধরে তালা ঝুলছে। এর চাবি থাকে অন্য লোকজনের হাতে। আমরা মুক্তিযুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছি। মুক্তিযোদ্ধা সংসদও আমরাই করেছি। মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্সের চাবি থাকবে আমাদের কাছে। কেন আমাদের কাছে সেই চাবি নেই? এটি মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য অত্যন্ত অপমানজনক। ‘
তিনি আরও বলেন, সারাদেশে গত চার বছর ধরে মুক্তিযোদ্ধা সংসদের নির্বাচন হচ্ছে না। মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডাররা প্রাক্তন হয়ে আছেন। মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে কোনো ক্ষমতা নেই। জেলাগুলোতে মুক্তিযোদ্ধা সংসদ পরিচালনা করছেন সরকারি কর্মকর্তারা।

মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিলের সর্বশেষ চেয়ারম্যান ছিলেন মেজর জেনারেল (অব.) হেলাল মোর্শেদ খান বীরবিক্রম।

২০১৭ সালের ৮ জুন তার নেতৃত্বাধীন কমিটির (২০১৪) মেয়াদ শেষ হয়। পরে হাইকোর্টের নির্দেশে ওই বছরের ১৯ জুলাই কেন্দ্রীয়, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে পৃথক প্রশাসক নিয়োগ করে সরকার।

মুক্তিযোদ্ধা সংসদের নির্বাচন প্রসঙ্গে হেলাল মোর্শেদ খান বলেন, বঙ্গবন্ধুর আদর্শের ভিত্তিতে মুক্তিযোদ্ধাদের কল্যাণে সংগঠনটি গড়ে তোলা হয়েছিল। স্বাধীনতার পর থেকে মুক্তিযোদ্ধারাই এর নেতৃত্ব দিয়েছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলো এ সংগঠনটি গত সাড়ে তিন বছর ধরে সরকারি আমলা অর্থাৎ প্রশাসক দিয়ে চলছে। এ জন্য মন্ত্রণালয় ও জামুকা দায়ী। তারা অযাচিত হস্তক্ষেপ করছে। নির্বাচন ঠেকিয়ে রেখেছে। বারবার বলার পরও মন্ত্রণালয় মুক্তিযোদ্ধা সংসদের নির্বাচনের উদ্যোগ নিচ্ছে না।

এ বিষয়ে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক বলেন, মুক্তিযোদ্ধাদের অভিযোগ অমূলক নয়। আসলে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের দিয়েই সংসদ চলার কথা। এখন ডিসি-ইউএনওরা দায়িত্বে থাকায় মুক্তিযোদ্ধারা তাদের সমস্যাগুলো মন খুলে বলতে পারছেন না। আবার ডিসিসহ সংশ্নিষ্টদেরও একশ একটা কাজ থাকে। তারাও চাইলে মুক্তিযোদ্ধাদের কথা মন খুলে শুনতে পারেন না। এসব কারণে সমস্যা হচ্ছে। এ সংকট সমাধানে নির্বাচিত মুক্তিযোদ্ধাদের হাতেই সংসদের ক্ষমতা থাকা বাঞ্ছনীয়। তিনি আরও বলেন, ‘আমরা চেষ্টা করছি জানুয়ারিতে নির্বাচন আয়োজনের জন্য। ইতোমধ্যে ভোটার তালিকা প্রণয়নের কাজ শুরু হয়েছে।’

জানা গেছে, মুক্তিযোদ্ধা সংসদের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী কার্যনির্বাহী কমিটির মেয়াদ ছিল তিন বছর। কিন্তু মেয়াদ শেষ হওয়ার কয়েক মাস আগে ২০১৭ সালে হেলাল মোর্শেদ খানের নেতৃত্বাধীন কমিটি গঠনতন্ত্র সংশোধন করে তাদের মেয়াদ ৫ বছর করার জন্য প্রস্তাব চূড়ান্ত করে। এভাবে নির্বাচিত কমিটি তাদের নিজেদের মেয়াদ বাড়ানোয় ক্ষোভ জানিয়ে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা থেকে মন্ত্রণালয় ও জামুকায় অভিযোগ করেন মুক্তিযোদ্ধারা। এরপর বিষয়টি চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে একটি রিটও করেন কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা।

মেয়াদ বাড়ানোর ইস্যুতে মুক্তিযোদ্ধা সংসদের নেতৃত্ব নিয়ে দেশব্যাপী অচলাবস্থা তৈরি হয়। মুক্তিযোদ্ধাদের পাল্টাপাল্টি অবস্থানের মধ্যে ওই বছরের ১২ জুলাই হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ প্রশাসক নিয়োগের আদেশ দেন। এরই ধারাবাহিকতায় মন্ত্রণালয় থেকে একই বছরের ১৯ জুলাই সংসদ পরিচালনার জন্য পৃথক প্রশাসক নিয়োগের অফিস আদেশ জারি করে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়। দেশে বর্তমানে মুক্তিযোদ্ধা সংসদের একটি কেন্দ্রীয় কমান্ড, ৭টি মহানগর কমান্ড, ৬৪টি জেলা ও ৪৭০টি উপজেলা কমান্ড কাউন্সিল রয়েছে। এর নেতৃত্বে এখন ডিসি ও ইউএনওরা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here