১৫ বছর ধরে নরসুন্দর পেশায় শেফালী রানী

Share It
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

প্রতিদিন সকালে শেফালী যন্ত্রপাতি নিয়ে হাজির হন দোগনা বাজারে। সেখানে এক প্রবাসীর ঘরের বারান্দায় তিনি নরসুন্দরের কাজ করেন। তাঁর কাছে তরুণ-যুবকরা নিজেদের রুচি অনুযায়ী চুল কাটাচ্ছে। সামান্য আয়ে এখনো অভাব-অনটন কাটেনি শেফালীর। তাঁর স্বপ্ন, আর্থিক সহায়তা মিললে তিনি দোগনা বাজারে একটি আধুনিক সেলুন দেবেন।

স্থানীয় সূত্র জানায়, পঞ্চম শ্রেণিতে পড়া অবস্থায় শেফালী রানী শীলের বিয়ে হয়। স্বামী বিশ্বনাথ শীলের দোগনা বাজারে সেলুন ছিল। অন্যের চুল-দাড়ি কেটে স্বামী যা আয় করতেন, তা দিয়ে কোনো রকম চলে যেত তাঁদের সংসার। একে একে তাঁদের ঘরে জন্ম নেয় চার মেয়ে ও এক ছেলে। পনের-যোলো বছর আগে জটিল রোগে আক্রান্ত হন স্বামী বিশ্বনাথ। বন্ধ হয়ে যায় শেফালীর সংসারের চাকা। নিজের চিকিত্সা ও সংসারের খরচ চালাতে না পেরে নিরুদ্দেশ হয়ে যান বিশ্বনাথ। এরপর শুরু হয় শেফালীর সংগ্রামী জীবন। বর্তমানে তাঁর মেজো মেয়ে বিথিকা বিএ তৃতীয় বর্ষে পড়ছে। অন্য ছেলে-মেয়েরাও পড়ালেখা করছে।

স্থানীয়রা জানায়, নারী হয়েও শেফালীর পুরুষের চুল-দাড়ি কাটার কাজ অনেকে মেনে নিতে পারেনি। ওই সময় খুবই বিব্রতকর অবস্থায় পড়েন তিনি। গ্রামের কয়েকজন ব্যক্তির হস্তক্ষেপে সেই বাধা দূর হয় তাঁর। ১৫ বছর ধরে জীবিকার জন্য সংগ্রাম করে যাচ্ছেন শেফালী রানী। এরই মধ্যে মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর থেকে তাঁকে জয়ীতা সম্মাননা দেওয়া হয়েছে। তবে শেফালী রানী এখন পর্যন্ত সরকারি কোনো আর্থিক সহায়তা পাননি।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ছোট একটি টিনশেড ঘরের বারান্দায় শেফালী রানীর সেলুন। ঘরের মালিক সৌদিপ্রবাসী দেলোয়ার হোসেন। তাঁর স্ত্রী বিনা মূল্যে শেফালীকে সেলুন করার জন্য বারান্দাটি দিয়েছেন। সেখানে সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত একটানা চুল ও দাড়ি কাটার কাজ করেন শেফালী। দুপুরে বাড়ি গিয়ে খাবার খেয়ে আসেন বিকেল ৪টায়। সন্ধ্যা পর্যন্ত চলে চুল-দাড়ি কাটার কাজ। শিশু থেকে বয়স্করা ভিড় করেন শেফালীর সেলুনে। চুল-দাড়ি কেটে যে যা দিচ্ছে তাই নিয়ে সন্তুষ্ট শেফালী। কাউকেই তিনি ফিরিয়ে দেন না।

শেফালীর সেলুনে চুল কাটতে আসা স্থানীয় ব্যবসায়ী খলিলুর রহমান বলেন, ‘শেফালী না থাকলে আমাদের ভাণ্ডারিয়া উপজেলায় গিয়ে চুল ও দাড়ি কাটাতে হতো। আমরা গ্রামে বসেই এ কাজ করাতে পারছি। শেফালী চুল-দাড়ি কেটে ৫০ টাকা নেয়। শুধু শেভ করলে ২০ টাকায় হয়ে যায়।’

দোগনা গ্রামের যুবক রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘শেফালী দিদি মেসি, নেইমার, রোনাদলো, রক স্টাইলে চুলের কাট দিতে পারেন। এ ছাড়া অন্য কোনো চুল কাটের ছবি দেখালেও তিনি সেই ধরনের কাট দিতে পারেন। অল্প টাকায় শেফালী দিদি আমাদের চুল কেটে দেন। আমরা তাঁর কাছেই চুল কাটি।’

শেফালী রানী শীল বলেন, ‘আমি বর্তমানে প্রতিদিন ২০০ থেকে ৩০০ টাকা রোজগার করি। মাঝেমধ্যে খালিহাতেও ফিরতে হয়। তখন দোকানে দোকানে পানি টেনে কিছু টাকা পাই। এখান থেকে যা রোজগার হয়, তা দিয়ে পাঁচ ছেলে-মেয়ের লেখাপড়া ও সংসারের খরচ চালাচ্ছি। দুই মেয়ের বিয়ে দিয়েছি। এক মেয়ে বিএ পড়ে, অন্যরা স্কুলে পড়ালেখা করছে। একার আয়ে সংসার চলছে না। অন্যের জমিতে কোনো রকমে সন্তানদের নিয়ে বসবাস করছি। আমাকে একটি সেলুন ও বসতঘর তৈরি করে দিলে অন্তত বাকি জীবনটা ভালোভাবে চালিয়ে নিতে পারতাম।’

ঝালকাঠির সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক) সহসভাপতি হেমায়েত উদ্দিন হিমু বলেন, শেফালী রানীর মতো সাহসী নারীদের এগিয়ে নিতে প্রয়োজন সবার সহযোগিতা। সমাজের সব কাজেই এখন পুরুষের সঙ্গে নারী সমানতালে এগিয়ে যাচ্ছে, শেফালী রানী এর একটি বড় দৃষ্টান্ত


Share It
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here