কালীগঞ্জে বিএনপি নেতা নাজিমুদ্দিনের নেতৃত্বে খ্রিস্টান সংখ্যালঘু ৪ যুবকের উপর হামলা ও নির্যাতনের অভিযোগ

Share It
  • 150
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    150
    Shares

জেমস আব্দুর রহিম রানা, নিজস্ব প্রতিবেদকঃ কালীগঞ্জে বিএনপি নেতা নাজিমুদ্দিনের নেতৃত্বে সংখ্যালঘু খ্রিস্টান ৪ যুবকের উপর হামলা ও নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে। সংখ্যালঘু ৪ যুবকের উপর হামলা ও নির্যাতনের ঘটনায়, কালীগঞ্জ উপজেলার বান্দাখোলা গ্রামের নাজিমুদ্দিন (৫৫),হান্নান (৪৫) উভয় পিতা সামির হোসেন এই দুই ব্যাক্তিকে প্রধান আসামি করে কালীগঞ্জ থানায় একটি অভিযোগ দায়ের করেন আহত জেমস রোজারিওর পিতা-পরিমল রোজারিও। উক্ত ঘটনার অভিযোগের ভিত্তিতে গত ২১ মে সংবাদ প্রকাশ করা হয়।পরে ২২ মে বেলা ১২ টা সময় তুমিলিয়া ইউনিয়ন ছাত্রলীগ নেতা রাসেল তার ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে ব্যাক্তিগত মুঠো ফোন থেকে গণমাধ্যম কর্মী জ্যাকশন মাইকেল রোজারিওকে হুমকি প্রদান করেন। নেতা রাসেল হুমকি দিয়ে বলেন, জেমসকে মারধোর করার ঘটনার সংবাদ কেন প্রকাশ করলেন? এই সংবাদ প্রকাশের জন্য আপনার বড়রকমের ক্ষতি হবে বলেদিলাম।

পরে ২২মে সন্ধ্যায় নেতা রাসেল দড়িপাড়া গ্রামের স্বপন পালমার মাধ্যামে খবর পাঠায়। মারধোরের ঘটনা নিয়ে যদি আরও কোন সংবাদ প্রকাশ করা হয় তবে প্রয়োজনে ৫০০/৭০০ লোকজন নিয়ে দড়িপাড়া গ্রামে হামলা করা হবে। আর স্বপন পালমা দড়িপাড়া গ্রামের ৪৫জন লোকের সামনে এইসব খবর প্রকাশ করেন। গত ২১মে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায় ভুক্তভোগী জেমস রোজারিও গুরুতর ভাবে আহত হয়েছে। তার মাথায় আঘাতের চিহ্ন একই সাথে তার পিঠর সমস্ত জায়গা জুড়ে রক্ত জমাট বাধা মারাত্নক আকারের আঘাতের চিহ্ন দেখা গেছে। জেমসের মুখ থেকে ঘটনার বিবরণ জানতে চাইলে সে কথা বলতে পারছিলোনা। সেখানে উপস্থিত প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছিল জেমস কিভাবে কথা বলবে? নাজিমুদ্দিনের বাড়িতে নিয়ে জেমসের গলায় পা চেপে ধরে রেখেছিল সন্ত্রাসীরা। তার পর থেকে জেমস কথা বলতে পারছেনা। এদিকে জেমসকে উদ্ধার করতে গিয়ে সন্ত্রাসী আক্রমণের শিকার হয় কলিন্স রোজারিও, লেকসন রোজারিও এবং কেনিডি রোজারিও।

কলিন্স রোজারিওর বাম হাত ও বাম পা ভেঙ্গে গেছে শরিরের বিভিন্ন স্থানে আঘাতের চিহ্নও দেখা গেছে।লেকসন এবং কেনিডির শরিরেও আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। ভুক্তভোগী কলিন্স রোজারিও বলেন। আমার কাকাতো ভাই জেমসকে মারধোর করা হচ্ছে,খবর পেয়ে আমি সহ আমার কাকাতো ভাই লেকসন এবং কেনিডিকে নিয়ে জেমসকে উদ্ধার করার জন্য ঘটনাস্থলে যাই।পরে আমি নাজিমুদ্দিন, হান্নান এবং ওইখানে যারা জেমসকে মারধোর করছিল তাদের বুঝানোর চেষ্টা করি।কিন্তু তারা আমাকেও সন্ত্রাসী কায়দায় মারধোর করে।হান্নান ক্রিকেট খেলার বেট দিয়ে মেরে আমার হাত ভেঙ্গে দেয় এবং নাজিমুদ্দিন আমার শরিরে বিভিন্ন স্থানে ক্রিকেট খেলার স্টাম্প দিয়ে আঘাত করে এক পর্যায়ে আমার বাম পায়ে জোড়ে আঘাতের ফলে পা ভেঙ্গে যায়।এই পাশবিক সন্ত্রাসী কার্যক্রমে আরও বেশ কয়েকজন জড়িত রয়েছে নাজিমুদ্দিন ও হান্নানকে ধরলেই সব জানতে পারবেন। আমার কাকাতো ভাই কেনিডি, লেকসনও বাদ পড়েনি এই বর্বর নির্যাতনের হাত থেকে।আমি পারিনি জেমসকে রক্ষা করতে !

নাজিমুদ্দিন,হান্নান ও তাদের দলবল খেলার মাঠ থেকে জেমসের কোমড়ের বেল্টে ধরে টেনে হিচড়ে নিয়ে যায় নাজিমুদ্দিনের বাড়িতে। এই ঘটনার সূত্রপাত মূলত জেমস রোজারিও সাথেই।তাই আহত জেমস রোজারিও কিছুটা সুস্থ হওয়ার পর পূনরায় কথা হয় গণমাধ্যম কর্মীদের সাথে। জেমস রোজারিও গণমাধ্যম কর্মীদের বলেন আমি ১৯ মে মঙ্গলবার বিকাল ৪টা সময় দড়িপাড়া সেন্ট ফ্রান্সিস জেভিয়ার প্রাইমারি স্কুলের উত্তর পাশে বিলের মাঠে খেলতে যাই।পরে খেলার মাঠ থেকে সৌরভ নামের এক যুবক তার দল-বল নিয়ে,আমার উপর আক্রমণ করে।আক্রমণের কারণ কি? জানতে চাইলে জেমস রোজারিও গণমাধ্যম কর্মীদের বলেন।আমার কাছে নাকি ইয়াবা আছে!এই সন্দেহে আমাকে মারধোর করে এবং আমার কাছ থেকে নগদ ৩ হাজার টাকা ও ২৬ হাজার টাকা মূল্যের একটি মোবাইল ফোন কেড়ে নেয় সৌরভ ও তার দল-বল।ঘটনার এক পর্যায়ে ওই স্থানে উপস্থিত হয় নাজিমুদ্দিন ও তার ভাই হান্নান এবং আমাকে উদ্ধার করার জন্য উপস্থিত হয়,আমার ভাই লেকসন রোজারিও এবং কাকাতো-জ্যাঠাতো ভাই কলিন্স রোজারিও, কেনিডি রোজারিও।

সৌরভ, নাজিমুদ্দিন, হান্নান সহ আরও অনেকে মিলে আমাকে মারধোর করে। সৌরভ, নাজিমুদ্দিন, হান্নান এদেরকে ধরলেই বাকি সন্ত্রাসীদের নাম বেরিয়ে আসবে আর নাজিমুদ্দিনই হচ্ছে আমাকে মারধোর করার মূলহোতা। ঘটনার প্রতক্ষদর্শীরা গণমাধ্যম কর্মীদের জানায়। জেমস, কলিন্স, লেকসন এবং কেনিডির উপর যে পৈচাশিক নির্যতন করা হয়েছে তা অমানবিক একটি কাজ। ১৯ মে জেমসের কোমড়ের বেল্টে ধরে টেনে হিচড়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল নাজিমুদ্দিনের বাড়িতে এবং সেখানে আরেক দফায় পিটানো হয় জেমসকে। জেমসের গলায় পা চেপে ধরে রেখেছিল সন্ত্রাসীরা পানি খেতে চেয়ে ছিল জেমস কিন্তু পানিটুকু পর্যন্ত দেওয়া হয়নি! প্রতক্ষদর্শীরা আরও বলেন।এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ওই দিন ১৯ মে রাত ৮ টা সময় তুমিলিয়া ইউনিয়নের ২নং ওয়ার্ড মেম্বার আলী হায়দার ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে দড়িপাড়া গ্রামের লোকজনকে হুমকি দিয়ে বলে। বান্দাখোলা ভাঙ্গা ব্রীজ ও পূবাইল ব্রীজ পার হয়ে যেতে দেওয়াহবেনা দড়িপাড়ার লোকজনকে।

এ কথা আলী মেম্বার স্বীকারও করেছে গণমাধ্যম কর্মীদের কাছে। উক্ত বর্ণিত ঘটনার রহস্য উদঘাটন করতে গিয়ে বেড়িয়ে আসে আরেক চাঞ্চল্যকর তথ্য।স্থানীয় লোকজনের তথ্য মতে,নাজিমুদ্দিন এলাকায় একজন পেশাদার অবৈধ সুদ ব্যাবসায়ী (সুদখোর)। নাজিমুদ্দিনের এই সুদের ফাঁদে পা দিয়ে, ইতোমধ্যে এলাকার অনেকেই পথের ফকির হয়েছে।এমনি একজন ভুক্তভোগী নিকলা গাজী নামের এক বৃদ্ধের সাথে কথা হয়। তিনি বলেন নাজিমুদ্দিনের কাছ থেকে আমি যে টাকা এনে ছিলাম, তা পরিশোধ করার পরেও নাজিমুদ্দিন আমার কাছে টাকা দাবি করে আসছে এবং আমাকে টাকা দেওয়ার সময় আমার কাছে থেকে যে ব্লাংক স্ট্যাম্প নিয়েছিল তা আমাকে ফেরৎ দেয়নি।এখন আমি নিরুপায় অবস্থায় আছি।এ ছাড়াও এলাকাবাসীর তথ্য মতে। নাজিমুদ্দিন তার দল-বল নিয়ে,গত কয়েকবছর আগে দড়িপাড়া গ্রামের মার্কেটর জমি দখল করার পায়তারা করেছিল। দড়িপার গ্রামের রাজু গমেজ নামের এক ব্যাক্তি বলেন।গত দুই বৎসর আগে নাজিমুদ্দিনের নেতৃত্বে ফারুক নামের এক ব্যাক্তি বেশকিছু লোকজন সথে নিয়ে,আমাকে মারধোর করে। পরে আমি আইনের আশ্রয় নিয়ে মামলা করি।মামলার রায় অনুযায়ী ফারুক ৬মাস জেল খেটেছিল।

পূর্বের এইসব ঘটনার কারণ দেখিয়ে জেমস রোজারিওর পরিবার ও এলাকাবাসী বলছে নাজিমুদ্দিন পূর্বের ঘটনাকে কেন্দ্র করেই জেমসের উপর এই অমানুষিক নির্যাতন চালিয়েছে। অভিযুক্ত আসামি নাজিমুদ্দিন গণমাধ্যম কর্মীদের কাছে বলেন। জেমস রোজারিওর কাছ থেকে ইয়াবা পাওয়া গেছে তাই এলাকার কিছু ছেলেপুলেরা জেমসকে মারধোর করছিল।তখন আমি আমার ভাই হান্নান ও কিছু লোকজন মিলে ঘটনার সমাধান করার চেষ্টা করেছি। এ বিষয়ে কথা হয় বিশিষ্ট এ্যাড: আবু তালেবের সাথে,তিনি বলেন। আইনকানুনের তোয়াক্কা না করে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া একটি অপরাধ।আইনি ব্যাখ্যা অনুযায়ী , একটি কর্মকাণ্ড তখনই ‘অপরাধ’ যখন তা আইন দ্বারা অপরাধ বলে ঘোষিত হয়।একই সঙ্গে সেই অপরাধের শাস্তি কি হবে আর সেই শাস্তি কিভাবে অপরাধীকে দেওয়া হবে সেই বিষয়েও আইনে বিস্তারিত উল্লেখ করা থাকবে। আইন অনুযায়ী কাউকে সন্দেহজনকমনে হলে, এমনকি অপরাধী হলেও আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর হাতে সোপর্দ করাই নিয়ম।নাগরিক দায়িত্বের অংশ হিসেবে অপরাধীকে পুলিশের হেফাজতে না দিয়ে,নিজ হাতে আইন তুলে নেওয়ার অধিকার কোন নাগরিকের নেই।নিজ হাতে আইন তুলে নেওয়া স্পষ্টত আইনের লঙ্ঘন ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ।জেমস রোজারিও যদি অপরাধ করেই থাকে তবে তাকে আইনের হাতে তুলে দেওয়া উচিৎ ছিল কিন্তু যা শুনেছি তাকে নির্মম ভাবে পেটানো হয়েছে সত্যিই তা অমানবিক।

তুমিলিয়া ইউপি চেয়ারম্যান আবু বকর বাক্কু বলেন।আমি গত ১৯ তারিখ ঘটনাটা শুনেছি যে,জেমসের কাছে নাকি ইয়াবা পাওয়া গেছে কিন্তু প্রকৃত পক্ষে এর প্রমাণ আছে কিনা আমি জানি না।তবে যারা জেমসকে মারধোর করেছে তারা আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে ঠিক করেনি। বাংলাদেশ খ্রিস্টান এসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট নির্মল রোজারিও বলেন। বর্তমান এই মহামারি করোনাকালীন সময়েও সংখ্যালঘুদের উপর নির্যাতন এটা খুবই দুঃখজনক।আমি বাংলাদেশ খ্রিস্টান এসোসিয়েশনের পক্ষ হতে, এই ঘটনার তিব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি।সংখ্যালঘু ৪ খৃষ্টান যুবকদের মারধোর করার ঘটনায় জড়িত অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানাচ্ছি।সেই সাথে আশা করি কালীগঞ্জ থানার ওসি ও মেহের আফরোজ চুমকি এমপি মোহদয় বিষয়টি আমলে নিয়ে এর সুবিচার করবেন। বাংলাদেশ হিন্দু মহাজোটের মহাসচিব এ্যাড: গোবিন্দ প্রামাণিক ও বিশিষ্ট মানবাধিকার কর্মী আশিষ কুমার অঞ্জন,সংখ্যালঘু ৪ খৃষ্টান যুবকদের উপর নির্যাতনের ঘটনায় তিব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন। সেই সাথে অপরাধীদের দ্রুত গ্রেফতারের দাবি জানিয়েছেন। কালীগঞ্জ থানার ওসি এ কে এম মিজানুল হককে ফোন করলে,তিনি এ ব্যাপারে পরে কথা বলবেন বলে জানিয়েছেন গণমাধ্যম কর্মীদের।

এখানে উল্লেখ্য থাকে যে, সমকাল পত্রিকায় প্রকাশিত ২ই জানুয়ারী ২০২০খ্রি: এক সংবাদ সম্মেলনের তথ্য অনুযায়ী ২০১৯ সালে সারাদেশে ৩১ হাজার ৫০৫ জন সংখ্যালঘু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। নয় হাজার ৫০৭ একর ভূমি জবরদখল করা হয়েছে।রাজধানীর সেগুনবাগিচায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি মিলনায়তনে, বাংলাদেশ জাতীয় হিন্দু মহাজোটের নেতারা সংবাদ সম্মেলনে এ-সব তথ্য প্রকাশ করেন।


Share It
  • 150
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    150
    Shares

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here