গল্প :’জাত শুদ্ধি’

Share It
  • 236
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    236
    Shares

লেখক:আসিফ ইকবাল আরিফ:

শ্রাবণ দিনের সারা রাত ধরে চলা তুমুল বৃষ্টি এখন একটু থেমেছে। একটু পরে মসজিদে ফজর নামাজের আযান হবে। মসজিদে যাওয়ার জন্য তড়িঘড়ি করে প্রস্তুত হয়েছে হাসু মুয়াজ্জিন। এই তো বছর দু’য়েক আগে হাসু মুয়াজ্জিনের বউ দুই ছেলে আর এক মেয়েকে রেখে ক্যান্সারে ভুগে মারা গিয়েছে। হাসু মুয়াজ্জিন তিন ছেলে-মেয়ের বাপ হলেও বয়স যে তার শেষ হয়ে গিয়েছে তা কিন্তু না। বয়স তার কেবল মাত্র পঞ্চাশের ঘরে পড়েছে। মৃত স্ত্রীর শোক না কাটলেও বছর খানেক পেরোতে না পেরোতে হাসু মুয়াজ্জিন আবার বিয়ে করেছে। হাসু মুয়াজ্জিনের বাড়ি একেবারেই নবগঙ্গা নদীর কিনারে কাঞ্চনাপুর গ্রামে। স্বামী-স্ত্রীর শেষ রাতের কাজ সেরেই হাসু কোনো কাকপক্ষী বা লোকজন দেখার আগেই অজু করে নদীতে ডুব দেয়। গোসল শেষ করে পাতলা সাদা পাঞ্জাবী আর মাথায় একটা তেল চুপচুপে টুপি পরে মসজিদের উদ্দেশ্যে বের হওয়ার প্রস্তুতি তার শেষ – ঠিক এমন সময়ে তার বউ একটি আঁশটে মাখা বটি হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলে এটাকে অন্ন কামারের কামার শালায় রেখে যেতে। সাঝ সকালে মাছের আঁশটে মাখা বটি দেখে হাসু মুয়াজ্জিনের মেজাজ খারাপ হলেও গিন্নির কিছুই করার ছিলোনা। সুতরাং ধার কাটানো যে আবশ্যক এটা হাসু বুঝতে পেরেছিলেন। “সকাল সকাল বেজাতের দূয়োরে ধর্ণা দিতে হবে” – এই কথা বিড় বিড় করে বলে বউকে ফরজ গোসলের আদেশ দিয়ে হাসু মুয়াজ্জিন আযান দিতে চলে যায়। বউকে সে নদীর ঘাটে যেতে দেয়না। ঘরে এবং ঘরের বাইরে পর্দা করা তার জন্য রীতিমত একশো চৌয়াল্লিশ ধারার আদেশের মত।

হাসু মুয়াজ্জিনের বাড়ির ঠিক পশ্চিম পাশে একেবারেই মসজিদের সাথেই দ্বিনু মুন্সীর বাড়ি। দ্বিনু মুন্সীর বাড়ি প্রায় দুই একর জমির উপর। বসত বাড়ি, বাগান আর ক্ষেত-ফসলীও আছে এখানে। দ্বিনু মুন্সীর বাড়িতেই অন্ন কামার নামের একজন থাকে। তার নাম আসলে অন্ন দাস হলেও তাকে সবাই অন্ন কামার নামেই চেনে।
এই অন্ন কামারের জীবন বিশাল এক জটালো সূতার পাকে জড়ানো। জীবন সমুদ্রের কত বাঁকের ঢেউ যে তার এই পয়ষট্টি বছর বয়সের জীবনকালে এসেছে তা বলে হয়তো শেষ করা যাবেনা। অন্ন কামারের প্রথম বউ মারা যায় অনেক আগে। অন্ন কামারের দুই ছেলে অরুণ আর বরুণ যখন অনেক ছোট ঠিক তখন। অরুণের বয়স তখন চার বছর আর বরুণের বয়স তখন সবে দুই বছর। তার প্রথম বউ ধরাশয় ত্যাগ করার এক বছরের মধ্যেই গ্রামের লোকজন আর আত্মীয় স্বজন তাকে বিয়ে করিয়ে দেয়। তবে ছয়মাস না পেরোতেই সাপের কাপড়ে তার দ্বিতীয়ও বউ ধরাধাম ছেড়ে চলে যায়।

অন্ন কামার একদিকে কামার শালা সামলায় আর অন্যদিকে অরুণ-বরুণকে মানুষ করে। দুই-চার বছর এইভাবে পার হতেই একদিন অরুণের মাসি মা অরুণকে পিসিমা আর বরুণকে নিয়ে যায়। দুই ভাই তাদের কাছেই বেড়ে উঠতে থাকে। অরুণ পরে স্বর্ণের দোকানে কাজ করে আর বরুণ এক সেলুনের কাজ শিখে নেয়। দুই ছেলেই মাঝে মাঝে বাবাকে দেখতে বঞ্চনাপুরে আসতো আবার অন্ন কামারও মাঝে মাঝে গিয়ে দেখে আসতো। বঞ্চনাপুর নবগঙ্গা নদীর উত্তর পাড় আর কাঞ্চনাপুর নদীর দক্ষিন ধার ঘেসে দাঁড়িয়ে আছে। বঞ্চনাপুরে নদীর ধারে বিশাল এক উচু ভিটে মাটিতে অন্ন কামারের বাড়ি আছে। টিনের চাল দিয়ে মাটির দেওয়ালের বাড়ি।

অনেকদিন অন্ন কামার একাই থাকতো। কিন্তু অরুণের বয়স যেই বিশ বা একুশ হলো তখন হঠাৎ একদিন বউ নিয়ে বঞ্চনাপুর আসে। অরুণ সেখানেই রীতিমত বসবাস করতে থাকে।

ছেলে যখন বউ নিয়ে ফিরলো তখন অন্ন কামারের মনে স্বস্তি ফিরলো। অন্তত রান্নার কাজ করার জন্য আর তার হাত লাগাতে হলোনা। এই ভাবেই বেশ কয়েক বছর চললো। অন্ন রীতিমত তার কামারশালার কাজ চালিয়ে যেতো। আর অরুণ যেহেতু স্বর্ণকারের কাজ শিখেছিলো অন্ন কামার তাকে এক স্বর্ণাকারের দোকানে কাজ ঠিক করে দিয়েছিলো। বছর দুই যেতে না যেতেই অন্ন কামারের কামারশালার রোজগার আর অরুণের কাজের টাকা দিয়ে সংসারের দায়-জ্বালা সামলে অরুণকে বাজারে ছোট করে এক স্বর্ণের দোকান করে দেয়।

এক সময় কাঞ্চনাপুর আর বঞ্চনাপুর – এই দুই গ্রামের প্রায় সব গৃহস্থালীরই কৃষি যন্ত্রপাতি আর নিত্য দিনের ব্যবহার্য্য লোহা লক্কড়ের দা, কোদাল, শাবল, লাঙলের ফলা, কাঁচি, নিড়ানি, ইত্যাদি যন্ত্রাদি তৈরি এবং ধার কাটানো বআ শান দেওয়ার কাজ অন্ন কামার একাই করতো। অন্ন কামার দুই ধরণের চুক্তিতে কাজ করতো; নগদ অর্থের বিনিময়ে, আর বছরে নির্দিষ্ট পরিমাণে ধানের চুক্তিতে। যারা অন্ন কামারকে দিয়ে ধানের চুক্তিতে কাজ করাতো তারা বছরে দুইবার তাকে ধান দিতো; অগ্রহায়ণ মাসে আর বৈশাখ মাসে। গৃহস্থালীর ব্যাপ্তি অনুসারে ধানের পরিমাণ নির্ধারিত হতো। কেউ বছরে একমণ ধান দিতো আবার কেউ বছরে দুইমণ ধান দিতো। হিন্দু আর মুসলমানের কোনো ভেদাভেদ ছিলোনা। যে কেউ এই চুক্তিতে আবদ্ধ হয়ে তাকে দিয়ে কাজ করাতে পারতো। আর ধানের চুক্তিতে কাজ করার সুবাদেই ঐসব চুক্তিভুক্ত গৃহস্থালীর কাছে তার পরিচয় ছিলো ধ্যানো কামার। তবে নতুন কোনো যন্ত্র বানাতে হলে পুরো দাম দেওয়া লাগতো। ধানের চুক্তিতে শুধু ধার কাটানোই হতো।

এই ভাবেই অন্ন কামারের দিন কাটতে লাগলো। ইতোমধ্যে অরুণের সংসারও বড় হয়ে গিয়েছিলো। অরুণের তিন ছেলে-মেয়ে; বড় মেয়ের বয়স বছর দশেক, ছেলের বয়স বছর সাতেক আর ছোট মেয়ের বয়স চার বছরের মত। বাজারের স্বর্ণের দোকান থেকে তার ব্যবসা ভালোই হচ্ছিলো। পরে সে শহরে দোকান দেয় এবং অন্ন কামার ছাড়া সবাইকে নিয়ে চলে যায়।

অন্ন কামার কোনোভাবেই যেতে রাজি হয়নি। তখনো অন্ন কামারের শরীরে বেশ শক্তি আছে। কামারশালার ছোট খাটো কাজ করতে পারে রীতিমত। আর সে যদি চলে যায় তাহলে দুই গ্রামের লোক কামার খুঁজতে যাবে কোথায়? এইভেবে সে যায়না। আবার দুই গ্রামের সবাই যে তাকে দিয়ে কাজ করাতো এমনও কিন্তু না। তবে অধিকাংশই গৃহস্থালীরাই তাকে দিয়ে কাজ করাতো। তারপর থেকে প্রায় বছর ছয়েক ধরে অন্ন কামার একা বাড়িতে বঞ্চনাপুরেই বসবাস করছিলো।

হঠাৎ একদিন রাতে ভয় পেয়ে অন্ন কামার একটু অসুস্থ্য হয়। আর ঠিক এরই পরেরদিন সকালে কাঞ্চনপুরের দ্বিনু মুন্সী তার বাড়িতে হাজির হলো। বন্ধুর অসুস্থ্যতার গল্প শুনেই কিছু প্রয়োজনীয় কাপড় আর কামার শালার জিনিস পত্র উঠিয়ে নিয়ে বঞ্চনাপুর থেকে কাঞ্চনাপুরের নিজ জমিতে একটা ছোট টিনের খুপরি ঘর করে দেয় থাকার জন্য আর সাথে একটা ছোট কামা
কাঞ্চনাপুর গ্রামে অন্ন কামারের দিন ভালোই কাটছিলো। এই গ্রামের মানুষের নিত্যদিনের সুখ-দু:খের সাক্ষী হচ্ছিলো সে। তবে মাস তিনেক যেতে না যেতেই কাঞ্চনাপুর গ্রামে অন্ন কামারের আবাস গেড়ে বসা নিয়ে লোক মুখে নানান গুঞ্জন শুরু হলো। এই গ্রামে মুসলিম পরিবারের বাইরে একটা পরিবারও নেই অর্থাৎ যবন জাতির বাইরে অন্য কোনো জাতের মানুষ এই গ্রামে বাস করেনা। কেউ কেউ তো ‘জাত গেলো রসাতলে’ বলে বলাবলি করতে লাগলো। আবার কিছু কিছু লোক জাত আর পাতের হিসেব বাদ দিয়ে অন্ন কামারের এই গ্রামে থাকা তাদেরই উপকারের জন্য বলেই বলাবলি করতে লাগলো।

এই ভাবে অন্ন কামারের এই গ্রামে অবস্থান নিয়ে প্রতিক্রিয়া আর মিশ্র প্রতিক্রিয়া চলতে থাকে কয়েকমাস ধরে।

একদিন এই কথা অন্ন কুমার জানতে পারে। আবার দ্বিনু মুন্সীর কানেও গিয়েছিলো হয়তো।
অন্ন কামারকে কাঞ্চনাপুর গ্রাম থেকে তাড়িয়ে দেওয়ার হটকারিতায় সবচেয়ে শক্তিশালী জনমুখী প্রচারণামূলক কাজ যে করেছিলো সে আর কেউ নন। সে এই গ্রামের হাসু মুয়াজ্জিন। “একশোতে একশো যেই গ্রামে মুসলমানের বাস, সেই গ্রামে হিন্দু জাতির কেউ বসবাস শুরু করছে। তাও আবার মইজিদ (মসজিদ) ঘরের পাশে। না। না। তারে গিরামে (গ্রামে) রাখা যাবেনা। গিরামটাকে বেজাত মুক্ত রাখতে হবে” – এই বলে হাসু মুয়াজ্জিন প্রচার চালাতে লাগে। হাসু মুয়াজ্জিনের এই প্রচারণায় কেউ বুঝে আবার কেউ না বুঝে যোগ দিয়েছিলো। জাতের বিচারে মানুষকে বলী করার প্রথা সমাজে অতি প্রাচীন। আর এই প্রাচীন প্রথার কর্ষণ কাঞ্চনাপুরেও হচ্ছিলো।

একদিন আছর নামাজের শেষে মসজিদের মধ্যে দরবার বসেছিলো। দ্বিনু মুন্সীসহ আরও কয়েকজন সেখানে ছিলো। দরবারের শুরুতেই হাসু মুয়াজ্জিন দ্বিনু মুন্সীকে উদ্দেশ্য করে বলে, “আপনি গিরামটাকে নষ্ট করে দিয়েছেন বেজাতের লোক তুলে এনে”। ইমাম সাহেবও বলে বসেন, “ভিন্ন জাতের মানুষ রাখলে ধর্ম-কর্ম কবুল হবে না। আর রাখতে পারবেন যদি তাকে মুসলমান বানাতে পারেন”। হাসু মুয়াজ্জিন আর ইমাম সাহেবের কথা শুনে রীতিমত ক্ষেপে গিয়ে দ্বিনু মুন্সী বলেন, “শতভাগ মুসলিমের গিরাম এটা বলতে তো লজ্জা হওয়া উচিত, গর্ব করে বলার কিছু নেই”। সব মানুষই স্রষ্টার সৃষ্টি। যাইহোক, দ্বিনু মুন্সীর কথা শেষ না হতেই বাইরে থেকে বাক্কা ফকিরের গানের আওয়াজ শোনা গেলো। “জাত গেলো জাত গেলো……” – বলে সে গান গাচ্ছিলো। বাক্কা ফকির হয়তো জানতোনা মসজিদের মধ্যে যে বিষয় নিয়ে আলোচনা হচ্ছে সেই সম্পর্কে। যাইহোক, দরবারের অধিকাংশ লোকই অন্ন কামারকে গ্রামে না থাকার ব্যাপারে রায় দেয়। দ্বিনু মুন্সী একা যা চায় তা দিয়ে কারোর আসে যায়না। আর কালেমা পড়িয়ে অন্ন কামারকে মুসলমান বানানো – এই প্রস্তাব বড্ড অবান্তর দ্বীনু মুন্সীর কাছে কেননা জাত ধর্মের বাইরে গিয়েই তাদের মধ্যে বন্ধুত্বের সম্পর্ক হয়েছিলো।

দরবার সেরে মুখভার করে দ্বিনু মুন্সী বাড়ির দিকে হেঁটে যাচ্ছিলো। মানুষকে কাছে টানতে জাত আর ধর্ম লাগেনা কিন্তু কাছে আসা মানুষকে ধরে রাখার জন্য যে সমাজ জাত, ধর্ম আর পরিচয়কে বিশাল কারন হিসেবে দাঁড়ায় করায় – এই সব নিয়েই মনে মনে ভাবছিলো সে।
কয়েক পা ফেলেই সে অন্ন কামারের কামারশালায় এলো। কামার শালায় অন্ন নেই। দ্বিনু ভাবলো মনে হয় নদীর ঘাটে গোসল করতে গেছে। সেখানেও যেয়ে দেখে অন্ন কামার নেই। অন্ন কামার হয়তো সবকিছু জানতে পেরে গিয়েছিলো। যে জাতের হিসেব করে বন্ধুত্ব করেনি, সেই জাতের বিবাদের সামনে বন্ধুর মুখোমুখি হতে চায়নি।

একদিন যায়, দুইদিন যায় কিন্তু অন্ন কামারের আর খোঁজ মেলেনা। নিজের জিনিসপত্র আর কামারশালা রেখে যে সেইদিন অন্ন কামার কোথায় গেল তা আর কেউ জানতে পারেনি এমন কি তার ছেলেও না। আবার তার লাশ যে পাওয়া গিয়েছে তাও না। দ্বিনু মুন্সী একটু অনুতপ্ত হয় এই ভেবে যে সে হয়তো জোর না করলে অন্ন কামার তার সাথে আসতো না। “বন্ধু আমারে মাফ করো” – এই কথা দিনে প্রায় দশবার করে বলে সে। তার মনে একটাই মিনতি যে অন্তত মরণকালে হলেও তার বন্ধু অন্ন কামারের দেখা যেন সে পায়। এই ভাবেই বেশ দু’য়েক বছর চলতে থাকে।

একদিন হঠাৎ দ্বিনু মুন্সী বিছানায় পড়ে যায় এবং বার্ধক্যজনিত রোগসমূহ তাকে পেয়ে বসে। অন্ন কামারের খোঁজ এখনো মেলেনি। দ্বিনু মুন্সী হয়তো বা এমন জায়গা কামনা করে যেখানে গিয়ে আবার তারা বন্ধুত্ব করবে যেখানে জাত আর পাতের হিসাবের খাতা খোলা নেই, কোনো জাত শুদ্ধির অভিযান নেই।


Share It
  • 236
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    236
    Shares