চাকচিক্যের অন্তরালে বেহাল বরিশাল-ঢাকা নৌ রুটে

Share It
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

যাত্রী সেবা দেশের সর্ববৃহৎ ও অন্যতম নৌপথ ঢাকা-বরিশাল রুটের লঞ্চ সেবা চাকচিক্যের অন্তরালে বেহাল দশায় চলছে। লঞ্চ মালিকরা প্রতিযোগিতা করে একের পর দানবাকৃতির নৌযান জলে ভাসাচ্ছেন ঠিকই তবে যাত্রী সেবার মান এখনও জর্জরিত রয়েছে পুরোনো সমস্যায়।

বেশিরভাগ লঞ্চের নিম্নমানের যাত্রীসেবা, ধারণ ক্ষমতার অধিক যাত্রী পরিবহন, নগণ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থা, যাত্রীদের সাথে লঞ্চ স্টাফদের দুর্ব্যবহার, অতিরিক্ত ভাড়া আদায়, টিকিট কালোবাজারী, কেবিন সংকট, দায়সারা সেবা, যাতায়াতের ক্ষেত্রে প্রতিনিয়ত দু-একটি অপ্রীতিকর ঘটনা সহ অসংখ্য সমস্যায় শখের এই যাতায়াত এখন দুর্ভোগে পরিনত হচ্ছে সাধারন যাত্রীদের কাছে। বিআইডব্লিউটিএ, নৌ-পুলিশ, ঘাট কর্তৃপক্ষ এবং লঞ্চ মালিক সমিতি যাত্রীদের সেবায় তাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা ফলাও করে প্রচার করলেও তা শুধু প্রচারেই সীমাবদ্ধ থেকে যাচ্ছে। যাত্রীরা এর কোন সুফলতো পাচ্ছেই না বরং ভোগান্তি বাড়িয়ে দিন দিন বেপরোয়া হয়ে উঠছে সংশ্লিষ্ঠ সকল দুর্নীতি পরায়নরা। এবার ঈদুল আযহার ছুটিতে এই রুটের যাতায়াতকারী অসংখ্য যাত্রীর মুখে জানা গেছে এমন আক্ষেপের কথা।

তারা বলেন, এই রুটে চলাচলের বিড়ম্বনা শুধু ভিড়ের সময়ই নয় তাদের সারা বছরের প্রতিবারের যাতায়াতের সময় পোহাতে হচ্ছে। ঢাকা বরিশাল রুটে লঞ্চে যাতায়াত এখন আর উপভোগের মত নেই বলে যাত্রীরা অভিযোগ করেন, দুর্নীতি পরায়ন কর্তৃপক্ষ আর ব্যবসায়ী লঞ্চ মালিকদের সমন্বয়ে এই বেহাল দশার সৃষ্টি হয়েছে। যা দিনে দিনে দক্ষিনাঞ্চলের গর্ব এই রুটকে চলাচলের অযোগ্য করে তুলছে সাধারন শ্রেনীর যাত্রীদের জন্য। নদীমাতৃক বাংলাদেশের দক্ষিণবঙ্গের সকল জেলা ও উপজেলার সাথে যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম লঞ্চ সার্ভিস।

ঢাকার সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল থেকে সর্বমোট ৪৫ টি রুটে এই সকল লঞ্চ চলাচল করে। ঢাকা থেকে বরিশাল, পটুয়াখালী, বরগুনা, ভোলা, ঝালকাঠী, মাদারীপুর, চাঁদপুর, খুলনা, মংলা বন্দর, কাউখালী, চরখালী, বড় মাছুয়া, হাতিয়া, মোড়েলগঞ্জ, লালমোহন, হুলারহাট, ভান্ডারিয়া, ইচলী, দৌলতখান, বোরহান উদ্দিন এবং সুরেশ্বরের উদ্দেশ্যে বিভিন্ন লঞ্চ ছেড়ে যায়। ঢাকা থেকে শুধুমাত্র দক্ষিণাঞ্চলের ৪২টি নৌপথে মোট ২০২টি লঞ্চের রুট পারমিট আছে। এর মধ্যে ঢাকা-বরিশাল রুটে ১৭টি, ঢাকা-পটুয়াখালী রুটে চারটি, ঢাকা-ভোলা রুটে চারটি এবং ঢাকা-হুলারহাট-ভা-ারিয়া নৌপথে ছয়টি লঞ্চকে রুট পারমিট দেওয়া আছে। নিয়মানুযায়ী, ১৮০০ বর্গফুট থেকে ৩০০০ বর্গফুট আয়তনের লঞ্চগুলো ২৫০ থেকে ১৫০০ যাত্রী বহন করতে পারে। লঞ্চগুলোতে ভিআইপি কেবিন, ডাবল কেবিন, সিঙ্গেল কেবিন, সাইড বেঞ্চ, ফ্লোর এবং ডেকে যাত্রীদের বহনের ব্যবস্থা থাকে। এই লঞ্চগুলোর সকল শ্রেনীর যাত্রীদের জন্য ভাড়া নির্ধারন করা রয়েছে। শুধু যাত্রীদেরই নয় আলাদাভাবে ভাড়া নির্ধারন করা আছে ২০ কেজির অতিরিক্তি ওজনের মালামাল বহনের ক্ষেত্রে। একজন যাত্রী সর্বোচ্চ ২০ কেজি পর্যন্ত মালামাল বহন করতে পারে যা টিকেটের অন্তর্ভূক্ত। লঞ্চের দ্বারে দ্বারে লেখা রয়েছে ভ্রমন সংক্রান্ত নানা নিয়ম। প্রত্যেকটি শ্রেনীর যাত্রীদের ভ্রমন এর স্থান আলাদা করা রয়েছে। লঞ্চে আরোহিত যাত্রীদের সার্বিক নিরাপত্তার স্বার্থে নিজস্ব নিরাপত্তা কর্মী নিয়োজিত রয়েছে।

যেকোন দুর্যোগে যাত্রীদের জীবন রক্ষার জন্য সর্বনিম্ন ৮০ টি বয়া ও ১০ টি টায়ার ও অগ্নি নিরাপত্তায় ৪ টি ফায়ার বাকেট রয়েছে। এগুলো প্রতি ফ্লোরের দুই দিকে ছাদের অংশে এবং কেবিনের পাশে সারিবদ্ধভাবে সংরক্ষিত থাকে। প্রতিটি বয়া সর্বনিম্ন ৪ জন যাত্রী বহন করতে পারে। কেবিনের চাহিদা বেশি থাকায় ৩ থেকে ৪ দিন আগে কেবিন বুকিং দেয়ার নিয়ম রয়েছে। শুধুমাত্র কেবিন ও সোফার ক্ষেত্রে বুকিং দেয়া যায়। ডেকের জন্য অগ্রীম টিকিটের কোন ব্যবস্থা নেই। ফোনে ৫০% অগ্রীম দিয়ে লঞ্চের কেবিন বুকিং দেয়া যায়।

কাগজে কলমে এসকল নিয়মনীতি ব্যাপক করাকরি থাকলে বাস্তবের সাথে এর কোন মিল নেই একটি লঞ্চেও বলে জানায় সূত্রটি। মিলতো নেই উল্টো চরম অনিয়ম ও খামখেয়ালীপনা সহ্য করে সারাবছর চলে সাধারন যাত্রীদের এই রুটের চলাচল। ভোগান্তি ও বিড়ম্বনার সর্বোচ্চ সহ্য করে সরকারি বড় ছুটিগুলোর সময় চলে যাত্রীদের যাতায়াত। প্রতিবারের ন্যায় এবার ঈদের ছুটিতেও তার কোন ব্যতিক্রম হয়নি। ঈদের ছুটিতে আসা কয়েক লক্ষ যাত্রীকে নানাভাবে হয়রানীর শিকার হয়ে যাতায়াত করতে হয়েছে। যাত্রীদের ভাষ্যে সব থেকে বেশি বিরম্বনার স্বীকার তাদের হতে হয়েছে হাস্যকর নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও মালামাল পরিবহনের ভাড়ার বিষয়ে। প্রত্যেকটি লঞ্চেই এই বিড়ম্বনায় পরতে হয়েছে তাদের।

গত ১৯ আগস্ট ঈদের ছুটিতে ঢাকা থেকে বরিশাল আসা যাত্রী মাহমুদ হীরা পরিবর্তনকে জানান তার অভিজ্ঞতার কথা। একটি বিলাসবহুল লঞ্চের ২৯ নাম্বার সিঙ্গেল কেবিনের যাত্রী হিসেবে তিনি রওনা হন। রাতে তিনি তার কেবিনটি তালা বদ্ধ করে বের হন। কিছুক্ষন পরে ফিরে অন্ধকারে তিনি ভুলবশত ৩১ নাম্বার কেবিনটি তার মনে করে প্রবেশের জন্য তার কেবিন (২৯নং) এর চাবি ব্যবহার করেন। চট করে তার চাবিতেই খুলে যায় ৩১নং কেবিন। প্রবেশের পর ভুল বুঝতে পেরে তিনি তাৎক্ষনিক বের হয়ে যান এবং কেবিন বয়কে ডেকে পাঠান। কেবিন বয় এসে তাকে অনুরোধ করে বিষয়টি গোপন রাখার জন্য। এর পর হীরা তার বন্ধুদের আরও একটি সিঙ্গেল কেবিন (৪০নং) এ ওই একই চাবি ব্যবহার করেন এবং ওই কেবিনটিও একটি চাবিতেই খুলে যায় বলে জানান তিনি।

এমন যদি হয় বিলাসবহুল লঞ্চের নিরাপত্তা ব্যবস্থা তবে সেখানে যান-মালের কতটুকু নিরাপত্তা আছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উদ্দেশ্যে প্রশ্ন করেন তিনি। এছাড়া লঞ্চের কোনটি কোন শ্রেনী তা যাত্রীদের অবস্থান দেখে বোঝার কোন উপায় নেই বলেও অভিযোগ করেন একাধিক যাত্রী। অতিরিক্ত মালামাল নিয়ে ভোগান্তির বর্ননায় ২৭ আগস্ট বরিশাল থেকে সুরভি লঞ্চে ঢাকা গমন করা যাত্রী তানভীর কিবরিয়া জানান, তার ব্যবহৃত মোটর সাইকেলটি লঞ্চে নিয়ে তিনি প্রথম শ্রেনীর যাত্রী হয়ে রওনা হন। তার টিকিট যে লঞ্চে তার যানটিও তো সেই লঞ্চেই বহন করতে হবে। কিন্তু তা উঠানোর সময় সন্ত্রাসীপনার স্বীকার হন লঞ্চ স্টাফদের হাতে। এর পর পরের দিন সকালে তার ভাড়ার বাইরেও মোটর সাইকেলের জন্য সদর ঘাটের কুলিদের সহায়তায় তাকে জিম্মি করে দের হাজার টাকা হাতিয়ে নেয়া হয়। টাকা দিতে অস্বীকার করলে তাকে শারিরিক ভাবে লাঞ্ছিত করার চেষ্ঠা করে লঞ্চের স্টাফরা। তবে টাকা নেয়া হলেও ওই টাকার কোন রশিদ দেয়া হয়নি বলে জানান তিনি।

এমন একাধিক ঘটনার অভিযোগ প্রতিবছর শোনা যায় ঢাকা বরিশাল নৌ রুটের বেশিরভাগ লঞ্চের যাত্রীদের কাছে। বিআউডব্লিউটিএ, নৌ পুলিশ এমনকি লঞ্চ মালিকদের কাছে বারবার এ সকল অভিযোগ গেলেও তাদের এতে কোন মাথা ব্যথা নেই বলেও অভিযোগ করে যাত্রীরা। অভিযোগ রয়েছে বিআউডব্লিউটিএ নৌ নিরাপত্বা বিভাগ ও নৌ পুলিশ লঞ্চ মালিকদের কাছ থেকে প্রতিদিন মোটা অংকের টাকা নিয়ে এসব অভিযোগের ভ্রুক্ষেপ করে না। উল্টো তাদের সব অপরাধ নজর-আন্দাজ করে যান খুব ভালো দুর্নীতি পরায়ন বন্ধুর ভুমিকায়। তারা শুধুমাত্র যাত্রীদের কোন ভাবে লঞ্চ পর্যন্ত পৌছে দেয়ার কাজ করেই দায়িত্ব পালন করেন। বিষয়গুলোতে বরিশাল বিআইডব্লিউটিএ’র নৌ নিরাপত্তা বিভাগের উপ পরিচালক আজমল হুদা মিঠু সরকার জানান, পারাবাতসহ বিভিন্ন কোম্পানির লঞ্চকে সিসি ক্যামেরা লাগানোর জন্য একাধিকবার বলা হয়েছে, যাদের আনসার নেই তাদের তা নিতে বলা হয়েছে, কিন্তু কর্ণপাত করা হচ্ছে না।

তবে নিরাপত্তার জন্য এসব বাধ্যতামূলক করতে শিগগিরই নির্দেশনা আসছে বলে জানান তিনি। তাদের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ ভিত্তিহীন বলেন তিনি। তাদের কাছে কোন অভিযোগ এলে তার তাৎক্ষনিক ব্যবস্থা গ্রহন করা হয় আর ভবিষ্যতেও হবে। লঞ্চ মালিকদের সাথে তাদের কোন ধরনের সখ্যতা নেই বলেও জানান এই কর্তা। সূত্র অনুযায়ী ঈদে বিশেষ সার্ভিসে কীর্তনখোলা ২, ১০, সুন্দরবন ৮, ১০, ১১, ১২, সুরভী ৭, ৮, ৯, পারাবত ২, ৯, ১০, ১১, ১২, এমভি টিপু ৭, এমভি ফারহান ৮, দ্বীপরাজ, কালাম খান ১, তাসরিফ ১, ৪, অ্যাডভেঞ্চার ১, ৯, দেশান্তর ও গ্রিন লাইন ২, ৩ সহ মোট ২৫টি বেসরকারি লঞ্চ চলাচল করেছে। ঢাকা-বরিশাল রুটে চলমান ২৫টি লঞ্চের অর্ধেকের বেশি ১৩টিই নামমাত্র বিলাসবহুল ও আধুনিক। বরিশাল-ঢাকা রুটে সরাসরি চলাচলরত সুন্দরবন-১০, ১১, সুরভী- ৭, ৮, ৯, কীর্তনখোলা-২ ও ১০, পারাবাত-১১ ও ১২, অ্যাডভেঞ্চার-১, ৯ ও গ্রিনলাইন- ২ ও ৩ সহ মোট ১০টি লঞ্চে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহৃত হচ্ছে। নতুন ও আধুনিকায়ন করা এসব লঞ্চগুলোতে জিপিএস, ইকো সাউন্ডার, ফগ লাইট, হাইড্রোলিক ও ইলেক্ট্রনিক হুইল, আধুনিক অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র ব্যবহার করে থাকে।

আবার এরমধ্যে সুন্দরবন কোম্পানির ২টি লঞ্চে সিসিইউ এবং লিফলেটের ব্যবস্থাও রয়েছে। তবে এ লঞ্চগুলো ছাড়া বিলাসবহুল ও আধুনিকায়নের তকমা লাগানো দ্বীপরাজ, পারাবত- ২, ৯, ১০, কামাল-১, সুন্দরবন-৮, টিপু-৭ সহ ১৩টি লঞ্চে রাডার ছাড়া নেই তেমন কোনো আধুনিক সরঞ্জাম। অপরদিকে বিলাসবহুল লঞ্চ হলেও সিসি ক্যামেরার আওতায় আসেনি সব লঞ্চ। পারাবত- ২, ৯, ১০, দ্বীপরাজ, সুরভী কোম্পানির একটিসহ প্রায় ডজনখানেক লঞ্চে নেই কোনো সিসি ক্যামেরা। পাশাপাশি অনেক লঞ্চেই নেই আনসার কিংবা নিজস্ব সিকিউরিটি সার্ভিসের ব্যবস্থা। তাই বিলাসবহুল লঞ্চে যাত্রীরা অনেকটাই অনিরাপদ যাতায়াত করছেন।


Share It
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here