প্রিয় মাশরাফি বিন মর্তুজা,অনেক হয়েছে,যথেষ্ট হয়েছে,এবার থামেন:লিখন গোলাম রাহমান

Share It
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

প্রিয় মাশরাফি বিন মর্তুজা,অনেক হয়েছে,যথেষ্ট হয়েছে,এবার থামেন।শেষ ম্যাচটা খেলে দেশে আসুন, তারপর ওয়ানডে থেকেও অবসর নিন। দেশের ক্রিকেটকে পুরোপুরি গুডবাই বলে ব্যবসায় নেমে পড়ুন। কিংবা দামী বিদেশী লীগ খেলতে যান কিংবা সম্ভব হলে একেবারেই দেশ ছেড়ে বাইরে চলে যান।

প্রিয় মাশরাফি,
আমি আপনার ভক্ত। ভক্তের স্কেল মাপলে উপরের সারিরই ভক্ত হবো। তাও আমি আর আপনাকে জাতীয় দলের জার্সি গায়ে দেখতে চাই না। দেখতে চাই না আমার প্রিয় মানুষটা খোঁড়াতে খোঁড়াতে মাঠ ছেড়ে যাচ্ছে।
আপনি কাদের জন্য খেলবেন, কেন ই বা খেলবেন?আপনি বারবার দেশপ্রেমের প্রসঙ্গ তুলেন। যে কোন কিছুতেই আপনি দেশপ্রেম টেনে নিয়ে আসেন। আমরা যারা ক্রিকেটের এক দশকের দর্শক, আমরা জানি আপনার দেশপ্রেম হঠাৎ করেই চলে আসা কোন আবেগ নয়।আপনি সেই ২০০৩ সালে কিশোর বয়সে কানাডার সাথে বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে জাতীয় সংগীত গাওয়ার সময় কান্না করেছিলেন। এমনকি তার অনেক সময় পরেও যখন নিজের প্রথম ওভার করতে এলেন তখনো আপনার চোখভর্তি জল। আবেগ সামলাতে না পেরে প্রথম বলটা করলেন পীচের বাইরে দিয়ে।আপনি লিখেছেন সে কথা, আমরা পড়েছি, বিস্মিত হয়েছি, আপ্লুত হয়েছি।আহা দেশপ্রেম! আহা!!কিশোর বয়সের দেশপ্রেম এখন আরো পূর্ণতা পেয়েছে। সাতটা অপারেশন নিয়ে পা বেঁধে এখনো দৌঁড়াচ্ছেন, এখনো…..আপনি কার জন্য এত ত্যাগ করছেন প্রিয় মাশরাফি?দেশ বলে কিছু আছে?দেশ মানেই তো মানুষ….আর এদেশের মানুষ কেমন তা আপনার এখনো জানা হলো না?

প্রিয় মাশরাফি,
আপনি কেন খেলবেন জাতীয় দলে?টাকার জন্য?আমরা আপনার এ খবরও রাখি। আপনি সম্ভবত ২০০৭ সালে প্রিমিয়ার ডিভিশন লীগে বিমানের হয়ে সাইন করার সময় এক টাকাও নেন নি। বড় গলায় বলেছিলেন “আই হ্যাভ এনাফ মানি।”আপনি আইপিএল এ সুযোগ পেয়েই বলেছিলেন “প্রয়াত রানার পরিবারের জন্য কিছু করতে চাই।”রানার বাবার বক্তব্য থেকে আমরা জানতাম সবাই যখন রানাকে ভুলে গেছে তখনো আপনি রানার বাসায় ছুটে গেছেন ইলিশ হাতে নিয়ে। রানার বাবার জন্য লুঙ্গী আর মায়ের জন্য শাড়ি থাকত।আহা কি নির্মোহ জীবন!আপনি তো টাকার জন্য খেলছেন না।দেশের জন্য খেলবেন?
এ দেশের জন্য যথেষ্ট করা হয়েছে। আমরা সেটা আর চাই না।

প্রিয় ম্যাশ,
দলটাকে কি মমতায় আপনি এক করেছিলেন! ১৪ সালের ভঢাবহ বাজে ব্যাডপ্যাচের পর দল এলোমেলো হয়ে গেল। হঠাৎ ম্যাজিকের মতো বদলে গেল সবকিছু।আমরা দেখেছি দর্শকের হামলার মুখে আপনি কিভাবে সাকিবকে বুকে আগলে ধরে মাঠ থেকে বের করেছেন। আমরা দেখেছি কিভাবে মুস্তাফিজকে চুমু খেয়েছেন। আমরা দেখেছি তাসকিনকে হাতে ধরা উপরে তোলার লড়াই।আমরা দেখেছি অষ্ট্রেলিয়ায় চার পেসারের মনোবল বাড়াতে তাদেরকে নিয়ে একান্ত ডিনার, আমরা শুনেছি নাসিরের জন্য প্রেজেন্টেশনে আপনি ইঙ্গিতে অনেক কিছুই বুঝিয়ে বলেছেন “আনফরচুনেটলি হি ইজ আনলাকি”।অফ দ্য রেকর্ডের আরো কিছু খবর আমরা জানি। সন্তানকে হাসপাতালে রেখে কার অবসর আপনি ঠেকিয়েছেন, কাকে নিজের রুমে ডেকে নিয়ে মোটিভেশন দিয়েছেন, কাকে আইপিএল থেকে ফেরানোর চেষ্টা করেছেন।

এমনকি বহিরাগত দর্শককে বুকে আগলে ধরে সিকিউরিটির হাত থেকে বাঁচানোর দৃশ্য সারা পৃথিবী দেখেছে।
সর্বশেষ রিয়াদের জন্য নিজেই সিরিজ বর্জনের হুমকি দিয়ে রিয়াদের ক্যারিয়ারে লাইফ লাইন দিয়েছেন।
বিনিময়ে কি পেলেন?নীরব গলাধাক্কা দিয়ে আপনাকে বের করে দেয়ার সব আয়োজন সম্পন্ন হয়ে গেছে। এই দল, এই দেশ থেকে আপনি কিছুই পেলের না।আমরা আর আপনাকে মাঠে দেখতে চাই না।
প্রিয় নড়াইল এক্সপ্রেস,আমরা অনেক কিছুই বুঝি।”টি- টুয়েন্টি দলটাকে ওয়ানডের মতো বানাতে চাই” বলার কয়েক দিনের মাথায় কেন অবসর? কিসের জন্য??

পারফর্ম করেই তো টিকে ছিলেন। সাতটা অপারেশন গতি কমিয়ে দিয়েছে। সেটা পুষিয়ে নিতে ভ্যারিয়েশন যোগ করেছেন। মুভমেন্ট কমলেও সুইং বেড়েছে। স্লোয়ার ধারালো হয়েছে। কঠোর সাধনায় আয়ত্ত্ব করেছেন কাটার। মোস্তাফিজের আড়ালে পড়াতে অনেকে জানেই না মাশরাফি গত এক বছরে কতগুলো উইকেট কাটারে নিয়েছেন। টুয়েন্টিতে ব্যাটিং গড় ১৪। বাংলাদেশের অনেক ব্যাটসম্যানের কাছাকাছি এই গড়।
তবুও আপনাকে ছুঁড়ে ফেলার সব আয়োজন সম্পন্ন করা হলো।
আমরা স্বপ্ন দেখতাম একদিন বড় পরিসরে প্রিয় ম্যাশকে বিদায় দেব। সব ফরম্যাট থেকেই।স্টেডিয়াম জুড়ে কান্নার রোল পড়বে। পৃথিবী অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখবে একটা মানুষের প্রতি মানুষের কত অসম্ভব ভালোবাসা।

অফ দ্য রেকর্ডে রেকর্ড হয়ে রইবে এই ঘটনা।আমরা বুঝতে পারছি আমাদের এই স্বপ্ন সম্ভবত পূরণ হবে না।
মাশরাফিকে সরে যেতে হবে নীরবে।কিভাবে মানা যায়?শেন বন্ড দুইটা ইনজুরিতেই ক্যারিয়ার শেষ করেছেন। ফ্লিনটফ এক ইনজুরিতেই শেষ। স্টেইনের মতো বোলার ফিরে আসতে পারছে না।
ইতিহাস ঘটিয়ে আপনি প্রতিবার ফিরে এসেছেন, সাতটা অপারেশন নিয়ে খোঁড়াতে খোঁড়াতে বল করেছেন।
কি অসামান্য মানসিক জোর!সেই মানুষটাও যখন হেরে যান তখন বুঝতে হয় আঘাত কতটা গুরুতর হয়ে এসেছে, কতটা কঠিন হয়ে এসেছে।আমরা ধারণা করতে পারছি সেটা।আর অপমানিত হতে দেখতে চাই না। আর খেলার দরকার নেই আপনার।

প্রিয় মাশরাফি,
আপনার পরিবার আছে। দুইটা বাচ্চা আছে।আর আছে আপনার চিরতরে পঙ্গু হওয়ার সম্ভাবনা।
কেন আপনি নিজের পঙ্গুত্ব ডেকে আনবেন? কার জন্য? কাদের জন্য?আপনিই তো বলেন ক্রিকেট একটা নিছক বিনোদন।তাহল দেশবাসীকে কেবল বিনোদন দিতে গিয়ে কেন আপনাকে পঙ্গু হতে হবে? আপনার তো কোন লোভ নেই, কোন মোহ নেই, অর্থ লিপ্সা নেই….আপনি মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গ বারবার টানেন।
কেন আপনি ইতিহাস জানেন না? জানেন না এদেশে সিরাজ যেমন ছিল, মীর জাফরও তেমনি ছিল। কালান্তরে মীর জাফরদের সংখ্যাই দেশে বেশি।এই জাতি সেক্টর কমান্ডারদের বেশিরভাগকেই হত্যা করেছে নয়তো ফাঁসিতে ঝুলিয়েছে। স্বাধীন দেশের প্রথম কারাবন্দি হয়েছেন একজন সেক্টর কমান্ডার। শেষ পর্যন্ত এই জাতি জাতির জনককেই নিস্তার দেয়নি….এই জাতিকে নিয়েই আপনি স্বপ্ন দেখেছেন, এত কিছু করেছেন।
দরকার নাই আর। সব আপনাকে করতে হবে না। আপনি নিজের জন্য ভাবুন। পরিবারের জন্য ভাবুন। নিজের সময়টা পরিবারকে দিন।আপনাকে যারা আজকে মাথায় তুলেছে, তারাই ছুঁড়ে ফেলেছে। আপনি পঙ্গু হলে কেউ খবর নেবে না। আপনার এখনকার পা ব্যথার যন্ত্রণা কেউ নেয়?কেউ ই না।

দেশের ক্রিকেট উচ্ছন্নে যাক। ১৫ বছর আগেও মানুষ ক্রিকেট দেখেছে। আগের মতো হলেও যারা দেখার তারা দেখবে। না দেখলেও ক্ষতি নেই। দেশই উচ্ছন্নে যাচ্ছে, আর ক্রিকেট তো কোন ছাই!
ক্রিকেট নিয়ে গর্ব করার সুযোগ আপনি করে দিয়েছেন, আনন্দ দিয়েছেন। মানুষ বিকল্প আনন্দ বের করে নেবে। আর গর্ব করার কোন দরকার নেই। আমরা সে রকম জাতি নই।
সৎ চিন্তা নিয়ে এদেশে কেউ টিকে থাকতে পারে নি। রাজনীতির সামনে আপনিও পারবেন না। উপরে নিচে সব কেটে ফেলা হচ্ছে। আপনি মাঝখানে কত পানি ঢালবেন একা?
দেশের মঙ্গল দেখার দায়িত্ব কেন আপনাকেই নিতে হবে?
টাকার কুমিরদের ভীড়ে একা মোহহীন হয়ে থাকতে পারবেন না। হাজারটা দেশদ্রোহীর ভীড়ে কত সময়

দেশপ্রেম নিয়ে যুদ্ধ করবেন?
কি দরকার অনেক হয়েছে…ছেড়ে দিন সব।

প্রিয় পাগলা,
আপনাকে কয়েক লাখ তরুণ আইডল মানে। কোটি কোটি মানুষের হৃদয়ে ঢুকে পড়েছেন আপনি। এটা মোর দ্যান এনাফ।আপনি কখনোই হারাবেন না। মাশরাফি নামটা হারানোর নয়।আপনি কারো না কারো ত্যাগে জড়িয়ে থাকবেন, কারো না কারো দেশপ্রেমে জড়িয়ে থাকবেন, কারো না কারো মমতায় জড়িয়ে থাকবেন, কারো না কারো সাফল্যে থাকবেন।হয়তো আপনার মতোই দলে দাঁড়িয়ে যাবে কেউ একজন।কিংবা বড় করে স্বপ্ন দেখলে একটা সময় পুরো দলটাই হয়ে যাবে “মাশরাফি”।আপনার এবার একটু দম নেন।আপনাকে এখন আর কেউ ক্রিকেটার হিসেবে দেখে না। আপনি অনেক উর্ধ্বের একজন।আমরা ব্যাট বল হাতে মাশরাফিকে দেখতে চাই। তবে তারচেয়ে বেশি দেখতে চাই মাথা উঁচু করা এক মাশরাফিকে। আমরা আপনার সুস্থতা চাই। আমরা হারতে দেখতে চাই না।ঐযে….আপনি ক্রিকেটার নন…আপনি একজন মানুষ। ভালোবাসার মানুষ।অনেক করেছেন। এবার সিদ্ধান্তটা নিয়ে নিন।আমরা আমাদের বীরকে বীরের মতোই দেখতে চাই।সেটা মাঠে হোক, অবসরে হোক, মাঠের বাইরে হোক….যেখানে খুশি সেখানে হোক।ঁ
ক্রিকেটের চেয়ে মাশরাফি অনেক বড় নাম


Share It
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here